মাযহাব কেন মানি তৃতীয় পর্ব

 

🌼❤মাযহাব কেন মানি ধারাবাহিক আলোচনা পর্ব তৃতীয় 🌷🌷🍀🍀🌼

🍀🌷রাসূলুল্লাহ ﷺ এর  যুগে তাকলীদ🌼🍀🌷🌷🌷🌷💟💟💟💟💝

তাকলীদের পরিচয় ও গুরুত্বঃ

ইসলামী শরী‘আতের মৌলিক চার দলীল সম্পর্কে জানার পর কথা হল, কিয়ামত পর্যন্ত আগত মানুষের সামগ্রিক জীবনের সকল অঙ্গনের সর্বপ্রকার সমস্যার সমাধান এই চার দলীলের মধ্যেই নিহিত। এটা নিছক কোনো দাবী নয়। পৃথিবী সর্বযুগেই এর বাস্তবতা চাক্ষুষ করে আসছে। তবে এ দলীল চতুষ্টয় থেকে সরাসরি সমস্যার সমাধান খুঁজে নেওয়া বা পাওয়া সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য নবীযুগ থেকেই নিয়ম চলে আসছে যে, উম্মতের মধ্যে কুরআন, সুন্নাহ ও তা থেকে উৎসারিত ইলমে দ্বীন সম্পর্কে একটি দল পারদর্শিতা অর্জন করবে আর অন্যরা কুরআন সুন্নাহর বিধানাবলী জানার জন্য তাদের দারস্থ হবে এবং তাদের ব্যাখ্যা ও দিক নির্দেশনা অনুসারে কুরআন সুন্নাহ অবগত হয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে।

এভাবে কুরআন সুন্নাহয় পারদর্শীদের শরাণাপন্ন হয়ে তাদের নিকট থেকে শরয়ী বিধান এবং তাদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততার প্রতি আস্থাশীল হয়ে তাদের বর্ণিত শরী‘আতের বিধান মেনে নেয়াকে পরিভাষায় তাকলীদ বলা হয়।

এই পদ্ধতিতে বিধিবিধান মেনে চলা শরী‘আতের শিক্ষার পাশাপাশি স্বভাবজাত বিষয়ও বটে। দ্বীন-দুনিয়ার যাবতীয় বিষয়ে সবই এ নিয়মের অধীন। এটা এড়িয়ে চলা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। এমনকি পার্থিব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যাপারেও মানুষকে বিজ্ঞজনদের দারস্থ হতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে কেউ নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে না। বিজ্ঞজনের সঙ্গে পরামর্শ করে তাদের দিক নির্দেশনা অনুসারে চলাকে নিজের জন্য নিরাপদ মনে করে। নিজের মনমতো চলাকে নির্বুদ্ধিতা ও বোকামী জ্ঞান করা হয়। এটা ধন্যবাদযোগ্য একটি গুণ। আর বাস্তবেও তা সহজ ও নিরাপদ। যারা এ নিয়ম মেনে চলে তারা সফল হয় আর হঠকারীরা হয় ব্যর্থমনোরথ। এটা কুরআনেরও নির্দেশনা যে, কোনো বিষয়ে জানা না থাকলে জ্ঞানীদের নিকট জিজ্ঞেস করে জেনে নিবে। (সূরা আম্বিয়া-৭) ইসলাম তো সাধারণ দুনিয়াবী সফরেও একাকী বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে এবং সর্বক্ষেত্রেই একজনকে আমীর বানিয়ে চলার নির্দেশ জারী করেছে। এতে অনুমান করা যায় আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহের সুকঠিন ও সংবেদনশীল সফরে কুরআন সুন্নাহর সঠিক দিক নির্দেশনা পেতে হলে খাইরুল কুরুনের ইলম-আমল, তাকওয়া-তাহারাতে সকলের আস্থাভাজন ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিত্বের, যাদের ইলম এখনও পর্যন্ত সুবিন্যস্ত আকারে বিদ্যমান, তাকলীদ বা অনুসরণ করা কতটা জরুরী। উপরন্তু বর্তমানের ধর্মহীনতার নাযুক সময়ে তো এর প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি। আহলে হাদীস বলে পরিচিত তাকলীদ অস্বীকারকারী বন্ধুদের শীর্ষস্থানীয় ইমাম মুহাম্মাদ হুসাইন বাটালভী বলেন, ‘আমার ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা যে, যারা অজ্ঞতাবশতঃ মুজতাহিদে মুতলাক ও মূল তাকলীদকে বর্জন করে শেষতক তারা ইসলামকেই বিদায় দিয়ে দেয়। (আসারুল হাদীস ড. খালিদ মাহমুদ ২/৩৮৫)

হক্কানী উলামায়ে কেরামের অভিজ্ঞতা হলো, বর্তমানে দ্বীন থেকে বের হয়ে যাওয়ার সহজ পথ হলো, চার ইমামের তাকলীদ থেকে বের হয়ে যাওয়া।

সংক্ষিপ্ত করে তাকলীদের পরিচয় ও গুরুত্ব তুলে ধরার পর এ পর্যায়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে তাকলীদ বিষয়ে কিছু আলোচনা পেশ করা হবে।

রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় সাহাবায়ে কেরাম অন্য সাহাবার তাকলীদ করেছেন। এরও অনেক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। আবার এমনও দেখা যায় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম  মৌখিকভাবে নির্দিষ্ট বা অনির্দিষ্ট করে কারো তাকলীদের স্বীকৃতি দিয়েছেন কিংবা কারও তাকলীদকে সমর্থন করেছেন। আবার কখনও তিনি গভর্ণর বানিয়ে একেক এলাকায় সাহাবায়ে কেরামকে পাঠিয়ে দিতেন এবং ওই এলাকার লোকদেরকে ওই সাহাবীকে তাকলীদ করে দ্বীনের উপর চলতে বলতেন। স্বল্প পরিসরে এগুলোর উদাহরণ তুলে ধরা হচ্ছে।

💖পরবর্তীদের জন্য তাকলীদ💓

(ক) পরবর্তীদের জন্য সাহাবায়ে কেরামের তাকলীদের অনুসরণঃ

হযরত আবূ সাইদ খুদরী রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার কয়েকজন সাহাবীকে জামা‘আতে বিলম্বে আসতে দেখে বললেন, তোমরা দ্রুত আসো এবং আমাকে দেখে দেখে অনুসরণ করো, তোমাদের পরবর্তী লেকেরা তোমাদের দেখে দেখে অনুসরণ করবে। (মুসলিম শরীফ ৪৩৮) 

ائتموا بي وليأتم بكم من بعدكم

এই হাদীসে সাহাবা পরবর্তীদের জন্য সাহাবাদের তাকলীদের সুস্পষ্ট অনুমোদন রয়েছে।

হাদীসে এসেছে, আমার উম্মত তেহাত্তর ফিরকায় বিভক্ত হবে। তার মধ্যে একটি ছাড়া সকলেই জাহান্নামে যাবে। জিজ্ঞেস করা হল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! সেই এক দলে কারা থাকবে। বললেন, ماانا عليه واصحابي অর্থাৎ যারা আমার ও আমার সাহাবীদের আদর্শের উপর থাকবে। (জামে তিরমিযী ২৮৩২)

এখানেও সাহাবীদের তাকলীদকে পরবর্তীদের জন্য নাজাতপ্রাপ্ত দলের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মাপকাঠি নির্ধারণ করা হয়েছে।

(খ) পরবর্তীদের জন্য নির্দিষ্ট সাহাবীদের তাকলীদের স্বীকৃতিঃ

হযরত হুযাইফা রা. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমি জানি না কতদিন তোমাদের মাঝে (জীবিত) থাকব। আমার পরে তোমরা আবূ বকর ও উমর রা. এ দু‘ব্যক্তির ইকতিদা (অনুসরণ) করবে। (জামে তিরমিযী ৩৬৬৩)

হাদীসে ইকতিদা শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। ইকতিদা অর্থ দ্বীনি বিষয়ে কারও অনুসরণ করা। এর নামই তাকলীদ।

হযরত হুরাইস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. সম্পর্কে বলেছেন, আমি তোমাদের জন্য তাই পছন্দ করি যা আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. তোমাদের জন্য পছন্দ করে। (মুস্তাদরাক ৫৩৯৪)

এই হাদীসে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর পছন্দনীয় বিষয়গুলো সাহাবায়ে কেরামের জন্য অনুসরণীয় বলে ব্যক্ত করা হয়েছে। এটাই তাকলীদ।

হযরত ইরবাজ ইবনে সারিয়া রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্য হতে যারা আমার পরে বেঁচে থাকবে তারা অনেক মতানৈক্য লক্ষ্য করবে। তোমরা দ্বীনের নামে উদ্ভাবিত সকল বিষয় পরিহার করে চলবে। কেননা নিঃসন্দেহে তা গোমরাহী। তোমাদের কেউ বিদআতী কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করলে তার করণীয় হল আমার সুন্নাত ও হেদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত আঁকড়ে ধরা। কাজেই মাড়ির দাঁত দ্বারা তা মজবুতভাবে আঁকড়ে রাখবে। (তিরমিযী শরীফ ২৬৭৬)

এই হাদীসে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে নিজের সুন্নাতের সাথে খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়েছেন। তাকলীদ তো এরই নাম।

(গ) নবীজীর জীবদ্দশায় সাহাবীর তাকলীদের সমর্থন

হযরত সাহাল ইবনে মুআয রা. তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, জনৈক মহিলা রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার স্বামী জিহাদে শরীক হয়েছেন। তিনি থাকা অবস্থায় আমি তার নামায ও অন্যান্য সকল আমল অনুসরণ করতাম। এখন তার প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত আমাকে এমন কোনো আমল বাতলে দিন যা তার স্থলাভিষিক্ত হবে। (মুস্তাদরাক ২৩৯৭)

এই হাদীসে মহিলার জন্য ইলমওয়ালা দ্বীনদার স্বামীর ইকতিদা ও অনুসরণকে সমর্থন করা হয়েছে। এরই নাম তাকলীদ।

(ঘ) গভর্নর হিসেবে এবং দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য সাহাবায়ে কেরামকে বিভিন্ন দেশে প্রেরণঃ

নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মুআয ইবনে জাবাল রা. ও হযরত আবূ মুসা আশআরী রা. কে ইয়ামানের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের গভর্ণর করে প্রেরণ করেছিলেন। (বুখারী শরীফ ৪৩৪১)

বলা বাহুল্য, তারা সেখানকার জনগণকে দ্বীন শিক্ষা দিতেন। যা বুখারী শরীফের আরেকটি রেওয়ায়াত দ্বারা প্রমাণিত। (বুখারী শরীফ ১৩৯৫)

দেখা যাচ্ছে হযরত মুআয ইবনে জাবাল ও হযরত আবূ মুসা আশআরী রা. কে ইয়ামানবাসীর নিকট দ্বীনী বিষয়ে অনুসরণীয় হিসেবে পাঠানো হয়েছে। এটাই তাকলীদ। কারণ প্রত্যেক ব্যপারে ইয়ামানবাসীদের পক্ষে মদীনায় এসে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মাসআলা জেনে যাওয়া সুকঠিন ব্যাপার ছিল।

অনুরূপ বিভিন্ন কওমের প্রতিনিধিগণ মদীনায় এসে দ্বীনি বিষয়ে অবগত হয়ে ফিরে গিয়ে কওমকে তা শিক্ষা দিতেন আর কওমও নির্দ্বিধায় বিনা বাক্যব্যয়ে তাদের কথা মেনে নিতো। এর বহু দৃষ্টান্ত হাদীসের কিতাবে বিদ্যমান। 

প্রতীয়মান হল নিরাপদে দ্বীনের অনুসরণ করতে হলে তাকলীদে শাখসী বা নির্দিষ্ট মুজতাহিদ ও ইমামের তাকলীদ করা জরুরী। এটাকে হারাম বা শিরক বলা মারাত্মক পর্যায়ের গোমরাহী। আল্লাহ তা‘আলা উম্মতে মুসলিমাকে এ জাতীয় ফিতনা ফাসাদ থেকে নিরাপদ রাখুন।

💟সাহাবায়ে কেরামের যুগে তাকলীদ❤

সাহাবায়ে কেরামের যুগে কিয়াস-ইজতিহাদ ও তাকলীদ সাহাবাযুগে কিয়াস ও ইজতিহাদের নমুনাঃ

নমুনা-১

মৃত ব্যক্তির পিতা জীবিত নেই কিন্তু দাদা বেঁচে আছেন, এমতাবস্থায় মৃত ব্যক্তির ভাই তাঁর দাদার বর্তমানে ওয়ারিশী সম্পত্তি লাভ করবেন কি না এ নিয়ে জটিলতা দেখা দিল। কুরআন বা হাদীসে এর কোনো স্পষ্ট বিধান না থাকায় ফকীহ সাহাবীগণ থেকে এ ব্যাপারে দু’ধরনের মতামত পাওয়া গেল। একদল বললেন, মীরাস পাবে। আর অপর দল না পাওয়ার পক্ষে রায় দিলেন। পাওয়ার পক্ষে মত দিলেন হযরত আলী রা., হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. ও হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত রা. প্রমুখ সাহাবী। সমস্যা নিরসনে হযরত উমর ফারুক রা. হযরত আলী রা. ও হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত রা. এর সাথে পরামর্শ করলেন। 

হযরত আলী রা. তার মতের স্বপক্ষে কিয়াস পেশ করলেন, ইয়া আমীরুল মুমিনীন! ধরুন একটি বৃক্ষ থেকে একটি শাখা বের হল। তারপর শাখাটি থেকে আরও দুটি প্রশাখা উদগত হল। এক্ষেত্রে আপনার মতে প্রথম শাখাটির কে অধিক নিকটবর্তী? স্বয়ং বৃক্ষটি না তার উদ্গত প্রশাখাদ্বয়? হযরত উমর ফারুক রা. বললেন উভয়ে সমান, অর্থাৎ স্বয়ং বৃক্ষ ও উদগত প্রশাখাদ্বয় উভয়-ই প্রথম শাখাটির সমান নিকটবর্তী। হযরত আলী রা. বললেন, আমীরুল মুমিনীন! ভাই আর দাদার সম্পর্কও মৃতব্যক্তির সঙ্গে অনুরূপ। সুতরাং এক্ষেত্রে ভাই দাদার সঙ্গে মীরাস লাভ করবে।

হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত রা. কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, আমীরুল মুমিনীন! বলুন তো কোনো নদী থেকে একটি নালা বের হল, অতঃপর সেই নালা থেকে আরও দুটি উপনালা সৃষ্টি হল। এক্ষেত্রে নালাটির কে অধিক নিকটবর্তী। নদীটি না উপনালা দুটি? আমীরুল মুমিনীন বললেন, উভয়ই সমান নিকটবর্তী। এবার যায়েদ রা. বললেন, মাইয়েতের সঙ্গে ভাই আর দাদার অবস্থাও অনুরূপ। সাহাবীদ্বয়ের কিয়াস দর্শনে হযরত উমর রা. এর নিকট স্পষ্ট হয়ে গেল যে, উপযুক্ত ক্ষেত্রে ভাই দাদার সঙ্গে মীরাস লাভ করবে।

লক্ষ্যণীয় হল, হযরত আলী রা. এবং হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত রা. দুজনেই আমীরুল মুমিনীনকে কিয়াসের মাধ্যমে জবাব দিলেন। আর আমীরুল মুমিনীনও তা মেনে নিলেন। শুধু তিনি কেন সকল সাহাবীই তাদের এ কিয়াস মেনে নিলেন। কেউ একথা বললেন না যে, শরী‘আতের ব্যাপারে কিয়াস কেন সরাসরি কুরআন হাদীস পেশ করুন। কেননা তাদের জানা ছিল যে, সহীহ কিয়াস শরী‘আতেরই একটি দলীল। (জামিউল মাসানিদ খাওয়ারেজমী কৃত ২/৩৩৮)

নমুনা-২

মদ পানকারীকে কত বেত্রাঘাত করা হবে এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ ছিল। কারো বক্তব্য ছিল ৪০টি আর কারো মত ছিল ৮০টি। হযরত উমর রা. এ ব্যাপারে হযরত আলী রা. এর সঙ্গে পরামর্শ করলেন। হযরত আলী রা. বললেন, আমার মতে তাকে আশিটি বেত্রাঘাত করা হোক। কারণ যখন সে পান করে নেশাগ্রস্ত হয়। নেশাগ্রস্ত হলে প্রলাপ বকতে থাকে। আর প্রলাপ বকতে বকতে কারও প্রতি অপবাদ আরোপ করে বসে। (আর অপবাদ আরোপের শাস্তি ৮০ বেত্রাঘাত) তারপর হযরত উমর রা. মদপানকারীকে ৮০টি বেত্রাঘাত করার সিদ্ধান্ত দিলেন। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক হাদীস নং ৯৯৫)

দেখা যাচ্ছে, হযরত উমর রা. হযরত আলী রা. এর কিয়াসের ভিত্তিতে শরয়ী দণ্ডবিধি প্রয়োগ করলেন।

নমুনা-৩

একবার এক গোত্রের কিছু লোক এসে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর নিকট জানতে চাইল, জনাব! আমাদের এক ব্যক্তি বিবাহ করেছে, কিন্তু মহর নির্ধারণ করেনি। তারপর সে তার স্ত্রীর সঙ্গে সহবাসের পূর্বেই ইন্তিকাল করেছে। এখন তার মহরের ব্যাপারে কি ফায়সালা হবে? হযরত আবদুল্লাহ রা. বললেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আমার নিকট এর চেয়ে জটিল কোনো সমস্যা উপস্থিত হয়নি। তোমরা এ ব্যাপারে অন্যদেরকেও জিজ্ঞাসা কর। তারপর ব্যাপারটি নিয়ে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে একমাস পর্যন্ত আলোচনা চলতে থাকে। পরিশেষে তাঁরা আবারও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর দারস্থ হয়। তিনি তাদেরকে বললেন, আমি আমার রায় দ্বারা ইজতিহাদ করে সমাধান দিচ্ছি। সঠিক হলে তা আল্লাহ ও তার রাসূলের পক্ষ হতে আর ভুল হলে আমার ও শয়তানের পক্ষ হতে। এ ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল দায়মুক্ত। অতঃপর তিনি সকলের সামনে তাঁর ইজতিহাদ তুলে ধরলেন যে, এ মহিলা মহরে মিছিল পাবে, তার মৃত স্বামীর ওয়ারিশ হবে এবং চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করবে। এ ফায়সালা শোনার পর তৎক্ষণাৎ এক ব্যক্তি বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনার সিদ্ধান্ত আল্লাহ ও রাসূলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে মিলে গেছে। আমাদের গোত্রীয় বিরওয়া বিনতে ওয়াসিক নাম্নী এক মহিলার ব্যাপারে স্বয়ং নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. স্বীয় কিয়াস সহী হওয়ার দলীল জানতে পেরে এত বেশী খুশি প্রকাশ করলেন যে, ইসলাম গ্রহণের পর তিনি এতোটা আনন্দ কখনো প্রকাশ করেন নি। (উসুলুল জাসসাস ২/২৩০)

নমুনা-৪

ইসলামের প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর সিদ্দিক রা. এর খলীফা নিযুক্ত করণের বিষয়টিও সাহাবায়ে কেরামের ইজতিহাদ দ্বারা হয়েছিল। কেননা কুরআন হাদীসের কোথাও একথা নেই যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর তিনিই সর্বপ্রথম খলীফা হবেন। (উসুলুল জাসসাস ২/২৩০)

শরী‘আতে ইসলামিয়ায় এ জাতীয় আরও বহু মাসআলা রয়েছে যেগুলো সাহাবায়ে কেরামের কিয়াস ও ইজতিহাদ দ্বারা গৃহীত হয়েছে।

নিম্নবর্ণিত সাহাবায়ে কেরাম কিয়াস ও ইজতিহাদের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন:

১.হযরত উমর রা. ২. হযরত আলী রা. ৩. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. ৪. উম্মুল মুমিনীন আয়িশা রা. ৫. যায়েদ ইবনে সাবিত রা. ৬. আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. ৭. আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.।

এদের পরবর্তী ছিলেন, ১. হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রা. ২. হযরত উম্মে সালামা রা. ৩. উসমান ইবনে আফফান রা. ৪. আনাস ইবনে মালেক রা. ৫. আবূ সাইদ খুদরী রা. ৬. আবূ হুরায়রা রা. ৭. আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. ৮. আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা. ৯. আবূ মুসা আশআরী রা. ১০. সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা. ১১. সালমান ফারসী রা. ১২. মুআয ইবনে জাবাল রা. ১৩. তালহা রা. ১৪. যুবাইর রা. ১৫. আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. ১৬. মুআবিয়া রা. প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।

সাহাবাযুগের কিয়াস ও ইজতিহাদ সংক্রান্ত উপর্যুক্ত প্রামাণ্য আলোচনা থেকে স্পষ্ট হল, কিয়াস ও ইজতিহাদ ভূঁইফোড় কোনো বিষয় নয়। বরং তা শরী‘আতের দলীল চতুষ্টয়ের অন্যতম। এ ব্যাপারে সংশয় পোষণ করা গোমরাহী ও ইলমী দৈন্যের পরিচায়ক।

🌼সাহাবাযুগে তাকলীদ🌼

সাহাবায়ে কেরাম রা. উম্মতের জন্য দ্বীন পালনের নমুনা ও মাপকাঠি। তারা যেভাবে কুরআন, সুন্নাহর উপর আমল করেছেন, সফলতা পেতে হলে উম্মতকে সেভাবে পথ চলতে হবে। বলা বাহুল্য, সাহাবায়ে কেরাম সকলে ইলমে দ্বীন চর্চাকে নিজের পেশা বানাননি। তারা বিভিন্ন ধরনের দ্বীনী ও দুনিয়াবী কাজে ব্যস্ত থাকতেন। অল্পসংখ্যক সাহাবায়ে কেরামই ইলম চর্চাকে নিজের পেশার মত বানিয়ে নিয়েছিলেন। সাধারণ নিয়মও এই যে, সকল মানুষ একই ধরনের পেশা ও কাজ অবলম্বন করেন না। প্রয়োজন অনুপাতে বিভিন্নজন বিভিন্ন কাজে মশগুল হয়। যাতে দ্বীন দুনিয়ার যাবতীয় বৈধ কাজের ধারা সচল থাকে। এজন্যই দেখা যায় পৃথিবীতে সকলেই এক জাতীয় পেশা গ্রহণ করে না। একেক জন একেক বিষয়ে জ্ঞানার্জন করে ও বিশেষজ্ঞ হয়। আর অন্যরা সে ব্যাপারে তাকে মেনে চলে ও তার থেকে উপকৃত হয়। এটা এমন এক নিয়ম যার কোনো ব্যত্যয় নেই।

সাহাবায়ে কেরামও এই নিয়মের আওতার বহির্ভূত ছিলেন না। সে হিসেবে সাহাবায়ে কেরামের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক সাহাবী ইলমে দ্বীন চর্চায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তারা কুরআনে কারীম এবং নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাজার হাজার হাদীস মুখস্ত করেছিলেন। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে তারা কারী, হাফেজে কুরআন, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও মুফতী নামে পরিচিত ছিলেন। সাহাবায়ে কেরামের সার্বিক ব্যাপারে তারাই সিদ্ধান্ত দিতেন। যে ব্যাপারে কুরআন হাদীসে সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা থাকতো তারা সে ক্ষেত্রে সরাসরি কুরআন হাদীস থেকে ফায়সালা দিতেন। কুরআন হাদীসে পাওয়া না গেলে নিজ নিজ ইজতিহাদ ও কিয়াস দ্বারা তার সমাধান দিতেন। অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম বিনাবাক্যে তাদের সিদ্ধান্ত অনুসরণ (তাকলীদ) করতেন। সকল ক্ষেত্রে তাদেরকে ফায়সালাকারী মানতেন এবং তাদের পরামর্শ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতেন।

লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ফিকহী মাযহাব সাহাবায়ে কেরামের যুগেই বিদ্যমান ছিল। তবে তা শাস্ত্র আকারে সংকলিত ছিল না। মনে রাখতে হবে কোনো বিষয় শাস্ত্র আকারে সংকলিত না হওয়া তার অস্তিত্বহীনতার প্রমাণ নয়। উদাহরণত: কুরআন অবতরণের যুগে আরবী ব্যাকরণ শাস্ত্র আকারে সংকলিত ছিল না। কিন্তু কুরআন নাযিলের শত শত বছর পূর্ব থেকেই আরবগণ ব্যাকরণসম্মত আরবীতে কথা বলে ও সাহিত্য চর্চা করে এসেছেন। যাহোক কিছু সংখ্যক সাহাবী ছিলেন মাযহাবের ইমাম। আর অন্যান্যরা তাদের ফিকহী মতামত অনুসরণ করে চলতেন। অর্থাৎ তারা ইমাম সাহাবীদের তাকলীদ করতেন। এ ব্যাপারে ইমাম বুখারী রহ. এর বিশিষ্ট উস্তাদ ইমাম আলী ইবনুল মাদীনী রহ. এর বর্ণনা দেখুন। তিনি তার এক রচনায় সেসব ফকীহ সাহাবীর আলোচনা করেছেন যাদের শিষ্যগণ তাদের মতামত ও সিদ্ধান্তগুলো সংরক্ষণ করেছেন। আর তাদের মাযহাব ও তরীকার উপর আমল ও ফাতাওয়া চালু ছিল। তিনি বলেছেন, সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে এ ধরনের ব্যক্তি ছিলেন ১. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা. ২. যায়েদ ইবনে সাবেত রা. ৩. আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.। এরপর হযরত আলী ইবনুল মাদীনী রাহ. তাদের প্রত্যেকের মাযহাব অনুসরণকারী ও সে মোতাবেক ফাতাওয়া প্রদানকারী ফকীহ তাবেঈদের নাম উল্লেখ করে বলেছেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা. এর যে শিষ্যগণ তার কিরাআত অনুযায়ী লোকদেরকে কুরআন শিখাতেন তার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফাতাওয়া দিতেন এবং তার মাযহাব অনুসরণ করতেন, তারা হলেন, ১. হযরত আলকামা রহ. ২. হযরত আসওয়াদ রহ. ৩. হযরত মাসরূক রহ. ৪. হযরত আবীদাহ রহ. ৫. হযরত আমের ইবনে শুরাহবীল রহ. ৬. হযরত হারিস ইবনে কায়েস রহ. প্রমুখ। অতঃপর ইবনুল মাদীনী রহ. বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা. এর ফকীহ শিষ্যদের সম্পর্কে ও তাদের মাযহাব বিষয়ে পরবর্তীদের মধ্যে সর্বাধিক বিজ্ঞ ছিলেন, ইবরাহীম নাখায়ী ও আমের ইবনে শুরাহবীল রহ.। তারপর তিনি হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত রহ. এর মাযহাবের অনুসারী ও তার সিদ্ধান্তসমূহ সংরক্ষণকারী ও তদানুযায়ী ফাতাওয়া প্রদানকারী বারোজন ফকীহর নাম উল্লেখ করে বলেন, এদের মধ্যে যায়েদ ইবনে সাবিতের মাযহাব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছিলেন ইবনে শিহাব যুহরী, ইয়াহইয়া ইবনে যায়দ আনসারী, আবূ যিনাদ ও আবূবকর ইবনে হাযম। অতঃপর তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এর মতামত সংরক্ষণকারী ও তার প্রচার প্রসারকারীদের নাম উল্লেখ করেন। (কিতাবুল ইলাল ১৩৫-১৫৭)

সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছে, একবার মদীনা শরীফ থেকে কিছু লোক হজ্ব করতে মক্কা শরীফ এসেছিল। বিদায়ের সময় তাদের এক মহিলা বিদায়ী তওয়াফের পূর্বেই ঋতুমতী হয়ে পড়ে। তারা মক্কার মুফতী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এর নিকট ফাতাওয়া জানতে চান। তিনি ফাতাওয়া দিলেন, এই মহিলার বিদায়ী তাওয়াফ মাফ হয়ে যাবে। তারা বলল, আমাদের মদীনার মুফতী যায়েদ ইবনে সাবিত তো বলেন, এ ধরনের মহিলা পবিত্র হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে অতঃপর বিদায়ী তওয়াফ করে দেশে ফিরে যাবে। আমরা তার মতামত কিভাবে উপেক্ষা করব? হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. তাদেরকে বললেন, তোমরা মদীনার উম্মে সুলাইমকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর। নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রী হযরত সাফিয়্যা রা. এ অবস্থার সম্মুখীন হলে তিনি তাকে আমার মতই সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। (সহীহুল বুখারী, কিতাবুল হজ্ব হাদীস নং ১৭৫৮, ১৭৫৯)

মদীনা শরীফের উক্ত হাজীদের এ মন্তব্য সবিশেষ লক্ষণীয় যে, আমরা কিভাবে যায়েদ ইবনে সাবিতের মতামত উপেক্ষা করব। এই মন্তব্য একথার সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, তারা সর্ব ব্যাপারে হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত রা. এর মাযহাবের (সিদ্ধান্তসমূহ) তাকলীদ করতেন। 

এ আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট হল, তাকলীদের বিষয়টি সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে পুরোপুরি বিদ্যমান ছিল। আর থাকবে নাই বা কেন, তারাতো নিজেদেরকে ডক্টর আর আযহারী মনে করতেন না। তারা চাইতেন যে ব্যাপারে নিজেদের জানা নেই তা বিজ্ঞ ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের থেকে জেনে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করি। এভাবে আমল করাকে তারা সৌভাগ্য জ্ঞান করতেন। কারণ তারা ছিলেন প্রকৃতই সত্যের অনুসন্ধানী। আর বর্তমানের গাইরে মুকাল্লিদ ভাইদের কাণ্ড-কারখানা নিয়ে তাদের প্রখ্যাত ইমাম নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান কত সুন্দর বলেছেন, (বর্তমান যামানায় গাইরে মুকাল্লিদ (আহলে হাদীস) ভাইদের না আছে সঠিক পথ লাভ করার চিন্তা-ভাবনা, আর না আছে সঠিক জ্ঞানের অনুসন্ধান। তারা শুধু সরলমনা সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে দু’চারটি ফিকহী মাসআলা প্রচার করে তাদের বিভ্রান্ত করছেন। (আল হিত্তাহ ফি যিকরিস সিহাহ সিত্তাহ এর ভূমিকা পৃ: ১৫৩)

আল্লাহই ভালো জানেন এতে তাদের কি লাভ? মুসলমানদের ইজতিমায়ী জীবনে ফাটল ধরানো তো দ্বীনের মারাত্মক ক্ষতি

🌷🌷🌷তাবেঈ ও তাবে তাবেঈদের যুগে তাকলীদ🌼🌼🌼🌿🌿🌿🍀🍀🍀

তাবেঈ ও তাবে তাবেঈদের যুগে কিয়াস, ইজতিহাদ ও তাকলীদঃ

নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগ ও সাহাবাযুগের কিয়াস, ইজতিহাদ ও তাকলীদ নিয়ে আলোচনার পর আমরা তাবেঈ ও তাবে তাবেঈদের যুগের কিয়াস ইজতিহাদ ও তাকলীদ নিয়ে আলোচনা করতে চাই। যাতে খাইরুল করুনের গোটা সময়ে কিয়াস ইজতিহাদ ও তাকলীদের উপস্থিতি আমাদের সামনে স্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয় এবং তাকলীদ অস্বীকারের গোমরাহী থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়।

স্বয়ং নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কিয়াস ও ইজতিহাদ জারি করে গিয়েছিলেন, সাহাবাযুগ হয়ে তা তাবেঈ ও তাবে তাবেঈদের সময়ও হুবহু বরং আরও বেগবান হয়ে অব্যাহত থাকে। নিম্নে তার কিছু প্রমাণ পেশ করা হলো।

১. বিশিষ্ট তাবেঈ হযরত শুরাইহ রহ. থেকে বর্ণিত, হযরত উমর রা. তাঁর নিকট প্রেরিত এক পত্রে লিখেছেন, যখন তোমার সামনে কোনো সমস্যা উত্থাপিত হবে, তুমি কিতাবুল্লাহ থেকে তার সমাধান দিবে। কিতাবুল্লাহয় না পেলে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাহ থেকে সমাধান দিবে। যদি সুন্নাহর মধ্যেও সমাধান না পাও তাহলে সাহাবা কেরামের ইজমা দ্বারা সমাধান দিবে। যদি কিতাব সুন্নাহ ও ইজমায়ে সাহাবায়ও সমাধান না পাও তাহলে তোমার ইজতিহাদ অনুযায়ী সমাধান দিয়ে দিবে। অন্য বর্ণনা অনুযায়ী তিনি বলেছেন, তাহলে তোমার ইচ্ছা ইজতিহাদ করেও ফায়সালা দিতে পারো কিংবা বিরতও থাকতে পার। এটাই তোমার জন্য নিরাপদ পন্থা। (জামিউ বয়ানিল ইলমি ওয়া ফাজলিহী ২/৭৪৬, দারেমী ১/৪৬)

২. তাবেঈ হযরত আবূ আব্দুর রহমান ইবনে ইয়াযীদ রহ. থেকে বর্ণিত, একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর নিকট বহুসংখ্যক সাহাবী ও তাবেঈ সমবেত হন। তিনি তাদেরকে উপরিউক্ত উপদেশ প্রদান করেন এবং বলেন, ইজতিহাদ করতে গিয়ে কেউ সন্দেহমূলকভাবে কিছু বলতে পারবে না। যেমনঃ আমার মনে হয় বা আমার ভয় হয় এজাতীয় শব্দ বলবে না। যা বলার সুস্পষ্টভাবে বলবে। কারণ হালাল-হারাম স্পষ্ট বিষয়।  (দারেমী ১/৪৬, জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাজলিহী হা নং ১৫৯৭)

অন্য রেওয়ায়াতে আছে, তিনি বলেছেন, আর যদি (ইজতিহাদের মূলনীতি না জানার কারণে) কেউ ইজতিহাদ না করতে পারে তাহলে তা স্বীকার করতে সে যেন লজ্জাবোধ না করে। 

৩. ইমাম আওযায়ী রহ. বলেন, আমি ইমাম যুহরী রহ. এর নিকট শুনেছি, বিশুদ্ধ কিয়াস ইলমে দ্বীনের উত্তম সাহায্যকারী। (জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাজলিহী হাদীস নং ১৬১৫)

৪. আবূ সালামা ইবনে আবদুর রহমান রহ. বিশিষ্ট তাবেঈ হাসান বসরী রহ. কে জিজ্ঞেস করলেন, জনাব! আপনি লোকজনের মাসআলা মাসাইলের কিভাবে সমাধান দেন, সব বিষয়ই কি সাহাবীদের থেকে শোনা কথা, নাকি এ ব্যাপারে ইজতিহাদও করে থাকেন? হাসান বসরী রহ. উত্তরে বললেন, আল্লাহর শপথ আমাদের সব ফাতাওয়াই সাহাবীদের থেকে শোনা নয় বরং অনেক ক্ষেত্রেই আমরা ইজতিহাদ করে মানুষের জন্য অধিক কল্যাণের পথ খুঁজে বের করি যা তারা নিজেরা বের করতে পারে না। (জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাজলিহী হাদীস নং ১৬১৯ তাবাকাতু ইবনে সাদ ৭/১৬৫)

৫. হযরত হাম্মাদ রহ. বলেন, আমি ইবরাহীম নাখায়ীর চেয়ে উপস্থিত ইজতিহাদে যোগ্য আর কাউকে দেখিনি।  (জামিউ বয়ানিল ইলমি ওয়া ফাজলিহী হাদীস নং ১৬২০)

৬. হযরত রাবীআহ রহ. একবার ইমাম যুহরী রহ. কে জিজ্ঞেস করেন, কোনো ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হলে আপনি কিভাবে তার উত্তর দেন? তিনি বলেন, আমি প্রথমে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস দ্বারা জবাব দেই, সেখানে না পেলে সাহাবীদের বক্তব্য দ্বারা দেই তাতেও না পাওয়া গেলে ইজতিহাদ করে উত্তর দেই। (জামিউ বয়ানিল ইলমি ওয়া ফাজলিহী হাদীস নং ১৬২১)

৭. হযরত ইবরাহীম নাখায়ী রহ. বলেন, সব মাসআলা আমাদের জানা থাকে না, অর্থাৎ সরাসরি সুন্নাহয় উল্লেখ থাকে না। বরং আমরা একটা মাসআলা দ্বারা অন্যটি চিহ্নিত করি এবং একটা জানা মাসআলার উপর অজানা মাসআলাকে কিয়াস করি।  (জামিউ বয়ানিল ইলমি ওয়া ফাজলিহী হাদীস নং ১৬৪৬)

৮. ইমাম শা‘বী রহ. বলেন, গরুর যাকাতের ক্ষেত্রে চল্লিশোর্ধ্ব সংখ্যার ক্ষেত্রে আমরা কিয়াস করে আমল করি।(জামিউ বয়ানিল ইলমি ওয়া ফাজলিহী হাদীস নং ১৬৪৫)

হাফেজ ইবনে আবদুল বার রহ. তার কিতাবে তাবেঈদের বিশাল এক জামা‘আতের নাম উল্লেখ করেছেন যারা মাসাইলের সমাধানে নুসুসে শরয়ীর অবর্তমানে ইজতিহাদ করে জবাব দিয়েছেন। বিভিন্ন শহরে উক্ত খিদমতে নিয়োজিত কয়েকজন বিশিষ্ট তাবেঈর নাম উল্লেখ করা হচ্ছে।

(ক) মদীনাঃ সাইদ ইবনুল মুসায়্যিব, সুলাইমান ইবনে ইয়াসার, কাসেম ইবনে মুহাম্মাদ, ইবনে শিহাব প্রমুখ।

(খ) মক্কা ও ইয়ামানঃ মুজাহিদ, ত্বাউস, ইবনে জুরাইজ প্রমুখ।

(গ) কুফাঃ আলকামা, আসওয়াদ, ইবরাহীম নাখায়ী, শুরাইহ, হাম্মাদ ও ইমাম আবূ হানীফা প্রমুখ।

(ঘ) বসরাঃ হাসান বসরী, ইবনে সিরীন প্রমুখ।

(ঙ) শামঃ মাকহুল, আউযায়ী, সুলাইমান ইবনে মুসা প্রমুখ।

(চ) মিসরঃ ইয়াযীদ ইবনে আবূ হাবীব, আমর ইবনে হারেস, লাইস ইবনে সাদ প্রমুখ।

কিয়াস ও ইজতিহাদকে শরী‘আতের দলীল মনে করে তার ভিত্তিতে ফায়সালা দেওয়া ও আমল করা সংক্রান্ত বহু সংখ্যক আসার তাবেঈদের থেকে বর্ণিত আছে। তার যৎসামান্যই উপরে উল্লেখ করা হল। ইলমে দ্বীনের সঙ্গে যাদের ন্যুনতম সম্পর্ক আছে এবং যারা দ্বীনের রুচি সম্পর্কে জ্ঞাত তাদের জন্য এটুকুই যথেষ্ট।

🌷🌷তাকলীদ সম্পর্কে উক্তি ও আমল❤🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌷🌷💟💟

তাকলীদ সম্পর্কে তাবেঈ ও তাবে তাবেঈদের উক্তি ও আমলঃ

মুসলমান মাত্রই একথা বিশ্বাস করেন যে, দ্বীনের মূল বিষয় হল কেবলমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে মেনে চলা ও তার অনুসরণ করা। এমনকি নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণও শুধু এ কারণে ওয়াজিব যে, তিনি ছিলেন আল্লাহ তা‘আলার মুখপাত্র ও ব্যাখ্যাকার। কোন জিনিস হালাল, কোনটি হারাম; কোন কাজ বৈধ, কোনটি অবৈধ এ ব্যাপারে শুধুমাত্র আল্লাহ ও তার রাসূলেরই আনুগত্য করতে হবে। কেউ যদি আল্লাহ ও রাসুলকে বাদ দিয়ে অন্য কারও আনুগত্যের কথা বলে সে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাবে। কাজেই মুসলমানদেরকে কেবল কুরআন ও সুন্নাহর বিধিবিধানই মেনে চলতে হবে, অন্য কারও বিধান নয়।

দুটি বিষয় আমাদেরকে মনে রাখতে হবে। প্রথম কথা হলো, কুরআন ও সুন্নাহর কিছু বিধান এমন আছে যেগুলোর মর্ম কুরআন-হাদীস ও আরবী ভাষা সম্পর্কে সাধারণ বুঝমান ব্যক্তিও অনুধাবন করতে পারে। কারণ এগুলো দ্ব্যর্থহীন এবং সংক্ষেপণ ও সুক্ষ্মতামুক্ত। ফলে এর পাঠক নিঃসংশয়ে তার অর্থ বুঝতে পারবে। যেমন কুরআনের বাণী-  لايغتب بعضكم بعضا

আরবী ভাষী মাত্রই জানেন যে, এর অর্থ হল তোমরা একে অপরের অগোচরে নিন্দা করবে না।

পক্ষান্তরে কুরআন হাদীসে এমন অনেক বক্তব্য রয়েছে যেগুলো দ্ব্যর্থবোধক, সূক্ষ্ম ও সংক্ষিপ্ত। আবার কিছু বক্তব্য বাহিক্য দৃষ্টিতে পরস্পরে সাংঘর্ষিক। দ্ব্যর্থবোধক বাণীর উদাহরণ: والمطلقت يتربصن بانفسهن ثلثة قرؤء তালাক প্রাপ্তা মহিলাগণ তিন কুরু পর্যন্ত ইদ্দত পালন করবে।

আয়াতে বর্ণিত قروء শব্দের দুটি অর্থ ১. হায়েয ২. পবিত্রতা। উক্ত আয়াতে এই দুই অর্থের কোনটি উদ্দেশ্য তা অস্পষ্ট। বলাবাহুল্য হায়েয ও পবিত্রতা এই বিপরীতমুখী দুটি বিষয়ে এক সঙ্গে আমল করা সম্ভব নয়। অথচ কোনো একটার ওপর আমল করতেই হবে। কাজেই দুই অর্থের কোনো একটি নির্ধারণের ক্ষেত্রে একজন বিশেষজ্ঞ ইমামের শরণাপন্ন হয়ে তার তাকলীদ বা অনুসরণের বিকল্প নেই।

অনুরূপ এক হাদীসে এসেছে:  لاصلوة لمن لم يقرأ بفاتحة الكتاب. 

ফাতিহা ছাড়া নামায পূর্ণ হয় না। আর অন্য এক হাদীসে এসেছে:  من كان له امام فقراءة الامام قراءة له.

যার ইমাম আছে ইমামের কিরাআত তারই কিরাআত। এখানে প্রথম হাদীসটি বাহ্যিকভাবে দ্বিতীয়টির সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে হচ্ছে। সুতরাং আমল করতে হলে কোনো ইমামের তাকলীদ করে উভয় হাদীসের সঠিক অর্থ অনুধাবন করতে হবে।

দ্বিতীয় কথা হল, কুরআন হাদীসে মানবজীবনের সকল বিধি-বিধান বর্ণিত হলেও সব বিধান সুস্পষ্ট ও সরাসরি বর্ণিত হয়নি বরং কোনোটা সরাসরি আবার কোনোটি মূলনীতি আকারে। কাজেই ইজতিহাদের যোগ্য নয় এমন ব্যক্তি কুরআন হাদীস থেকে বিধি-বিধান আহরণ করতে গেলে বহুবিধ সমস্যার সম্মুখীন হবে। হয়তো সে আদৌ তা পারবে না। কিংবা পদে পদে ভুল করতে থাকবে। যা হোক কুরআন হাদীস থেকে ব্যবহারিক জীবনের মাসআলা মাসাইল আহরণ করতে হলে আমাদের জন্য মাত্র দুটি পথ রয়েছে। একটি পথ হল, আমরা আমাদের নিজস্ব জ্ঞান বুদ্ধির উপর ভরসা করে কোনো একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হবো এবং তার উপর আমল করব। আর অন্য পথ হল, এ ব্যাপারে নিজেরা ফায়সালা করার পরিবর্তে পূর্ববর্তী কোন কুরআন হাদীস বিশারদের ইলমী প্রাজ্ঞতা, আমলী পূর্ণতা, তাকওয়া খোদাভীরুতার ভিত্তিতে তার উপর আস্থা রেখে তার ব্যাখ্যানুযায়ী আমল করবো। ইনসাফ ও বাস্তবতার সঙ্গে যিনি পরিচিত তিনি নির্দ্বিধায় বলতে বাধ্য হবেন, প্রথম পথটি ভয়ঙ্কর ও আত্মঘাতী আর দ্বিতীয়টি সতর্কতা ও পরহেযগারী। মুজতাহিদ নয় এমন ব্যক্তির কুরআন হাদীসের উপর আমল করার এই দ্বিতীয় পদ্ধতিটি তাকলীদ নামে পরিচিত। তাকলীদের এ ধারা যে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুরু হয়েছিল, এবং সাহাবাযুগেও চালু ছিল তার প্রমাণ আমরা ইতোপূর্বে পেশ করেছি। এবার তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈগণের তাকলীদের কিছু প্রমাণ পেশ করা যাচ্ছে।

ইমাম আযম আবূ হানীফা রহ. ইমাম মালেক রহ. সহ অসংখ্য তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈন যারা কুরআন হাদীসের জ্ঞানে পূর্ণমাত্রায় দক্ষ-বিজ্ঞ ছিলেন। কুরআন হাদীসের বাণী থেকে মূলনীতি তৈরি করে তার আলোকে মাসআলা মাসাইল বের করা ছিল যাদের নিকট পানি পানের মতই সহজ ব্যাপার এবং যারা اصول ও فروع সর্বক্ষেত্রেই মুজতাহিদ ছিলেন তারাও বহু মাসআলায় পূর্বসুরীদের তাকলীদ করেছেন। অর্থাৎ যে সকল মাসআলায় কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট কোন নির্দেশনা নেই সেক্ষেত্রে তারা প্রথমেই কিয়াস করার পরিবর্তে সাহাবাদের কথা ও কাজ খোঁজ করতেন। আলোচ্য বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের কোন বাণী বা কর্মের সন্ধান পেলে তারা তার তাকলীদ করতেন। যেমনঃ

১. হযরত উমর রা. কাজী শুরাইহ রহ. কে যে পত্র প্রেরণ করেছিলেন তাতে এ-ও লেখা ছিল যে, যদি এমন কোন মাসআলার সম্মুখীন হও, যার সমাধান কুরআন-সুন্নাহে (সরাসরি) নেই তাহলে পূর্ববর্তীদের ফায়সালার উপর আমল করবে। (দারেমী : ১/৪৬)

উল্লেখ্য কাজী শুরাইহ রহ. স্বয়ং মুজতাহিদে মুতলাক ছিলেন। তা সত্ত্বেও হযরত উমর রা. তাকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কেবল পূর্ববর্তীদের মতামতের অবর্তমানে নিজের মতানুযায়ী ফায়সালার পরামর্শ দিয়েছেন।

২. ইমাম বুখারী রহ. স্বীয় কিতাবে-   واجعلنا للمتقين اماما

এর ব্যাখ্যায় বিখ্যাত তাবেঈ মুজাহিদ রহ. এর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন- ائمة نقتدي لمن قبلنا ويقتدي بنا من بعدنا

হে আল্লাহ! আমাদেকে এমন ইমাম বানান যে, আমরা আমাদের পূর্ববর্তীদের ইকতিদা-অনুসরণ করতে পারি আর আমাদের পরবর্তীরা আমাদেরকে অনুসরণ করতে পারে। (হাদীস নং ৭২৭৫ এর বাব দৃষ্টব্য)

৩. সুনানে দারেমীতে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি ইমাম শাবী রহ. এর নিকট কোন ব্যাপারে জানতে চাইল। তিনি তাকে বললেন, ইবনে মাসউদ রা. এ ব্যাপারে এই কথা বলেছেন। লোকটি বলল, আপনি আমাকে আপনার মতামত বলুন। ইমাম শা‘বী রহ. উপস্থিত লোকদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, আপনারা এই ব্যক্তির প্রতি আশ্চর্যবোধ করছেন না? আমি তাকে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর ফাতাওয়া শোনালাম, আর সে আমার মতামত জানতে চায়! শুনে রাখুন, আমার কাছে এই ব্যক্তির চাহিদা পূর্ণ করার চেয়ে আমার দ্বীন অধিক মূল্যবান। আল্লাহর শপথ! আমার নিকট আমার মতকে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের মোকাবিলায় দাঁড় করানোর চেয়ে গান গেয়ে বেড়ানো উত্তম।  (সুনানে দারেমী ১/৩৭)

লক্ষ্যণীয় হল, ইমাম শাবী রহ. নিজে মুজতাহিদে মুতলাক ছিলেন এবং ইমাম আবূ হানিফা রহ. এর উস্তাদ ছিলেন তথাপি নিজের মতের মুকাবিলায় আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর তাকলীদ করাকেই তিনি প্রাধান্য দিলেন এবং বিষয়টিকে দ্বীনের মূল্যায়ন ও অবমূল্যায়নের সঙ্গে তুলনা করলেন। 

৪. বিখ্যাত তাবেঈ মুজাহিদ রহ. বলেন,

اذا اختلف الناس في شيئ فانظروا ماصنع عمر فخذوابه.

অর্থঃ কোন বিষয়ে যখন লোকেরা মতবিরোধে জড়িয়ে পড়ে তখন লক্ষ্য করো এ ব্যাপারে হযরত উমর রা. কি বলেছেন, অতঃপর সেটাকে গ্রহণ করো। (ই‘লামুল মুআক্কিয়ীন:১/১৬)

৫. হযরত আ‘মাশ রহ. ইবরাহীম নাখায়ী রহ. এর ব্যাপারে বলেন, যখন কোন মাসআলায় হযরত উমর রা. ও হযরত ইবনে মাসউদ রা. একমত পোষণ করেন তখন ইবরাহীম নাখায়ী রহ. আর কারও কথাকে তাদের সমান মনে করেন না। আর যখন তাদের দুজনের মধ্যে দ্বিমত হয় তখন তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর কথাকে গ্রহণ করেন। দেখা যাচ্ছে ইবরাহীম নাখায়ী রহ. বিভিন্ন মাসআলায় তাঁদের তাকলীদ করতেন।  (ই‘লামুল মুআক্কিয়ীন:১/১৭)

৬. আসওয়াদ ইবনে ইয়াযীদ রহ. বলেন, ইয়ামানের মুআয ইবনে জাবাল রা. আমাদের নিকট আগমন করলেন। তিনি আমাদের আমীর ও শিক্ষক ছিলেন। আমরা তার নিকট মাসআলা জিজ্ঞেস করলাম যে, এক ব্যক্তি তার মেয়ে, বোন রেখে ইন্তেকাল করেছে এখন তাঁদের মধ্যে মীরাস কিভাবে বণ্টিত হবে? হযরত মুআয মেয়েকে অর্ধেক আর বোনকে অর্ধেক মীরাস বণ্টন করলেন।

দেখার বিষয় হল, হযরত মুআয রা. মুফতী হিসেবে ফাতাওয়া দিলেন কিন্তু তার দলীল বর্ণনা করলেন না। আর ইয়ামানবাসীও বিনা বাক্যে বিনা দলীলে তার ফায়সালা মেনে নিলেন। তাকলীদ তো একেই বলে। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং ৬৭৩৪)

৭. ইমাম শা‘বী রহ. বলেন- 

من سره ان ياخذ بالوثيقة في القضاء فلياخذ بقول عمر رضـ  

‘যে ব্যক্তি বিচারকার্য বিষয়ক নির্ভরযোগ্য কথা গ্রহণ করতে চায় সে যেন হযরত উমর রা. এর কথাকে গ্রহণ করে।’ (ই‘লামুল মুআক্কিয়ীন:১/১৬) 

এখানে হযরত শাবী রহ. বিচারকার্য বিষয়ে হযরত উমর রা. এর তাকলীদ করতে বললেন। সুনান ও আসারের কিতাবসমূহে তাকলীদ বিষয়ক তাবেঈদের আরও অগণিত বর্ণনা রয়েছে। কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় যৎসামান্য উল্লেখ করা হল। তাকলীদ খাইরুল কুরুনের স্বর্ণযুগেই বিদ্যমান ছিল, একথা আমরা বিভিন্ন দলীল প্রমাণাদির মাধ্যমে স্পষ্ট করে তুলে ধরেছি। তবে সুনির্দিষ্টভাবে ব্যক্তি বিশেষের তাকলীদ করা তখনও পর্যন্ত জরুরী হয়নি। বরং অনির্দিষ্টভাবে যখন যার নিকট জিজ্ঞেস করা বা যাকে মেনে চলা সম্ভব ও সহজ হতো জনসাধারণের মধ্যে তার কাছ থেকেই জিজ্ঞেস করা ও তার মতানুযায়ী আমল করার বেশি প্রচলন ছিল।

এর দুটি কারণ ছিল:

ক. শরী‘আতের খুঁটিনাটি সকল বিধি-বিধান এবং প্রত্যেক মাযহাবের যাবতীয় উসূল ও নীতিমালা তখনও পর্যন্ত লিপিবদ্ধ ও সংকলিত হয়ে মুসলমানদের হাতে পৌঁছেনি। বিধায় যাবতীয় মাসআলা মাসাইলে একজন ইমামের তাকলীদ করা তখন কষ্টসাধ্য বরং দুষ্কর ছিল।

খ. সর্বসাধারণের মধ্যে দ্বীন-ধর্ম, তাকওয়া-পরহেযগারী পূর্ণনিষ্ঠার সঙ্গে বিদ্যমান ছিল। অর্থহীন আবেগ, কুপ্রবৃত্তি ও সুবিধাবাদের প্রতি তাদের মোটেও আকর্ষণ ছিল না। এজন্য সে যুগে নিজের সুবিধামত পদ্ধতির অনুকূল মতামত খুঁজে খুঁজে গ্রহণ করতে দ্বীন-ধর্ম নিয়ে খেলাধুলায় মেতে ওঠার আশঙ্কা ছিল নেহায়েত কম। ফলে প্রায় দু’শ হিজরী পর্যন্ত অমুজতাহিদের জন্য মাযহাবসমূহের মধ্য থেকে বা ইমামগণের মধ্যে কোন একজনকে নির্দিষ্ট করে তার অনুসরণ করাকে উলামায়ে কেরাম জরুরী মনে করেননি। কিন্তু হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষ নাগাদ অথবা তৃতীয় শতাব্দীর শুরু থেকে উপর্যুক্ত কারণ দুটি বিলুপ্ত হতে থাকলে তাকলীদে শাখছি বা নির্দিষ্ট ইমামের অনুসরণ ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করে। কারণ তখন থেকে মুজতাহিদ ইমামদের শিষ্যগণ আপন আপন উস্তাদ ও তার মাযহাবের মূলনীতি অনুযায়ী শরী‘আতের সকল শাখার যাবতীয় সমস্যার সমাধান লিখিত ও পুস্তক আকারে সর্বসাধারণের নিকট পৌঁছে দিতে শুরু করেন।

দ্বিতীয়তঃ সর্বসাধারণের মধ্যে প্রবৃত্তির চাহিদা মেটানো, অন্যায় আবেগ ও সুবিধাবাদের প্রতি আসক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে সাধারণ তাকলীদ অর্থাৎ নিজ নিজ রুচি ও বিবেচনা অনুযায়ী যখন যাকে ইচ্ছা সুযোগমত জিজ্ঞেস করে সে অনুযায়ী আমল করার পদ্ধতি দিন দিন বিপদজনক ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রতীয়মান হতে থাকে। তাই মানুষের বিবেক-বিবেচনা, খোদাভীতি ও তাকওয়ার অবনতিকালীন সেই নাযুক সময়ে যদি তাকলীদে মুতলাক অর্থাৎ অনির্দিষ্ট ইমামের তাকলীদের পথ খোলা থাকে, তাহলে অনেকে জেনে-বুঝে স্বজ্ঞানে আবার কেউ কেউ না জেনে না বুঝে দ্বীনের পরিবর্তে কুপ্রবৃত্তির তাকলীদ করে বেড়াবে। যেমন শীতকালে কোন ব্যক্তির শরীর থেকে রক্ত বের হয়ে গড়িয়ে পড়ল। তো ইমাম আবূ হানিফা রহ. এর মতে এই ব্যক্তির উযু ভেঙ্গে গেছে। কিন্তু ইমাম শাফেয়ী রহ. এর মতে উযু ভাঙ্গেনি, এখন ওই ব্যক্তি শীতের মধ্যে উযু করার কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য ইমাম শাফেয়ী রহ. এর অনুসরণ করে বলবে আমার উযু বহাল আছে। এর কিছুক্ষণ পর ওই ব্যক্তি যদি কোন গায়রে মাহরাম মহিলাকে পর্দা বিহীন স্পর্শ করে তাহলে ইমাম শাফেয়ী রহ. মতে তার উযু ভেঙ্গে গেছে আর ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর মতে উযু ঠিক আছে। তখন সে ইমাম আবূ হানিফা রহ. এর মতের অনুসরণ করে বলবে, আমার উযু আছে। এ অবস্থায় সে নামাযও পড়বে। আর খাহেশাতের পূজারী হয়ে দ্বীন থেকে বহিষ্কার হয়ে যাবে। উদাহরণত: উক্ত মাসআলায় সে একই সময় দুই ইমামের অনুসরণ করে উযু বহাল থাকার দাবী করে নামায পড়ে নিল। এখন যদি উভয় ইমামের নিকট তার নামায সহীহ হওয়ার ব্যাপারে ফাতাওয়া চাওয়া হয়, উভয় ইমামই তার নামায না হওয়ার ফাতাওয়া দিবেন। তারা এর কারণ হিসেবে বলবেন যে, সে উযু ছাড়াই নামায পড়েছে। তবে উযু না থাকার কারণ দুজনের দু‘রকম বলবেন, সেটা ভিন্ন কথা।

বলাবাহুল্য, এ কাজের ফলাফল এই দাঁড়াবে যে, শরী‘আতের বিধি-বিধান মানুষের অবৈধ চাহিদার অনুগামী হয়ে খেলনায় পরিণত হবে। এ জাতীয় খামখেয়ালীপনা হারাম হওয়ার ব্যাপারে কোনো মুসলমানের দ্বিমত নেই। এরই প্রেক্ষিতে দ্বীনের অতন্দ্র প্রহরী ফুকাহায়ে কেরাম যখন দেখলেন, মানুষের দ্বীনদারীর পরিমাপক পারদ দিনকে দিন নিচে নেমে যাচ্ছে এবং তারা ধীরে ধীরে প্রবৃত্তির দাস হয়ে ওঠছে তখন দ্বীনী ব্যবস্থাপনা অক্ষুন্ন্য ও অটুট রাখার স্বার্থে তাঁরা একমত হয়ে ফাতাওয়া দিলেন যে, এখন মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্ট মুজতাহিদ ইমামের তাকলীদ করা ওয়াজিব এবং তাকলীদে মুতলাক তথা অনির্দিষ্ট ইমামের তাকলীদ করার এখন আর কোনো সুযোগ অবশিষ্ট নেই। ফুকাহায়ে কেরামের এই ঐক্যবদ্ধ ফাতাওয়ার পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মুসলমানের জন্য নির্দিষ্ট ইমামের অনুসরণ ওয়াজিব হয়ে গেছে। এর খেলাফ করা ফাসেকী কাজ এবং স্পষ্ট গোমরাহী। নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নাফরমানী এবং মুমিনদের রাস্তা পরিত্যাগ করার শামিল। এ কাজকে কে কুরআনে কারীমে নিষিদ্ধ ঘোষনা করে জাহান্নামের রাস্তা বলেছে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সহীহ বুঝ দান করুন। (হাশিয়াতুত তাহতাবী আলাদ দুররিল মুখতার ৪/১৫৩, আল আশবাহ ১৬৯ পৃষ্ঠা, আশরাফিয়া লাইব্রেরী)

ধারাবাহীক আলোচনা চলবে ইনশাআল্লাহ


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.