তাকলীদে শাখসী অর্থাৎ নির্দিষ্ট মাযহাব মানার হাকীকত

 🌿🍀🍀🍀🍀তাকলীদে শাখসী অর্থাৎ নির্দিষ্ট মাযহাব মানার হাকীকত🌻🌻🌻🌻🌻🌻

প্রবৃত্তির অনুসরণ করে নিজের খেয়াল-খুশি মতো জীবন যাপন করা নিষিদ্ধ ও হারাম। কুরআন হাদীসে এ ব্যাপারে অসংখ্য বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। এজন্য এ ব্যাপারে উম্মতের ঐক্যমত রয়েছে যে, দ্বীনী বিষয়াদিতে নিজ খেয়াল খুশি ও প্রবৃত্তির অনুসরণ হারাম। সে মতে কোনো ব্যক্তি যদি স্বার্থ ও প্রবৃত্তিতাড়িত হয়ে কোনো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয় অতঃপর স্বার্থের অনুকূলে দলিল খুঁজতে কুরআন হাদীস চষে বেড়ায়, তাহলে উক্ত চিন্তাধারা ও কর্মপদ্ধতির বিচারে সে প্রবৃত্তির অনুগামী বিবেচিত হবে, যদিও ঘটনাক্রমে তার কর্মকাণ্ডের সমর্থনে কুরআন হাদীসে কোনো বক্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়।


হাফেয ইবনে তাইমিয়্যা রহ. তার এক নিবন্ধে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পর উম্মতের ঐক্যমত উল্লেখ করে বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজের খেয়াল খুশির অনুসরণে আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের মাযহাবসমূহে দলীল খুঁজে বেড়ায় এবং সে অনুযায়ী আমল করে তা কোনো ইমামের মাযহাবের উপর চাপিয়ে দেয়, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসারী নয়; সে আসলে প্রবৃত্তির অনুগামী।


একেক মাসআলায় নিজের মন মতো একেক ইমামের দারস্থ হওয়ার আলোচনা শেষে তিনি লিখেছেন, ‘এটা মেনে নেয়া যায় না।


لان ذلك يفتح باب التلاعب ويفتح الذريعة الى ان يكون التحريم والتحليل بحسب الاهواء.

কেননা এই কর্মপদ্ধতি দ্বীনকে খেলনায় পরিণত করার দরজা খুলে দিবে এবং হালাল-হারাম নির্ধারণে প্রবৃত্তিকে ভিত্তি বানানোর উপলক্ষ হয়ে দাঁড়াবে। (ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যা ২/২৪০)


মোটকথা, দ্বীনের ব্যাপারে প্রবৃত্তির অনুসরণ উম্মতের ঐক্যমতে হারাম। এদিকে অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে জনসাধারণকে যদি প্রত্যেক মাসআলা নিজের পছন্দ মতে বিভিন্ন ইমামের মতানুযায়ী আমল করার ছাড়পত্র প্রদান করা হয় যে, তারা যখন ইচ্ছা ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর অনুসরণ করবে আবার যখন ইচ্ছা ইমাম শাফেয়ী রহ. এর অনুসরণ করবে; যখন ইচ্ছা ইমাম মালেক রহ.কে মেনে চলবে, আবার যখন ইচ্ছা ইমাম আহমদ কিংবা অন্য কাউকে মেনে চলবে তাহলে এর অনিবার্য পরিণতি তাই হবে যাকে হাফেয ইবনে তাইমিয়্যা রহ. উম্মতের ঐক্যমতে হারাম বলেছেন।


শরী‘আতের এই বিশেষ কল্যাণের প্রতি লক্ষ্য রেখে উম্মতের দ্বীন ও ঈমানের হেফাযত নিশ্চিত করতে নিরাপদ মনে করা হয়েছে যে, তাদের জন্য সমস্ত মাসআলায় নির্দিষ্ট একজন ইমামের তাকলীদকে ওয়াজিব করে দেয়া হবে।


মূল বিষয় হলো, প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বেঁচে থাকা, আর এর জন্য যেহেতু প্রবৃত্তিপূজার এই যুগে উম্মতকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে না দিয়ে নির্দিষ্ট এক ইমামের মাযহাব মানতে বাধ্য করার বিকল্প নেই, তাই মূল লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম হওয়ায় তাকলীদে শাখসীকে ওয়াজিব করে দেয়া হয়েছে। তাকলীদে শাখসীকে যদিও পরিস্থিতি ও সময়ের দাবি অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে আইনত ওয়াজিব করা হয়েছে; কিন্তু এর মূল ভিত্তি নবীজীর জীবদ্দশায় তাঁরই হাতে স্থাপিত হয়েছিল।


রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের যামানায় বিভিন্ন দেশ ও শহর-নগর বিজিত হয়েছে। বিভিন্ন দেশে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন এবং সে দেশের অধিবাসীদেরকে গভর্নরদের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন।


উদাহরণতঃ নাজরান বিজয় হলে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আমর ইবনে হাযম রা. কে সেখানের গভর্নর বানালেন। আর নাজরানবাসীকে বলে দিলেন, তারা যেন আমর ইবনে হাযমের কথা অনুযায়ী চলে। তো এটা কি নির্দিষ্ট ইমামের মতামত ও মাযহাবের অনুসরণ নয়? অনুরূপ ইয়ামান বিজয় হলে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মুআয ইবনে জাবাল ও আবূ মুসা আশআরী রা. কে ইয়ামানের দুই অঞ্চলের গভর্নর করে পাঠালেন এবং ইয়ামানবাসীকে তাদের অনুসরণের নির্দেশ দিলেন। কেননা সুদূর নাজরান আর ইয়ামান থেকে সেখানকার অধিবাসীদের মদীনায় এসে নবীজীর নিকট থেকে সব ব্যাপারে সরাসরি সমাধান নেয়া সম্ভব ছিলো না। এজন্য নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে গভর্নরদের কথা অনুযায়ী আমল করতে বলেছেন। এটা কি নির্দিষ্ট ইমামের তাকলীদ নয়? এবং স্বয়ং নবীজীর জীবদ্দশায় তারই আদেশে নির্দিষ্ট মাযহাবের অনুসরণ নয়? এখানে কারও একথা বলার সুযোগ নেই যে, এসব এলাকার অধিবাসীরা তো গভর্নরদের নিজস্ব মতামত ও মাযহাব অনুসরণ করেননি বরং তারা তাদের নিকট থেকে শুনে শুনে কুরআন হাদীসের অনুসরণ করেছেন। কারণ ইয়ামান সফরের প্রাক্কালে নবীজীর এক প্রশ্নের জবাবে হযরত মুআয বলেছিলেন, কোনো সমস্যার সমাধান কুরআনে কিংবা হাদীসে না পেলে আমি আমার রায় দ্বারা ইজতিহাদ করে ফায়সালা দেব। তো এই ফায়সালা তো তার নিজস্ব মতের ভিত্তিতেই দেয়া হতো। আর নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এ জবাবে অত্যন্ত সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। যারা নির্দিষ্ট ইমামের তাকলীদ করাকে শিরক বলে থাকেন তাদের বক্তব্য অনুযায়ী নবীজী কি আহলে নাজরান ও ইয়ামানবাসীকে শিরক শিক্ষা দিয়েছিলেন? নাউযুবিল্লাহ!! শুধু নাজরান আর ইয়ামান কেন নবীজীর যুগে যতগুলো অঞ্চল বিজিত হয়েছে, সবখানেই তিনি এই ব্যবস্থা চালু করেছিলেন সে সব এলাকার বাসিন্দারা নিজ নিজ গভর্নরের ফিকহ ও ফাতাওয়ার কেমন কঠিন তাকলীদ করতেন নিম্নোক্ত বর্ণনায় তা লক্ষ্য করুন,


عن عمرو بن ميمون قال قدم علينا معاذ باليمن الى قوله فالقيت محبتي عليه فما فارقته حتى دفنته بالشام ثم نظرت الى افقه الناس بعده فاتيت ابن مسعود فلزمته حتى مات.


আমর ইবনে মাইমুন বলেন, হযরত মুআয ইবনে জাবাল রা. ইয়ামানে আগমন করলেন। আমি তাকে ভালোবাসলাম। আমি তাকে শামে দাফন করার আগ পর্যন্ত তার থেকে পৃথক হইনি। তারপর আমি মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বড় ফকীহর সন্ধান করে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর দুয়ারে হাজির হলাম এবং তাঁর খিদমতে লেগে রইলাম। এক সময় তারও ইন্তিকাল হয়ে গেল। (আবূ দাউদ মুজতাবায়ী পৃ.৬৮)


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর খলীফাতুল মুসলিমীনের নির্দেশে প্রত্যেক শহরে এক একজন করে মুফতী নিয়োগ দেয়া হয়। মক্কায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, মদীনায় হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত, কুফায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, সিরিয়ায় মুআয ইবনে জাবাল, ইয়ামানে আবূ মুসা আশআরী প্রমুখ মুফতী সাহাবীকে নিয়োগ দেয়া হয়। এসব শহরের অধিবাসীগণ নিজ নিজ মুফতী সাহাবীর ফাতাওয়া অনুসরণ করে চলতেন।


এসব শহরের লোকজন নিজ নিজ মুফতীর মাযহাবকে এত কঠোরভাবে অনুসরণ করতেন যে, নিজেদের মুফতীকে ছেড়ে অন্য মুফতীর ফিকহ ও ফাতাওয়া মানতে প্রস্তুত ছিলেন না। বুখারী শরীফের ১৭৫৮-১৭৫৯ নং হাদীস এর স্পষ্ট দলীল। সেখানে বিদায় তাওয়াফের পূর্বে হায়েয শুরু হওয়া মদীনার এক মহিলা হজ্জযাত্রীর কথা আলোচিত হয়েছে। সমস্যার সমাধানে মদীনার লোকজন মক্কার মুফতী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এর ফাতাওয়া মদীনার মুফতী হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত রা. এর ফাতাওয়ার বিপরীত হওয়ায় মানতে রাজি হননি। যদিও তাহকীকের পর মেনে নিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে চার মাযহাবের ইমামগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ফাতাওয়া ও সুন্নাহ এবং মুফতী সাহাবীদের ফাতাওয়াসমূহ একত্রিত করে অধ্যায় ও পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত করে সকল মুসলমানের জন্য দ্বীনের উপর আমল করা সহজ করে দিয়েছেন। কোনো ইমামই মনগড়া কথা বলেননি, তাদের প্রত্যেক মতামতের পেছনে অবশ্যই শরী‘আতের দলীল চতুষ্টয়ের কোনো না কোনো দলীল বিদ্যমান রয়েছে।


যা হোক উপর্যুক্ত আলোচনায় প্রতীয়মান হলো, স্বয়ং নবীযুগে এবং পরবর্তীতে সাহাবা যুগেও তাকলীদে শাখসী ব্যাপক আকারে বিদ্যমান ছিল। তবে সেটা কল্যাণযুগ হওয়ায়, মানুষের মধ্যে দিয়ানতদারী ও বিশ্বস্ততা পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান থাকায় এবং জনসাধারণ প্রবৃত্তির অনুসারী ও আত্মপূজারী না হওয়ায় নির্দিষ্ট মাযহাবের অনুসরণকে তখন আইনত ওয়াজিব করা হয়নি। যদিও কার্যত প্রায় সব শহরেই এর প্রচলন ছিল। তারপর যখন ফেতনা ফাসাদ ছড়িয়ে পড়ল। মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস, খেয়ানত ও প্রবৃত্তিপূজার অবস্থা পরিলক্ষিত হলো, দেখা গেল লোকেরা আইম্মায়ে কেরামের মতপার্থক্যকে নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। তখন দ্বীনের অতন্দ্র প্রহরী উলামায়ে কেরাম আইম্মায়ে মুজতাহিদীন সংকলিত মাযহাব চতুষ্টয়ের কোনো এক মাযহাব অনুযায়ী শরী‘আতের উপর আমল করাকে তাদের জন্য আইনত ওয়াজিব করে দিলেন। এটা ছিল মুসলমানদের উপর আল্লাহ তা‘আলার এক বিরাট অনুগ্রহ। আল্লাহতা‘আলা কুদরতীভাবে এ ব্যবস্থা না করলে আমাদের জন্য দ্বীন পালন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যেত।


আজকের এই প্রবৃত্তিপূজার রমরমা বাজারে সকল প্রকার হীনস্বার্থের উর্ধ্বে উঠে কেউ যদি খালেস দ্বীন ইসলামের উপর আমল করতে চায়, নিজেকে সত্যিকার মুসলিম হিসেবে আল্লাহর দরবারে পেশ করতে চায় তার জন্য মাযহাব চতুষ্টয়ের কোনো একটিকে আঁকড়ে ধরার বিকল্প নেই। কেউ যদি হঠকারিতা বশতঃ এ ওয়াজিব কর্তব্যকে পিছনে ঠেলে দেয়, নিজের মনমত বল্গাহীনভাবে কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণের দুঃসাহস দেখায় তাহলে ইবনে তাইমিয়্যার বক্তব্যের আলোকে বলতে হয়, সে আসলে সীরাতে মুস্তাকীমের অভিযাত্রী নয়; তার চলাফেলা ভয়ঙ্কর অন্ধগলিতে ও ধ্বংসের চোরাবালিতে।

লিখেছেন ঃ Mawlana Mujahidul Islam

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.