প্রশ্ন : তাবলীগ জামাআতে ৪০দিন, ১২০দিনের নিয়মে সময় লাগানো কি বিদআত? কোনো কোনো ইসলামী আলোচকের মুখে এ নিয়ম রক্ষা করাকে বিদআত বলতে শোনা যায়। এটা কতটুকু ঠিক, জানতে চাই!
উত্তর :
না, এ নিয়মে সময় লাগানো বিদআত নয়। কারণ, বিদআতের যে সংজ্ঞা রয়েছে, তা এক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না। বিদআতের সাধারণ পরিচয় হলো, কোনো অশরঈ বিষয়কে শরীয়ত মনে করে পালন করা। দাওয়াত ও তাবলীগ ৪০দিন বা ১২০দিনের চিল্লার নিয়ম রক্ষা করাকে শরীয়ত ও ইবাদত মনে করে না। বরং এটাকে তাদের আভ্যন্তরীন নিয়ম ও নেসাব মনে করে। এরচেয়ে বেশি কিছু নয়। তাবলীগের প্রবর্তক ও নীতিনির্ধারকদের আলোচনা ও তাবলীগবিষয়ক নির্ভরযোগ্য বইপুস্তক থেকে এটাকে শরীয়তের বিষয় মনে করার প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে কোনো তাবলীগীকর্মী এমন বলে থাকলে বা মনে করলে থাকলে তা তার ব্যক্তিগত বিষয়; যা সংশোধনীয়। এর সাথে তাবলীগের কোনো সম্পর্ক নেই।
বিশ্লেষণ : দাওয়াত ও তাবলীগ একটি মুবারক দীনী জামাআত, যার উদ্দেশ্য হলো দীনের মৌলিক ও বুনিয়াদী বিষয়গুলোর শিক্ষাকরা ও শিক্ষা দেওয়া। সর্বস্তরের দীনী শিক্ষার প্রসার ঘটানো এবং পর্যায়ক্রমিকভাবে ইকামতে দীনের পথ সুগম করা। এ কাজকে তারা দল-মত-মাযহাব-ফিরকা নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে বাস্তবায়ন করতে চায়। যাতে করে দীনের মৌলিক বিষয়াবলীতে সবাই এক প্লাটফর্মে চলে আসে। এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন ঘরানা ও হালকাগুলোর মাঝে দূরত্ব ঘুচে যায় এবং সবাই কাছাকাছি চলে আসে।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে তারা দুটি পর্যায়ে করে থাকে। এক. স্থানীয়ভাবে, যাকে তারা 'মাকামী মেহনত' বলে থাকে। এটি তারা প্রসিদ্ধ ৫কাজের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার চেষ্টায় রত।
দুই. সফরের মাধ্যমে। যাকে তারা 'বেরুনি মেহনত' বলে। সফরের ক্ষেত্রে ৩দিন থেকে ৩চিল্লা পর্যন্ত নেসাব রয়েছে। অবশ্য মাদরাসা তালিবে ইলম ও উলামায়ে কেরামের জন্য ২৪ঘন্টা থেকে একসালের সুযোগ রয়েছে। এর মাঝে সবার জন্য, ৫দিন, ৭দিন, ১০দিন, ১৫দিন ২০দিন প্রভৃতি কোটা রয়েছে। ইচ্ছা করলে যেকোনো মেয়াদেই সফর করা যায়। এটা কেবলই কাজ ও কর্মীদের সুবিধার্থে এবং নিয়মানুবর্তিতা রক্ষার্থে। এই মেয়াদগুলোর কোনোটাকেই তারা সুন্নত মুস্তাহাব মনে করে না। কেবলই কাজের তারতীব মনে করে, যা শৃংখলারক্ষার্থে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিভিন্ন মেয়াদে নেসাব তৈরি করার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে।
প্রথমত, তাবলীগে একাকী সফরের কোনো নিয়ম রাখা হয়নি। জামাআতবদ্ধ হয়ে বের হওয়া বাধ্যতামূলক। সেক্ষেত্রে জামাআতবন্দী করার সুবিধার্থে এই নিয়ম করা হয়েছে। একই মেয়াদ বা কাছাকাছি মেয়াদের সাথীদেরকে একজামাআতে বন্দী করা হয়।
দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের সকলে একই সুযোগ-সুবিধার হয় না। প্রত্যেকের সুযোগ-সুবিধা ও অবসর বিচারে মেয়াদগুলো রাখা হয়েছে, যেন প্রত্যেকে নিজের সুবিধা মতো বের হতে পারে।
তৃতীয়ত, সময়ের মেয়াদ অনুসারে জামাআতকে দূরে বা কাছে প্রেরণ করা সহজ হয়।
এগুলোর কোনোটাই বাধ্যতামূলক নয়। না বের হওয়ার আগে, না বের হওয়ার পর। প্রত্যেকে স্ব স্ব সুবিধা মোতাবেক অপশনগুলো গ্রহণ করে এবং পুরো করে। তবে সকলকে বেশির চেয়ে বেশি সময় লাগানোতে উৎসাহিত করা হয় এবং প্রতিশ্রুত সময় পূর্ণ করতে উৎসাহিত করা হয়। তার উপকারার্থে এবং শৃঙ্খলা রক্ষার্থে। যা সম্পূর্ণ যৌক্তিক।
তাবলীগের সবচেয়ে আলোচিত নেসাব হলো চিল্লা-৪০দিন এবং ৩চিল্লা-১২০দিন। এই চিল্লাগুলোর উদাহরণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন সেমিস্টার বা কোর্সগুলোর মতো। স্কুল কলেজ মাদরাসায় সবখানে এরকম নিয়ম আছে। পড়ুয়া শিক্ষার্থীকে অবশ্যই নির্ধারিত মেয়াদের সেমিস্টার ও কোর্সগুলো পুরা করতে হয়। এমনকি ফরজ ইলম শিক্ষাকরার জন্য অফলাইন-অনলাইন কোর্স রয়েছে। সেগুলোর নির্দিষ্ট মেয়াদ পরা করেই তবে শিক্ষার্থীকে ইলম শিখতে হয়। তারপর তাকে সনদ ও সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। ওই মেয়াদগুলো রক্ষা করা যদি বিদআত না হয়, তা হলে এগুলো রক্ষা করা বিদআত হবে কেন? কারণ, নির্দিষ্ট মেয়াদ পুরো করাকে কেউ দীন বা ইবাদত মনে করে না; যেমনটি নামাযের রাকাআত বা রোযার সংখ্যাপূর্ণ করা ইবাদত মনে করা হয় এবং তা পূর্ণ করতে হয়।
চল্লিশদিনের নেসাব নির্ধারণ করার রহস্য?
প্রশ্ন হলো, মেয়াদ নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে যেকোনো মেয়াদই হতে পারে, সেখানে ৪০দিন করে বেছে নেওয়া হলো কেন?
এ প্রসঙ্গে প্রথম কথা হলো, যে মেয়াদই নির্ধারণ করা হোক না কেন, প্রশ্ন থেকেই যাবে এমনটি করা হলো কেন? কাজেই প্রশ্নটিকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।
দ্বিতীয়ত, দাওয়াত-তাবলীগ একটি তাসাউফগ্রাউণ্ড আন্দোলন। হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ. ছিলেন একজন খান্দানী সুফী ও পীর। মানুষের ব্যাপক হেদায়াতের লক্ষে তিনি খানকা ছেড়ে ময়দানে আসলেও এতে যুক্ত করেছেন নানাধরণের সংস্কার আন্দোলনের অভিজ্ঞতা ও সারনির্যাস। এতে রয়েছে চারখান্দানের তাসাউফের আধ্যাত্মিকতা ও মরমীবোধ, সাইয়েদ আহমাদ বেরলভীর জি হাদ ও দাওয়াতী স্পীহা, মুজাদ্দেদে আলফেসানীর তাজদীদ ও সংস্কারচিন্তা, আকাবিরে দেওবন্দের প্রজ্ঞা ও ইলমী বসীরত। যেহেতু এতে তাসাউফের সংশ্লেষণ রয়েছে, সেহেতু সেখান থেকে ৪০দিনে চিল্লাকাশীর ধারনা ধার করা হয়েছে। চল্লিশ দিনের সাময়িক সময়ের জন্য ঘরসংসার থেকে পৃথক হয়ে আল্লাহর সাথে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করা হয় এখানে। ৪০দিন করে সময় লাগানোর মাধ্যমে বুযুর্গদের চিল্লাকাশীর বরকত অর্জিত হওয়ার আশা করা যায়। বাস্তবে হচ্ছেও তাই।
তৃতীয়ত, চল্লিশ দিন সংসার থেকে পৃথক হওয়া এবং আল্লাহর জন্য একান্ত হওয়ার ব্যাপারে একটি হাদীসও রয়েছে, যদিও হাদীসটি দুর্বল। যেকারণে সুফীবুযুর্গগণ সালেক ও শাগরিদদের জন্য এ নেসাব নির্ধারণ করেছেন। তাবলীগও তাই করেছে। নবীজি সা. ইরশাদ করেন :
من أخلص لله أربعين يوما ظهرت ينابيع الحكمة من قلبه على لسانه.
যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্যই ৪০দিন অবসর করলো, আল্লাহ তাআলা তার কলব থেকে যবানে হেকমতের ফোয়ারা জারি করে দেবেন। (ফয়যুল কাদীর, ৮৩৬১, হাদীসটি যঈফ)
চতুর্থত, নবী-রাসূল ও আওলিয়ায়ে কেরামের জীবনে চল্লিশের রেয়াত করার নজীর অনেক পাওয়া যায়। যেমন, হযরত মূসা আ. তূর পাহাড়ে আল্লাহর সান্নিধ্যে ৪০দিন অতিবাহিত করেছিলেন। যার কথা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন। হযরত দাঊদ আ. তাঁর একটি ভুলের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে ৪০দিন কান্নাকাটি করেছেন। আমাদের প্রিয় নবীজি সা. ওহী লাভের পূর্বে জাবালে নূরের হেরা গুহায় আল্লাহর ধ্যান ও ইবাদতে চল্লিশদিন কাটিয়েছেন। এরপর তিনি ওহীপ্রাপ্ত হয়েছেন। নবী ও বুযুর্গদের এ আমলের সাদৃশ্যের বরকত হাসিল করা ৪০দিনের চিল্লা নির্ধারণের হেকমত হতে পারে। বুযুর্গদের কাজের অনুসরণ তো প্রসংশনীয় হয়, নিন্দনীয় হয় কীভাবে? যদি সেটা কাফির-মুশরিকদের অনুসরণ হতো, তা হলে সেটা নিন্দনীয় হতো।
পঞ্চমত, ইসলামী শরীয়ায় বিভিন্ন আমলের ফযীলত প্রসঙ্গে চল্লিশ দিনকে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন ৪০দিন তাকবীরে উলা পাওয়ার ফযীলত সম্পর্কে নবীজি সা. ইরশাদ করেন :
যে ব্যক্তির ৪০দিন প্রথম রাকাআত ছুটে যায়নি, তাকে দুটি পরোয়ানা দেওয়া হয়। একটি জাহান্নাম থেকে মুক্তির, অপরটি মুনাফেকী থেকে মুক্তির। (মুসান্নাফে আবদির রাযযাক : ২০১৯)
অন্য হাদীসে নবীজি সা. বলেছেন, পূর্ণ 'রিবাত' হলো চল্লিশ দিন। যে ব্যক্তি ৪০দিন 'রিবাত' [প্রহরা বা নিজেকে আল্লাহর রাস্তায় আটক রাখা] করলো; সেখানে সে বেচাকেনা বা কোনো সমস্যা সৃষ্টি করেনি; সে চল্লিশ দিন পর সদ্যপ্রসূত শিশুর মতো নিস্পাপ হয়ে যাবে। [মুজামুল কাবীর লিত্তাবরানী : ৭৬০৬]
হাদীসটি বাহ্যত জিহাদ ও সীমান্ত পাহারার ক্ষেত্রে উল্লেখ হয়েছে; তথাপি আভিধানিক অর্থে দাওয়াতের সফরেও প্রজোয্য হতে পারে। কারণ, এটি জিহাদী সফরের প্রস্তুতিমূলক আমল এবং এখানেও প্রতিদিন পাহারাদারীর আমল আছে। এখানেও প্রত্যেকে নিজেকে আল্লাহর রাস্তায় আটকে রাখে। আর 'রিবাত'র শাব্দিক অর্থ হলো আটকে রাখা।
তা ছাড়া অপর এক হাদীসে কষ্টকর পরিস্থিতিতে ভালোভাবে অযু করা, ঘনঘন মসজিদে গমন করা এবং নামাযের পরে নামাযের অপেক্ষা করাকে নবীজি সা. 'রিবাত' বলে উল্লেখ করেছেন। এবং দ্বারা গোনাহ মাপ হওয়া ও মর্যাদা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।(মুসলিম : ৪১) তাবলীগের সফরে এ তিনটি কাজের উপস্থিতি পাওয়া যায় এবং তার পূর্ণতা হয় ৪০দিন পুরো করার মাধ্যমে, যেমনটি হাদীসে উল্লেখ হয়েছে।
ষষ্ঠত, প্রাকৃতিক নানা বিষয়েও আল্লাহ তাআলা ৪০দিনের নেসাবকে ব্যবহার করেছেন। যেমন আল্লাহ তাআলা মানবসৃষ্টির নানা পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ৪০দিনের উল্লেখ করেছেন। মানবভ্রণ মায়ের পেটে ৪০দিন বীর্যকারে অবস্থান করে, এর ৪০দিন রক্তকারে, এরপর ৪০দিন গোশতপিণ্ডাকারে। এরপর তার মধ্যে প্রাণের সঞ্চার হয়। (সহীহ বুখারী, মুসলিম : ৪৪)
৩চিল্লা বা ১২০দিনের মেহনতের পর একজন পাপীতাপীর মধ্যে ঈমান ও দীনের প্রাণসঞ্চার হওয়ার আশা করা অযৌক্তিক নয়; যেখানে এমন ইতিবাচক পরিবর্তনের অগণিত নজীর রয়েছে, যা দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট।
সপ্তমত, কুরআন সুন্নাহ ও সীরাতে ভালোমন্দ প্রায় অর্ধশত বিষয়ে ৪০সংখ্যাটির ব্যবহার পাওয়া যায়। এখানে তা উল্লেখ করার সুযোগ নেই।
সুতরাং আল্লাহ তাআলার সুন্নাত ও নবীরাসূলগণের আমলের অনুসরণে কোনো মেহনত/সংগঠন যদি তার কোনো কর্মসূচি ৪০দিন মেয়াদী নির্ধারণ করে, যদি আওলিয়া ও সুফিয়ায়ে কেরাম শিষ্যদের জন্য সেরকম নেসাব ঠিক করে দেন; তাতে আপত্তি করার কি আছে? বরং এটি প্রসংশা পাওয়ার উপযুক্ত, যতক্ষণ না এটাকে বরকত ও মুশাবাহাত ও তাফাউলের স্তরে রাখা হয়; এবং সুন্নত-মুস্তাহাব বা ইবাদত মনে করা না হয়। দাওয়াত ও তাবলীগের মুরুব্বীদের সাথে দীর্ঘ চলাফেরায় কখনো এটাকে শরীয়তের কোনো বিষয় বা সুন্নত মুস্তাহাব দাবী করতে শুনিনি। বরং এটিকে তাঁরা 'তাবাররুক' বলে উল্লেখ করেছেন এবং কিছু দৃষ্টান্তের অনুসরণ বলেছেন।
কাজেই এ নিয়ে অহেতুক সংশয় বা বিতর্ক না করে মূল কাজে মনোনিবেশ করা উচিত। চাই যে কোনো মেয়াদেই হোক না কেন। আর তা হলো নিজের সংশোধন ও আত্মিক-আধ্যাত্মিক উন্নতির নিমিত্ত আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া এবং আল্লাহর দীন কায়েমের জন্য সাধ্য মোতাবেক শ্রমঘাম দেওয়া। আল্লাহ তাআলা আমাদের বুঝার ও আমল করার তাওফীক দিন। আমীন!
দারুল হিকমাহ
৩১/১০/২১