মাযহাব কেন মানি ধারাবাহিক আলোচনা পর্ব-৭

 


🌿🌿🌷🌿মাযহাব কেন মানি ধারাবাহিক আলোচনা পর্ব-৭🌻🌻🌻🌻

💝💝🌼ইজমা অস্বীকার ও অমান্যকারীর অশুভ পরিণতি🌼🌼

কুরআন-হাদীসের আলোকে ইজমা অস্বীকার ও অমান্যকারীর অশুভ পরিণতিঃ

ইজমা তথা উম্মতে মুহাম্মাদিয়ার বিজ্ঞ উলামাদের ঐক্যমত শরী‘আতের দলীল হওয়ার বিষয়টি প্রবন্ধের শুরুর দিকে কুরআন-হাদীসের বাণী, সাহাবায়ে কেরামের মন্তব্য ও বিভিন্ন মনীষীর বক্তব্যের মাধ্যমে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তারপর উপর্যুক্ত আলোচনায় দেখানো হয়েছে যে, সঠিক পন্থায় দ্বীন-ধর্ম পালনের জন্য চার মাযহাবের কোন এক মাযহাব অনুসরণ করা ওয়াজিব অর্থাৎ অত্যাবশ্যক হওয়ার উপর উম্মতের ইজমা ও ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এখন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষ যদি উম্মতের ইজমার বিরোধিতা, অস্বীকার কিংবা অবজ্ঞা করে তাহলে এর পরিণতি কী হবে তা জানা দরকার, যেন এর অশুভ পরিণতি থেকে নিজেকে বাঁচানো সম্ভব হয়। আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেন,

وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا [النساء : ১১৫]

অর্থঃ আর যে ব্যক্তি রাসুলের বিরোধিতা করবে, তার নিকট সত্য প্রকাশিত হওয়ার পর এবং মুসলমানদের পথ পরিত্যাগ করে অন্য পথ অবলম্বন করবে তাহলে সে যা কিছু করে আমি তাকে করতে দেব এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা হচ্ছে নিকৃষ্ট গন্তব্যস্থান। (সুরা আন নিসা, আয়াত ১১৫)

নির্ভরযোগ্য তাফসীর গ্রন্থ থেকে আয়াতে কারীমার তাফসীর তুলে ধরা হচ্ছেঃ

১। বিশিষ্ট মুফাস্সির শায়খ ওয়াহবা আয যুহাইলী রহ. তাফসীরে করতুবীর বরাতে স্বীয় তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরুল মুনীরে লিখেনঃ

قال العلماء وعلى رأسهم الامام الشافعي رح في قوله تعالى وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ...... دليل على صحة القول بالاجماع اي اتفاق المجتهدين من امة محمد صلعم بعد وفاته في عصر من العصور على حكم شرعي لأنه تعالى قرن اتباع غير سبيل المؤمنين إلى مباينة الرسول فيما ذكر له من الوعيد فدل على صحة اجماع الامة لالحاقه الوعيد لمن اتبع غير سبيل المؤمنين.

অর্থঃ উলামায়ে কেরাম [ইমাম শাফেয়ী রহ. যাদের শীর্ষস্থানীয়] আল্লাহ্ তা’আলার বাণী ومن يشاقق الرسول إلخ সম্পর্কে বলেছেন, আয়াতটি ইজমা অর্থাৎ, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের পর কোন যুগে শরী‘আতের কোন বিধানের ব্যাপারে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মতের মুজতাহিদ ব্যক্তিবর্গের ঐক্যমতে পৌঁছা-শরী‘আতের দলীল হওয়ার প্রমাণ। কারণ আল্লাহ্ তা’আলা এখানে মুমিনদের বিপরীত পথ অবলম্বন করাকে রাসূলের নির্দেশ পরিত্যাগের শাস্তির সঙ্গে একত্রে জুড়ে দিয়েছেন। কাজেই আয়াতটি উম্মতের ইজমা দলীল হওয়ার প্রমাণ বহন করছে। কেননা এখানে মুমিনদের বিপরীত পথ অবলম্বনকারীকে (এমন ভয়াবহ) শাস্তির ধমক দেয়া হয়েছে। (যা কেবলমাত্র ফরজ নির্দেশ পরিত্যাগের বেলায়ই দেয়া হয়ে থাকে। (তাফসীরুল মুনীর-৩/২৮১)

২। আয়াতে কারীমায় দুটি কাজকে মহা অপরাধ ও জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার কারণ সাব্যস্ত করা হয়েছে। এক.রাসূলের বিরোধিতা। স্পষ্ট যে, রাসূলের বিরোধিতা কুফর ও ধ্বংসাত্মক অপরাধ। দুই.যে ব্যাপারে সকল মুসলমান ঐক্যমতে পৌঁছেছে তা পরিত্যাগ করে বিপরীত অন্য কোন পথ অবলম্বন করা। এর দ্বারা জানা গেল, উম্মতের ইজমা তথা ঐক্যমত শরী‘আতের দলীল। অর্থাৎ যেমনিভাবে কুরআন-সুন্নাহর বিধি-নিষেধের উপর আমল করা অত্যাবশ্যক অনুরূপ যে ব্যাপারে উম্মতের সুযোগ্য আলেম সমাজের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হবে তার উপর আমল করাও ওয়াজিব। এর বিরোধিতা করা গর্হিত অপরাধ। যেমন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম- এক হাদীসে ইরশাদ করেছেন,
يد الله على الجماعة من شذ شذ في النار

অর্থাৎ জামা’আতের উপর আল্লাহ্ তা’আলার হাত রয়েছে। যে ব্যক্তি মুসলমানদের জামা’আত থেকে পৃথক হয়ে যাবে তাকে পৃথক করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (মা’আরিফুল কুরআন, মুফতী শফী রহ. ২/৫৪৭)

৩. তাফসীরে উসমানীতে বলা হয়েছেঃ ‘আকাবিরে উলামা এই আয়াত থেকে এ মাসআলাও বের করেছেন যে, উম্মতের ইজমা ও ঐক্যমতের বিরোধিতা ও অস্বীকারকারী ব্যক্তি জাহান্নামী। অর্থাৎ ইজমায়ে উম্মত মান্য করা ফরজ। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, মুসলমানদের জামা’আতের উপর আল্লাহ্ তা’আলার হাত বা সাহায্য রয়েছে। যে ব্যক্তি ভিন্ন পথ গ্রহণ করল সে জাহান্নামে পতিত হলো। (তাফসীরে উসমানী ১/৩১৫) আরও বিস্তারিত জানতে তাফসীরে কাশ্শাফ ১/৫৫৪, তাফসীরে ইবনে কাসীর ২/৪৬০, তাফসীরে মাযহারী ২/৪৫৩।

এখন নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সতর্কবাণী লক্ষ্য করুন। তিনি বলেছেন, من فارق الجماعة شبرا فقد خلع الله ربقة الاسلام من عنقه

অর্থঃ যে ব্যক্তি মুসলমানদের জামা’আত থেকে এক বিঘাত পরিমাণ (ও) পৃথক হলো সে ব্যক্তির গ্রিবা থেকে আল্লাহ্ তা’আলা ইসলামের রজ্জুকে বিচ্ছিন্ন করে দিলেন। (আবূ দাউদ শরীফ, হা-৪৭৫৮)

দেখুন আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রহ., হাফেয যাহাবী রহ., আল্লামা ইবনে খালদুন রহ., শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ রহ. প্রমূখ বিশ্ববরেণ্য মুহাদ্দিস, ঐতিহাসিক ও সংস্কারক ব্যক্তিবর্গ যেখানে চার ইমামের কোন একজনের মাযাহাব মানা ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে ইজমা বর্ণনা করেছেন এবং কুরআন-হাদীসও ইজমা অমান্যকারীদের প্রতি নিকৃষ্টতম স্থান জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করেছেন, সেখানে আমাদের কর্তব্য ও করণীয় একেবারে স্পষ্ট। কাজেই ইজমার বিপরীতে নির্দিষ্ট ইমামের অনুসরণ বাদ দিয়ে নিজ বুদ্ধি-বিবেচনার পুঁজি খাটিয়ে কুরআন-হাদীসের উপর আমল করতে যাওয়া এবং এ পথে মুক্তি অন্বেষণ করা কেবল ধ্বংস ও বরবাদীই ডেকে আনবে। হায়! আর কবে আমরা একরোখা মনোভাব ত্যাগ করে সত্যকে বুকে ধারণ করার সৎসাহস দেখাব! আল্লাহ্ তা’আলাই তাওফীকদাতা।

🌷🌷🍀💟ইমাম আবূ হানীফা রহ.এর শ্রেষ্ঠত্ব🌺🌺🌺💗💗🌿🌿🌿🌿

অনুসৃত চার মাযাহাবের মান্যবর চার ইমামের প্রত্যেকেই কুরআন-হাদীস সম্পর্কে শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ ছিলেন এ কথা সর্বজনস্বীকৃত। তবে তুলনামূলক বিচারে ইমাম আবূ হনীফা রহ. ছিলেন তাদের সর্বশ্রেষ্ঠজন। ফিকহশাস্ত্র সংকলন ও এর প্রচার-প্রসারে তাঁর বিস্ময়কর অবদান সম্পর্কে ছিটেফোঁটা অবগতি থাকলেও ইনসাফপ্রিয় প্রতিটি মানুষ এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য হবেন। ফিকহশাস্ত্রে তাঁর অবদানের কথা আলোচনার পূর্বে আমরা ফিকহশাস্ত্র ও এর ক্রমবিকাশ নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করতে চাই।

বস্তুতঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যামানায় শরী‘আতের বিধানাবলীর মান নির্ণীত ছিল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের সামনে উযু করতেন। মুখে বলতেন না যে, এটা ফরজ, এটা ওয়াজিব আর এটা মুস্তাহাব। সাহাবায়ে কেরাম তাঁকে দেখে ঠিক সেভাবে উযু করতেন। নামাযের অবস্থাও ছিল তাই। অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম ফরজ, ওয়াজিব ইত্যাদির বিস্তারিত খোঁজ-খবর নিতেন না বা নেয়ার প্রয়োজন মনে করতেন না। তাঁরা যেভাবে রাসূল ﷺ -কে নামায আদায় করতে দেখতেন হুবহু সেভাবেই নিজেরা নামায আদায় করতেন। হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, আমি কোন জাতিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবাদের চেয়ে উত্তম দেখিনি। কিন্তু তাঁরা নবীজীর গোটা জীবনে ‘তেরো’র অধিক মাসআলা জিজ্ঞেস করেননি। এর সবগুলোই আবার কুরআনে কারীমে বিদ্যমান। যে সমস্যাগুলো না জানলেই নয় সেগুলোই কেবল জিজ্ঞেস করতেন। (সুনানে দারেমী-মুকাদ্দিমা ১২৭)

অনেক সময় এমন হতো যে, কেউ কোন কাজ করেছে, তিনি সেটাকে ভালো বলেছেন অথবা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। এভাবে আদেশ নিষেধ সাধারণ সমাবেশে প্রকাশ পেত। আর সাহাবায়ে কেরাম সে পরিস্থিতিতে প্রদত্ত নবীজীর বক্তব্য স্মরণ রাখতেন। নবীজীর ইন্তেকালের পর ইসলামের বিজয় নিশান দূর-দুরান্তে ছড়িয়ে পড়ল। ফলে সামাজিক জীবনের পরিধিও বর্ধিত হতে লাগল। সমস্যা এত বেশি ঘটতে লাগল যে, ইজতিহাদ ও মাসআলা আহরণের প্রয়োজন দেখা দিল। এতে কুরআন-হাদিসে বর্ণিত সংক্ষিপ্ত বিধি-নিষেধের বিস্তৃত ব্যাখ্যার প্রতি মনোযোগ দিতে হলো।

উদাহরণতঃ কেউ নামাযে ভুলক্রমে কোন আমল ছেড়ে দিল। এখন বিতর্ক এই দেখা দিল যে, তার নামায হলো কি হলো না, তো এর সমাধান কল্পে নামাযের কার্যাবলির সবগুলোকেই ফরজ বলে দেয়া সম্ভব ছিল না। কাজেই সাহাবায়ে কেরামকে নামাযের কার্যাবলির মান নির্ণয় করে নিতে হয়েছে যে, এই এই কাজ ফরজ, ওয়াজিব আর এগুলো সুন্নাত বা মুস্তাহাব। বলাবাহুল্য আমলগুলোর মান নির্ণয়ের এ ইজতিহাদ ও গবেষণায় যে মূলনীতি অনুসরণ করা হতো, সে ব্যাপারে সকল সাহাবীর একমত হওয়া সম্ভব ছিল না। এজন্য মাসআলাসমূহে মতভেদ দেখা দিয়েছে এবং অধিকাংশ মাসআলায় সাহাবাদের মতভিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া এরূপ অনেক ঘটনারও উদ্ভব ঘটেছে, যেগুলোর মূল ছিল নবীযুগে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা। এরূপ ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামকে মূল ঘটনার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তার শাখা-প্রশাখা চিহ্নিত করে অতঃপর চলমান ঘটনাকে অনুরূপ ঘটনার সাথে সমন্বিত করে সমস্যার সমাধান করতে হয়েছে। এই যে বিশ্বস্ত ও বিশেষজ্ঞ গবেষক কর্তৃক যথাযোগ্য পন্থায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টার মাধ্যমে কুরআন-হাদীসের ব্যবহারিক দিকটিকে উদ্ঘাটন ও আহরণ করা পরিভাষায় একে বলা হয় ইজতিহাদ। আর উদঘাটিত ও আহরিত মাসআলাকে বলা হয় ফিকহ। ফিকহ কুরআন-হাদীস বর্হিভুত কোনো বস্তু নয়; বরং কুরআন-হাদীসেরই ব্যবহারিক দিক।

ইনশা আল্লাহ ধারাবাহিক আলোচনা চলবে 

  writer: Mawlana Mujahidul Islam

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.