সম্প্রতি মাওলানা তাকি উসমানী হাফি. একটি মুসাফাহা করার ছবি বিভিন্ন জনের টাইমলাইনে নজরে পড়ে,যেটা কে দিয়ে বিভিন্ন জন পোশাক থেকে নিয়ে মুসাফাহা করার বিভিন্ন নিয়মের কথা বলতেছেন।
একজন শ্রদ্ধেয় আলেম তার ভাষায় বলেন,
"আরেকটা বিষয়, মুসাফাহ করছেন এক হাতে! আবার খেয়াল করুন। আমাদের তাহকিক মতে, দুই হাতে মুসাফাহ উত্তম, তবে এক হাতে করলেও সমস্যা নেই।"
আমার আজকের প্রবন্ধে শুধু মাত্র মুসাফাহা নিয়ে আলোকপাত করবো যে, আমাদের তাহকিক মতে এক হাতে মুসাফাহা করার কতটুক ভিত্তি আছে।
শুরুতেই ভাইরাল সেই মুসাফাহার চিত্রের ব্যাপারে বলে রাখা ভালো তাকি উসমানি সাহেবের ব্যাপারে সম্ভাবনা রয়েছে যে, ১.তিনি প্রথমে দু'হাতেই মুসাফাহা করেছেন আর যখন এক হাত ছেড়ে দিয়েছেন তখন হয়তো কেউ ছবিটা তুলেছেন। ২.অথবা তার হাতে লাঠি ছিল এবং তিনি মা'জুর মানুষ সে জন্য হয়তো এক হাতে মুসাফাহা করেছেন।
এব্যাপারে তার থেকে স্পষ্ট কোনো বর্ণানা উল্লেখ না করে পিকচার দিয়ে ফতোয়া দেওয়া মুটেও উচিৎ হয় নি।
মুসাফাহা দুই হাতে করাই সুন্নত। রাসুল সা. আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.এর সাথে দুই হাতে মুসাফাহা করেছেন। এমনকি যুক্তিগত দিক থেকেও স্বীয় মুসলমান ভাইয়ের সাথে দুই হাতে মুসাফাহা করার মধ্যে যে পরিমাণ বিনয়, নম্রতা, স্নেহ, ভালবাসা পাওয়া যায় সেটা এক হাতে মুসাফাহা করার মধ্যে পাওয়া যায় না।
আমিরুল মু'মিনিন ফিল হাদিস ইমাম বুখারি রহি. সহীহ বুখারি শরীফে এবিষয়ে দুটি বাব স্থাপন করেছেন।
১."বাবুল মুসাফাহা" ২.“বাবুল আখজ বিল ইয়াদাইন ” তথা মুসাফাহার সময় উভয় হাত ধরা প্রসঙ্গে।
" বাবুল মুসাফাহা" তথা প্রথম অধ্যায়ে ইমাম বুখারি রহ. ইহা বর্ণানা করেছেন যে, মুসাফাহা করা একটি সুন্নত আমল। সেটা প্রমাণ করার জন্য ইমাম বুখারি রহ. চারটি দলিল বর্ণানা করেছেন।
১. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.বলেন, নবী করিম সা.আমাকে তাশাহুদ শিক্ষা দিয়েছেন এমতাবস্থায় যে আমার হাত রাসুল সা. এর দুই হাতের মাঝে ছিল।
’’وَقَالَ ابْنُ مَسْعُوْدٍؓ:عَلَّمَنِیْ النَّبِیُّ صَلّٰی اللّٰہُ عَلَیْہِ وَسَلَّمَ التَّشَہُّدَ ، وَکَفِّی بَیْنَ کَفَّیْہِ۔‘‘
২. হযরত কা'ব ইবনে মালেক রা.বলেন যে,আমি মসজিদে নববীতে আসলাম । তখন রাসুল সা. এর উপস্থিতিতেই হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা. দাড়াঁলেন এবং তিনি আমার সাথে মুসাফাহা করলেন এবং মুবারকবাদ জানালেন।
’’قَالَ کَعْبُ بنُ مَالِکٍ :حَتَّی دَخَلْتُ المَسْجِدَ، فَإِذَا رَسُولُ اللّٰہِ صَلّٰی اللّٰہُ عَلَیْہِ وَسَلَّمَ جَالِسٌ حَوْلَہُ النَّاسُ، فَقَامَ إِلَیَّ طَلْحَۃُ بْنُ عُبَیْدِ اللّٰہِ یُہَرْوِلُ حَتّٰی صَافَحَنِیْ وَہَنَّأَنِیْ۔‘‘
৩. হযরত কাতাদা রা. আনাস রা.কে জিজ্ঞাসা করলেন যে, রাসুল সা. এর সাহাবায়ে কেরামের মাঝেও কি মুসাফাহার প্রচলণ ছিল? তখন আনাস রা. উত্তর দিলেন হ্যাঁ অবশ্যই ছিল।
’’عَنْ قَتَادَۃَؒ قَالَ:قُلْتُ لِأَنَسٍؓ: أَکَانَتِ الْمُصَافَحَۃُ فِیْ أَصْحَابِ النَّبِیِّ صَلَّی اللّٰہُ عَلَیْہِ وَسَلَّمَ؟ قَالَ: نَعَمْ۔‘‘
৪. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হিশাম রা.বলেন, আমরা রাসুল সা.এর সাথেই ছিলাম। আর রাসুল সা.তখন উমর ইবনে খাত্তাব রা.এর হাত ধরে রেখে ছিলেন।
’’کُنَّا مَعَ النَّبِیِّ صَلَّی اللّٰہُ عَلَیْہِ وَسَلَّمَ، وَہُوَ أٰخِذٌ بِیَدِ عُمَرَ بْنِ الخَطَّابِ۔‘‘
উল্লেখিত চারটি দলীল দ্বারা ইমাম বুখারি রহ. এটা প্রমাণ করতে চাচ্ছেন যে, মুসাফাহা করা একটি সুন্নত আমল। এমনকি স্বয়ং ইমাম বুখারি রহ.তার কিতাব "আদাবুল মুফরাদে "ও বাবুল মুসাফাহা নামে বাব স্থাপন করেছেন এবং তার অধীনে দুটি হাদিস বর্ণানা করেছেন।
আল্লামা ইবনে বাত্তাল রহ.বলেন অধিকাংশ ওলামায়ে কেরামের মতে মুসাফাহা করা একটি উত্তম আমল।
ইমাম নববী রহি.বলেন, সাক্ষাতের সময় মুসাফাহা করা সুন্নত। আর এর উপরই ইমামগণের ইজমা।
’’قَالَ ابنُ بَطَّالٍؒ الْمُصَافَحَۃُ حَسَنَۃٌ عِنْدَ عَامَّۃِ الْعُلَمَائِ....وَقَالَ النَّوَوِیُّ: الْمُصَافَحَۃُ سُنَّۃٌ مُجْمَعٌ عَلَیْہَا عِنْدَ التَّلَاقِیْ۔‘‘
তারপর ইমাম বুখারি রহ.সহীহ বুখারিতে দ্বিতীয় বাব স্থাপন করলেন “বাবুল আখজ বিল ইয়াদাইনিল মুসাফাহা ”নামে আর এই বাবে ইমাম বুখারি রহ.
মুসাফাহা করার পদ্ধতি বর্ণানা করলেন যে, মুসাফাহা দুই হাতে করতে হবে। বিজ্ঞ আলেমগণ ভাল ভাবেই জানেন যে, ইমাম বুখারী রহ. এর এ বাবের দ্বারা উদ্দেশ্য এটাই যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উভয় হাতেই মুসাফাহা করতেন। আর পরবর্তীতেও উম্মতের মাঝে এ আমলই জারী ছিলো।
ইহা প্রমাণ করার জন্য ইমাম বুখারি রহ.দু'জন বড় বড় মুহাদ্দিসীনে কেরামের আমল পেশ করলেন যে, হাম্মাদ ইবনে যায়েদ আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. এর সাথে দু'হাতে মুসাফাহা করেছেন।
’’وَصَافَحَ حَمَّادُبْنُ زَیْدٍ،ابْنَ المُبَارَکِ بِیَدَیْہِ۔‘‘
ইমাম বুখারি রহ. উক্ত বিষয়টিকে তার প্রসিদ্ধ কিতাব " আত- তারিখুল কাবীরে " ইসমাঈল ইবনে ইবরাহিম ইবনে মুগিরাহ রহ.এর সুত্রে উপরোল্লেখিত শব্দের সাথে বর্ণানা করেছেন।
حدثنى اصحابنا يحيى وغيره عن اسماعيل بن ابراهيم قال رأيت حماد بن زيد وجاء ابن المبارك بمكة فصافه بكلتا يديه، (حاشية —–بخارى-২/৯২৬)
অর্থাৎ ইসমাঈল বিন ইবরাহীম রহি. বলেন-আমি হাম্মাদ ইবনে যায়েদ রহি. কে দেখেছি যে, তার কাছে আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহি. মক্কা মুকাররমায় এসেছেন, তখন তিনি উভয় হাতে মুসাফাহা করেছেন। [হাশিয়ায়ে সহীহ বুখারী-২/৯২৬]
এমনকি এ বিষয়টিকেই রিজাল এবং হাদিস শাস্ত্রের দুই জন প্রসিদ্ধ ইমাম আল্লামা শামসুদ্দিন যাহাবি এবং হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি বর্ণানা করেছেন।
বিস্তারিত দেখতে পারেন,সিয়ারে আ'লামিন নুবালা ২১/২৯৩. তাহযীবুত তাহযীব ১/৪৭২
এখানে জ্ঞাতব্য যে, এই উভয় ব্যক্তিই স্বীয় যামানার মুহাদ্দিসীনে কেরামের ইমাম ছিলেন। ইমাম আব্দুর রহমান ইবনে মাহদী রহ. বলেন যে, ‘(হাদীস শাস্ত্রের) ইমাম হলেন চারজন। যথা, ১. মালেক রহ. ২. সুফিয়ান সাউরী রহ. ৩. হাম্মাদ ইবনে যায়েদ রহ. ও ৪. আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ.।’
’’قَالَ عَبْدُالرَّحْمَنِ بنُ مَہْدِیٍّ: أَئِمَّۃُالنَّاسِ فِیْ زَمَانِہِمْ أَرْبَعَۃٌ : سُفْیَانُ الثَّوْرِیُّ بِالْکُوْفَۃِ ، وَمَالِکٌ بِالْحِجَازِ، وَالْأَوْزَاعِیُّ بِالشَّامِ ، وَحَمَّادُ بنُ زَیْدٍ بِالْبَصْرَۃِ ۔‘‘
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহি.বলেন, ইমাম হাম্মাদ ইবনে যায়েদ রহি. মুসলমানদের অন্যতম একজন ইমাম ছিলেন।
ইমাম আহমাদ ইবনে আব্দুল্লাহ আল-ইযলী রহি.বলেন,
ইমাম হাম্মাদ ইবনে যায়েদ একজন নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিস ছিলেন এবং তার চার হাজার হাদিস মুখস্থ ছিল আর তার নিকট কোনো পুস্তিকা থাকতো না।
অন্যান্য মুহাদ্দিসীনগণও উভয় হাতের মুসাফাহার কথা উল্লেখ করেছেন।
হযরত আয়শা সিদ্দিকা রা. বলেন, রাসূল সা.এক মহিলাকে বললেন-قد بايعتك অর্থাৎ আমি তোমাকে বাইয়াত করালাম। হযরত আয়েশা রা.বলেন যে, তাকে শুধু কথার দ্বারা বাইয়াত করিয়েছেন, হাত ধরে বাইয়াত করাননি।
আল্লামা কাসতাল্লানী রহ. ইরশাদুস সারী শরহু সহীহ বুখারীতে এবং আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী র. উমদাতুল ক্বারী শরহু সহীহিল বুখারীতে আয়শা রা. এর বক্তব্যের ব্যাখ্যায় বলেন, اى لا باليد كما كان يبايع الرجال بالمصافحة باليدين অর্থাৎ হাত দিয়ে বাইয়াত করাননি, যেমন পুরুষদের বাইয়াত করানোর সময় উভয় হাতে মুসাফাহা করতেন।
অতঃপর ইমাম বুখারি রহি. এ হাদিস বর্ণনা করেন যে,
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.বলেন,নবী করিম সা.আমাকে তাশাহুদ শিক্ষা দিলেন এমতাবস্থায় যে আমার হাত রাসুল সা.এর দু'হাতের মাঝে ছিল।
’’عَلَّمَنِیْ رَسُوْلُ اللّٰہِ صَلّٰی اللّٰہُ عَلَیْہِ وَسَلَّمَ وَکَفِّی بَیْنَ کَفَّیْہِ التَّشَہُّدَ۔‘‘
ইমাম বুখারি রহি. “বাবুল আখজ বিল ইয়াদাইনিল মুসাফাহা ” এর অধীনে এই হাদিস বর্ণানা করে এ কথা
বুঝাতে চান যে, মুসাফাহা দু'হাত দ্বারাই হবে।
যেমন রাসুল সা.আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের সাথে দু'হাতে মুসাফাহা করেছেন।
এই হাদিসে চিন্তার বিষয় হলো " আমার হাত তার দু'হাতের হাতের মাঝে ছিল। এর দ্বারা বুঝা গেলো যে রাসুলের সুন্নত হলো দু'হাতে মুসাফাহা করা। এখানে ইবনে মাসউদ রা. তার বৈশিষ্ট এবং গুনাবলী বর্ণানা করতেছেন। এর দ্বারা ইহা উদ্দেশ্য নয় যে তিনি দু'হাতে মুসাফাহা করেননি।
ইমামুল আসর আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি রহ. বলেন, এ হাদিসে নবী করিম সা.এর দিক থেকে দু'হাতে মুসাফাহা করার বিষয়টা স্পষ্ট। বাকী রইল ইবনে মাসউদ রা.এর ব্যাপার টা যে তিনি এক হাতে মুসাফাহা করেছেন। এখানে রাবী এক হাতের বর্ণানার উপরই সীমাবদ্ধ করেছেন, অন্যথায় ইবনে মাসউদ রা. এর মতো সাহাবীর ব্যাপারে এরকম ধারণা করা যায় না যে তিনি এক হাতে রাসুলের সাথে মুসাফাহা করেছেন। আসল কথা এটাই যে রাবী এক হাতের কথা বর্ণানার উপর সীমাবদ্ধ করেছেন, কিন্তু বাস্তবে তিনি দু'হাতেই মুসাফাহা করেছেন।
ইমাম বুখারি রহ.তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ " আদাবুল মুফরাদে" এ বর্ণনা নকল করেন যে, হযরত আব্দুর রহমান ইবনে রাযিন রহ.বলেন যে, আমরা রাবযা নামক জায়গা দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, তখন আমাদের কে বলা হলো যে এখানে রাসুলের সাহাবী সালামা ইবনে আকওয়া রা.রয়েছেন। তখন আমি তার খেদমতে উপস্থিত হলাম এবং তাকে সালাম দিলাম। তখন তিনি (সালামের জবাব দিলেন) এবং দু'হাতে মুসাফাহা করলেন এবং বললেন আমি রাসুলের হাতে এভাবেই দু'হাতে বায়আত হয়েছি।
’’عن عَبْدِالرَّحْمٰنِ بْنِ رَزِیْنٍ قَالَ : مَرَرْنَابِالرَّبَذَۃِ فَقِیْلَ لَنَا : ہَاہُنَا سَلَمَۃُ بْنُ الْأَکْوَعِ فَأَتَیْتُہٗ فَسَلَّمْنَا عَلَیْہِ فَأَخْرَجَ یَدَیْہِ فَقَالَ : بَایَعْتُ بِہَاتَیْنِ نَبِیَّ اللّٰہِ صَلّٰی اللّٰہُ عَلَیْہِ وَسَلَّمَ۔‘‘
এই হাদিসে রাসুল সা. এর সাহাবী সালামা ইবনে আকওয়া রা. দু'হাতে মুসাফাহা করেছেন অত:পর তিনি বললেন আমি এ দু'হাত দ্বারাই রাসুল সা.এর হাতে বায়আত হয়েছি। যার সারমর্ম হলো রাসুল সা. দু'হাতেই মুসাফাহা করতেন। এমনিভাবে রাসুল সা.এর সাহাবী সালামা ইবনে আকওয়া রা.ও দু'হাতে মুসাফাহা করেছেন। প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ইমাম হাম্মাদ ইবনে যায়েদ রহ.ও দু'হাতে মুসাফাহা করেছেন।
ইমাম বুখারি রহ.এর নিকটও উত্তম এবং পসন্দনীয় হলো দু'হাতে মুসাফাহা করা। আর এ কারণে তিনি মুসাফাহার ব্যাপারে স্বতন্ত্র বাব স্থাপন করেছেন এবং এ সংক্রান্ত রেওয়ায়েত এবং আসার স্বীয় তিন কিতাব সহীহ বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ,এবং আত-তারিখুল কাবীরে বর্ণানা করেছেন।
হযরত আনাস রা.বলেন নবী করিম সা.বলেন,
’’عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِکٍ عَنْ نَبِیِّ اللّٰہِ صَلّٰی اللّٰہُ عَلَیْہِ وَسَلَّمَ قَالَ:مَامِنْ مُسْلِمَیْنِ الْتَقَیَا، فَأَخَذَ أَحَدُہُمَا بِیَدِ صَاحِبِہٖ ، إِلَّاکَانَ حَقًّاعَلٰی اللّٰہِ أَنْ یَّحْضُرَ دُعَائَ ہُمَا، وَلَایُفَرِّقَ بَیْنَ أَیْدِیْہِمَا حَتّٰی یَغْفِرَلَہُمَا۔‘‘
যখন দু'জন মুসলমান পরস্পর সাক্ষাৎ করে এবং একে অপরের সাথে মুসাফাহা করে তাহলে আল্লাহ তায়ালার দায়িত্ব হয়ে যায় তাদের হাতসমূহ পৃথক হওয়ার পূর্বেই তাদের কে মাফ করে দেওয়া।
এই হাদিসের এই বাক্য ’’لَایُفَرِّقَ بَیْنَ أَیْدِیْہِمَا‘‘ তাদের হাতসমূহ পৃথক হওয়ার আগেই মাফ করে দেওয়া হয়।
এই হাদিসে ’’أَیْدِیْہِمَا‘‘ বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে।যদি মুসাফাহা শুধু এক হাতে করার বিধান হতো তাহলে এখানে দ্বিবচনের শব্দ ব্যবহার করা হতো।
কাযি ইয়ায মালেকি রহ.বলেন সালাম এবং সাক্ষাতের সময় মুসাফাহা দু'হাতেই করতে হবে।
এমনকি ফুকাহায়ে কেরামও স্পষ্টভাবে বর্ণানা করেছেন যে দু'হাতের মাধ্যমেই মুসাফাহা করা সুন্নত
বিখ্যাত ফকিহ আল্লামা হাসকাফি রহিমাহল্লাহ বলেন,
মুসাফাহার ক্ষেত্রে সুন্নত হলো দু'হাত দ্বারাই মুসাফাহা করা।
আল্লামা ইবনে আবেদিন শামী রহ.বলেন আরো স্পষ্ট করে বলেন, সাক্ষাতের সময় সালামের পর কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই (চাই সে প্রতিবন্ধকতা কাপড় হোক বা অন্য কোনো কিছু) দু'হাতে মুসাফাহা করা সুন্নত।
’’وَالسُّنَّۃُأَنْ تَکُوْنَ بِکِلْتَا یَدَیْہِ ، وَبِغَیْرِحَائِلٍ مِنْ ثَوْبٍ أَوْ غَیْرِہٖ وَعِنْدَ اللِّقَائِ بَعْدَ السَّلَامِ۔‘‘
ইসলামি আইনশাস্ত্রের অন্যতম গ্রন্থ মাজমাউল আনহুর ফি শারহে মুলতাকাল আবহুরে স্পষ্টভাবে দু'হাতে মুসাফাহা করাকে সুন্নত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
তাছাড়া প্রত্যেক ভাষায় একবচনের ছিগা দু'পদ্ধতি ব্যবহার হয়
১. মুফরাদ তথা একক শব্দ হিসাবে, অর্থাৎ তা দ্বারা একই উদ্দেশ্য হয়।
২.জিনস হিসাবে, তখন একবচনের ছিগা হয়ে থাকে, কিন্তু তা দ্বারা একাদিক সংখ্যা/সদস্য উদ্দেশ্য হয়।
যেমন কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেছেন,
وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَى عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا مَحْسُورًا
অর্থ: (কৃপণতাবশত) নিজের হাত ঘাড়ের সাথে বেঁধে রেখো না এবং (অপব্যয়ী হয়ে) তা সম্পূর্ণরূপে খুলে রেখো না, যার ফলে তোমাকে নিন্দাযোগ্য ও নিঃস্ব হয়ে বসে পড়তে হয়।
এ আয়াতে ’’ید‘‘ শব্দটা জিনস হিসাবে ব্যবহার হয়েছে,
এমনকি হাদিসেও এর অসংখ্য অগণিত উদাহরণ রয়েছে
বুখারী শরীফের প্রসিদ্ধ হাদীস-
اَلْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
অর্থ: প্রকৃত মুসলমান ঐ ব্যক্তি, যার হাত ও মুখ হতে অপর মুসলমান নিরাপদ থাকে।
তেমনিভাবে মুসলিম শরীফের হাদীস-
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ
অর্থ: যে ব্যক্তি কোন নিষিদ্ধ কাজ দেখে, সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিহত করে।
এসব হাদীসে يد এক বচন আসায় কি এক হাতই উদ্দেশ্য? এক্ষেত্রেও কি অন্য হাত ব্যবহার করা সুন্নাতের খেলাফ হবে? নাকি অন্য হাত ব্যবহার করা আহলে হাদিসদের ন্যায় বিদআত হয়ে যাবে..?
এ সকল হাদিসে ’’ ید‘‘ শব্দটা মুফরাদ বা একক হিসাবে ব্যবহার হয়েছে, কিন্তু এখানেও অকাট্যভাবে এ উদ্দেশ্য নয় যে মুসলমানের এক হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ, অন্য হাত থেকে নয়।
এমনিভাবে কোনো মন্দ কাজ দেখে শুধু এক হাতে বন্ধ করা আর অন্য হাতে না করা এরকম উদ্দেশ্য নয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে দু‘আ করতেন। আর অন্যদেরও শিখাতেন যে, اَللَّهُمَّ اجْعَلْ فِي بَصَرِي نُورًا وَاجْعَلْ فِي سَمْعِي نُورًا
অর্থ: হে আল্লাহ! আমার চোখে নূর দাও! আমার কানে নূর দাও!
তাহলে এ হাদীসে কি بصر ও سمع এক বচন ব্যবহার হওয়ার কারণে এক কান ও এক চোখ বোঝানো উদ্দেশ্য? কখনোই না। সুতারং প্রমাণিত হলো যে,
উভয় হাতে মুসাফাহা করার বিধানটি মুসলিম উম্মাহর একটি নিরবচ্ছিন্ন কর্মধারা, যা যুগ পরম্পরায় স্বীকৃত। ইংরেজদের আমলের পূর্বে কোন ইসলামী গ্রন্থে দুই হাতে মুসাফাহা করাকে বিদ‘আত বা সুন্নাতের খেলাফ বলে মন্তব্য করা হয়নি।
তা সত্বেও আহলে হাদিস ভাইয়েরা এমন কোনো সহীহ স্পষ্ট রেওয়ায়েত উপস্থাপন করতে পারেনি যাতে রাসুল শুধু ডান হাতে মুসাফাহা করার নির্দেশ দিয়েছেন। রাসুল সা.নিজে এক হাতে মুসাফাহা করেছেন,আর অন্য হাত দুরে সরিয়ে রেখেছেন।
সুতারং হাদিস-ফেকাহ, আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের ঐক্যমতে ইহাই প্রমাণিত হয় যে দু'হাতে মুসাফাহা করা সুন্নত এবং উত্তম আমল।
বুখারি শরীফ ২/৯২৬. ফাতহুল বারী ১১/৫৫. আত-
তারিখুল কাবীর ১/২৪৩. আল-আদাবুল মুফরাদ ৯২৪৫. আল-মু'জামুল কাবীর লিত তাবারানী হাদিস নং ৬৭০৮.মুসনাদের আহমাদ ১৫৬২১.মুসনাদে আবী ইয়ালা ৯৩১৬
ফাতাওয়ে শামি ৬/২৮৩.মাজমাউল আনহুর ২/১৬৫.
সহীহ বুখারি ১/১৭১১.সহীহ মুসলিম ১/৯৬
শায়েখ Khairul Islam 23/9/2021