কুরবানীর ইতিহাস

কুরবানী আসলেই আমরা মনে করি যে এটি আল্লাহর জন্য শুধুমাত্র খাটি ও পবিত্র নিয়তে একটি পশু কুরবানী করে দেয়া। আমরা মনে করি যে এটি গরীবদেরকে গোস্ত খাওয়ানোর সহজ সুযোগ ও উপায়। দেখেন একটি হলো উদ্দেশ্য আরেকটা হলো উপকার। কোনো একটি কাজের অনেক উপকার থাকতে পারে কিন্তু মূল উদ্দেশ্য ভিন্ন হতে পারে। 

কুরবানীর পিছনে একটি পশু নয়, পশুর গোস্তও নয়, রয়েছে একটি পরিবার। জ্বি হ্যাঁ একটা পরিবার আর তা হলো মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহীম আঃ এর পরিবার।

লম্বা করে কিছু না বলে খুব সংক্ষেপে বলে যাই পারলে হৃদয়ে গেথে নিন।

ইব্রাহীম আঃ এর পরিবারের সদস্য ৩ জন্য। ইব্রাহীম আঃ নিজে, উনার স্ত্রী হাজেরা রাযিঃ ও সন্তান ইসমাইল আঃ। 

ইব্রাহীম আঃ কে আল্লাহ তা'আলা সেই বৃদ্ধ বয়সে সন্তান দান করেছেন। এমন সময় আল্লাহর হুকুম চলে আসলো স্ত্রী সন্তানকে ধু ধু মরুভূমিতে রেখে আসো। জনমানবহীন শূন্য এক স্থান, যেখানে ঘাস নেই, পানি নেই। কোনো চিন্তা করা ছাড়াই সাইয়্যেদুনা ইব্রাহীম আঃ তা পালন করলেন। যাওয়ার পথে স্ত্রী হাজেরা একটি কথাও বলছেন না,যে স্বামী এই শিশুকে নিয়ে এভাবে কোথায় যাচ্ছি, কোথায় কেনো নিয়ে যাচ্ছেন। ইব্রাহীম আঃ স্ত্রী ও প্রিয় পুত্রকে রেখে যাচ্ছে। পিছন থেকে এবার স্ত্রী বলে উঠলেন, স্বামী কেনো রেখে যাচ্ছেন,আমার কি কোনো অপরাধ হয়েছে নাকি আল্লাহর নির্দেশ? সাইয়্যেদুনা ইব্রাহীম আঃ আকাশের দিকে ইশারা করলেন। নবী পত্নী (উম্মুল মুমিনিন) হাজেরা রাযিঃ এর বুঝতে আর বাকি রইলো না সাথে সাথে তিনি বলে উঠলেন " তাহলে আমাদের আর কোনো চিন্তা নেই,তিনিই আমাদের অভিভাবক,আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট" 

বেশ কিছুদিন পর ইব্রাহীম আঃ তার পরিবারকে কাছে পেয়েছেন। পুত্র ইসমাইল এখন দৌড়াতে পারে স্পষ্ট কথা বলতে পারে। বাবা ছেলের সেকি ভালোবাসা। ছেলের কথা,চলা,বলা সব কিছুতেই ভালোবাসা ও মায়ার চাদর মাখা। এমন সময় চলে আসলো আবার আরেক হুকুম। একদিন পিতা পুত্র হাটছেন। পিতা ইব্রাহীম খুব সহজ ভাবে বললেন। ইসমাইল জানো আমি আজ একটি স্বপ্ন দেখেছি "আমি স্বপ্নে দেখেছি যে,আমি তোমাকে যবাই করছি,এখন এই ব্যপারে তুমি কি বলো? তোমার কি মত?" এই বিষয়ে একজন কিশোরের কি জবাব হতে পারে! নবীর ছেলে বলে কথা, জবাবে বললেন " হে পিতা আপনি তা পূর্ণ করুন যে বিষয়ে আপনাকে আদেশ করা হয়েছে,আপনি আমাকে ধৈর্য্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন ইনশাআল্লাহ"

এরপরের ঘটনা সকলের জানা। কুরবানীর বিষয় মূল ঘটনা মূলত এখানে শেষ। সুপ্রিয় পাঠক গল্পটা কি আবার একটু চোখ বুলাবেন? 

এই যে কুরবানী এতে কি শুধু পশু কুরবানীই মূল উদ্দেশ্য নাকি এর পিছনে রয়েছে একটি পরিবার। শুধুকি সাধারণ পরিবার? নাকি একটি আদর্শ পরিবার? 

খেয়াল করেছেন কি বান্দা তার রবের জন্য তার স্ত্রী সন্তান কিভাবে ত্যাগ করে! এই জন্য কুরবানির দোয়ার মধ্যে একটি অংশ কুরআনে বর্নিত দোয়া

 "إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ.

‘‘নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সারা জাহানের রব আল্লাহর জন্য’’-সূরা আনআম ১৬২

এরপর লক্ষ করুন মা হাজেরা প্রতি। কেমন ছিলেন তিনি স্ত্রী হিসাবে। স্বামীর সাথে কেমন আচরণ উচ্চারণ করলেন। কতটা চমৎকার ছিলো উনার আখলাক। রবের বান্দি হিসাবে কেমন ছিলেন উনি। কতটা শুকরগুজার ছিলেন রবের প্রতি,কতটা দৃঢ় ঈমান ও তায়াক্কুল এর অধিকারীনি ছিলেন।

এরপর পুত্র ইসমাইল এর দিকে লক্ষ করুন। কেমন আদর্শে বড় হয়েছেন তিনি। নিজের যবাইয়ের কথা শুনে বিন্দু মাত্র বিচলিত না হয়ে নিজেকে একমাত্র রব আল্লাহর জন্য কুরবান করতে প্রস্তুত হয়ে যান। 

আর আমাদের অবস্থা? আমরা কুরবানী খুজে বেড়াই পশুর মাঝে। অথচ আল্লাহ তা'আলা বলছেন তুমি স্বামী হও তো ইব্রাহীমের মত, তুমি পিতা হও তো ইব্রাহীমের মত। তুমি স্ত্রী হও তো হাজেরার মত, তুমি মাতা হও তো হাজেরার মত, তুমি পুত্র হও তো ইসমাইলের মত। 

এই আদর্শ পরিবারকে আমরা কখনো খুজেই পাইনি। 

যে পিতার জীবনাদর্শ পিতা ইব্রাহীমের আঃ এর সাথে মিলে না, যে মাতার জীবনাদর্শ মাতা হাজেরার সাথে মিলে না, যে পুত্রের জীবনাদর্শ পুত্র ইসমাইলের সাথে মিলে না সে হাজারটা কুরবানী দিক তার কুরবানীতে কিছুই আসে যায় না। তার কুরবানীর কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই। 

যার জীবনাদর্শ এই পরিবারের জীবনাদর্শের সাথে মিলবে না যে হাজারটা পশু কুরবানী করলে করতে পারে কিন্তু তার জীবন এই পশুর মতও হবে না,বরং আরো নিকৃষ্ট হবে কেননা হাশরের দিন এই পশু তো মাটির সাথে মিশে যাবে কিন্তু আপনি আমি মাটির সাথে মিশতেও পারবো না।

এই আদর্শেই আদর্শবান ছিলেন নবীয়ে রহমত রাসূলে আরাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার পরিবার অর্থাৎ রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রী (উম্মুল মুমিনিন) খাদিজা রাযিঃ ও আয়শা রাযিঃ কন্যা ফাতিমা রাযিঃ।
নিজেকে সাজান এই পরিবারের মত।

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.