🌿🌿🌿মাযহাব কেন মানি ধারাবাহিক আলোচনা পর্ব-৯🌷🌷🌷🌷🌷🌷
🌹🌹🌹যুগ শ্রেষ্ঠ ফকীহ ও আলেম🌹💐💐💮💮💝💝🌿🌿🌿🌿🌿
ইমামে আযম আবূ হানীফা রহ. যুগ শ্রেষ্ঠ ফকীহ ও আলেম ছিলেনঃ
ইমামে আ’যম আবূ হানীফা রহ. কর্তৃক ফিকহশাস্ত্র উদ্ভাবন, সংকলন ও অবদানবিষয়ক সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর ফিকহশাস্ত্রে তাঁর উদ্ভাবনী শক্তি, প্রজ্ঞা, পাণ্ডিত্য ও গভীরতা সম্পর্কে মণীষীবৃন্দের মন্তব্য সবিস্তারে তুলে ধরার প্রয়োজন বোধ করছি। যেন অনুসারী বন্ধুরা লাভ করেন দৃঢ় প্রত্যয় আর বদরাগী বান্দারা হয়ে ওঠেন অনুরাগী।
পূর্বে বলা হয়েছে, ফুতুহাতে ইসলামীর ধারাবাহিকতায় যখন অধিকহারে নতুন নতুন অঞ্চলসমূহ ইসলামী সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত হতে থাকে এবং সেসব অঞ্চলের মানুষের মধ্যে নিত্যনতুন জিজ্ঞাসা ও সমস্যার উদ্ভব ঘটতে থাকে, তখন উক্ত সমস্যাবলীর সমাধানকল্পে ইমামে আযম আবূ হানীফা রহ.-ই সর্বপ্রথম ইসলামী বিধি-বিধানকে সুবিন্যস্ত ও একাডেমিক পদ্ধতিতে লিপিবদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বস্তুত: কুদরতে ইলাহীর নিকট সকল কাজের জন্যই সময় ও নির্ধারিত থাকে। ফিকহে ইসলামীর ইতিহাসের ধারাক্রম পর্যবেক্ষণ করে নির্দ্ধিধায় বলা যায় যে, আল্লাহ তা’আলা উক্ত কাজের জন্য ইমামে আযম আবূ হানীফা রহ. ও তাঁর যুগকে নির্ধারণ করেছিলেন। ফলে কুদরাতে ইলাহীই তাঁকে এ কাজের যাবতীয় মাধ্যম ও উপায়-উপকরণ যথেষ্ট পরিমাণে সরবরাহ করেছিলেন। তাই তো দেখা যাচ্ছে, একক প্রচেষ্টায় যুগের উল্টো রেওয়ায়েতকে ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম এমন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন জগদ্বিখ্যাত ব্যক্তিদের একটি বিশাল দল তাঁর চারপাশে সমবেত হয়েছিল। যাদের মধ্য থেকে বাছাই করে পারদর্শী ও দূরদর্শী চল্লিশজনের সমন্বয়ে তিনি গঠন করেছিলেন মজলিসে ইলমী বা ফিকহ বোর্ড। এই ফিকহ বোর্ড বাইশ বছর পর্যন্ত কুরআন-হাদীস, ইজমা, ফাতাওয়ায়ে সাহাবা ও কিয়াসের মাধ্যমে নিরন্তর গবেষণায় গড়ে তুলেছিলেন বিষয়ভিত্তিক ফিকহের এক বিশাল ভাণ্ডার।
ইমাম আযমের পূর্ববর্তী যুগে ফিকহ কোন স্বতন্ত্র ও বিন্যস্ত শাস্ত্র ছিল না। তিনিই এ শাস্ত্রের জনক ও প্রাণপুরুষ। শাফেয়ী মাযহাবের প্রসিদ্ধ ইমাম হাফেয জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহ. লিখেছেন,
ومن مناقب الامام أبي حنيفة التي انفردبها أنه أول من دون علم الشريعة ورتبه أبوابا ثم تبعه مالك بن أنس في ترتيب الموطا ولم يسبق أبا حنيفة .
“ইমাম আবূ হানীফ রহ.-এর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তিনিই সর্বপ্রথম ইলমে শরী‘আতের সংকলন করেছেন এবং একে ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেছেন। তারপর ইমাম মালেক মুয়াত্তার বিন্যাসে তা অনুসরণ করেছেন। আর ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর পূর্বে একাজ কেউ আঞ্জাম দেননি। (তাবয়ীযুস সহীফা পৃ.১৪৪)
সাহাবায়ে কেরামের যুগেই কূফা নগরী ইলমের মারকাযে পরিণত হয়। কূফা ছিল ইসলামী বীর সেনানীদের ছাউনী। আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ফারুক রা. প্রখ্যাত ফকীহ সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. কে মুফতী ও মু’আল্লিম হিসেবে কূফায় পাঠিয়েছিলন। তিনি হযরত উসমান রা.-এর খেলাফতের শেষ পর্যন্ত সুদীর্ঘ পনেরো বছরব্যাপী চরম আত্মত্যাগ ও পরম সাধনার মাধ্যমে কূফা নগরীতে ফুকাহা অর্থাৎ ইসলামী আইন গবেষকদের একটি বিশাল জামা‘আত গড়ে তোলেন। হযরত আলী রা. কূফার এই চিত্র দেখে বিস্মিত হন এবং ইবনে মাসউদ রা.কে লক্ষ্য করে বলেন, ملئت هذه القرية علما وفقها ‘আপনি তো এই জনপদকে ইলম ও ফিকহ দিয়ে ভরপুর করে দিয়েছেন।’ পরবর্তীতে হযরত আলী রা.-এর খেলাফতকালে কূফা নগরী ইসলামী খেলাফতের রাজধানীতে পরিণত হয় এবং ইলম ও ফিকহের পঠন-পাঠন আরও জোরদারভাবে চলতে থাকে। পূর্বেও বলা হয়েছে কূফা নগরীতে প্রায় পনেরো শত সাহাবীর বসবাস ছিল। তাদের ৭০ জন ছিলেন বদরী আর ৩০০ জন বাইয়াতে রিজওয়ানে অংশগ্রহণকারী, তাদের পদচারণায় খেলাফতের রাজধানী কূফা, ইলমেরও রাজধানীতে পরিণত হয়েছিল। কূফা নগরীতে ইলমে ফিকহের দরস ও তাদরীসের সিলসিলা যুগ যুগ ধরে অব্যাহত ছিল। দেশ-বিদেশের অগণিত মানুষ দলে দলে কূফার ফকীহদের দরসে হাজির হতেন। কূফার ফুকাহায়ে কেরাম যুগশ্রেষ্ঠ ফকীহকেই তাদের দরসের মসনদে আসীন করতেন। কূফা নগরীর ঐতিহ্যবাহী সেই ইলমী মসনদে পর্যায়ক্রমে সমাসীন ছিলেন হযরত ইবনে মাসউদ রা. ও হযরত আলী রা. ।
তৎপরবর্তীতে বিখ্যাত তাবেঈ হযরত আলকামা রহ., তাঁর পরে হযরত ইবরাহীম নাখয়ী রহ. তার পরে হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান রহ., তাঁর পরে কূফার ইলমী মসনদে সমাসীন হন ইমামে আযম আবূ হানীফা রহ.। এই ধারাক্রমই বলে দিচ্ছে, ইমাম আবূ হানীফা রহ. যুগশ্রেষ্ঠ ফকীহ ছিলেন। তাঁর এই শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দিয়েছেন বিশ্ববরেণ্য অসংখ্য উলামা ও ফুকাহায়ে কেরাম। উদরহণতঃ
১. বিখ্যাত ইতিহাসবিদ, রিজালশাস্ত্রের প্রখ্যাত ইমাম হাফেয যাহাবী রহ. বলেন,
أفقه أهل الكوفة على وابن مسعود وافقه أصحابهما علقمة وافقه أصحابه ابراهيم النخعي وافقه اصحاب ابراهيم حماد وافقه اصحاب حماد ابو حنيفة ألخ:
“কূফার শ্রেষ্ঠ ফকীহ হলেন আলী ও ইবনে মাসউদ রা., তাদের শিষ্যদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ফকীহ আলকামা। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ফকীহ ইবরাহীম নাখয়ী। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ফকীহ হাম্মাদ। হাম্মাদের শিষ্যদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ফকীহ আবূ হানীফা। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ৫/২৩৬)
২. হাফেয যাহাবী রহ. অন্য এক স্থানে ইমাম আযমের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন,
الامام فقيه الملة عالم العراق أبو حنيفة عنى بطلب الأثار وارتحل في ذلك واما الفقه والتدقيق في الرأي وغوامضه فاليه المنتهي والناس عليه عيال في في ذلك.
“আবূ হানীফা রহ. যিনি ছিলেন ইমাম, মুসলিম মিল্লাতের ফকীহ, ইরাকের বিশিষ্ট আলেম, তিনি হাদীস অন্বেষণের প্রতি সবিশেষ মনোযোগ দিয়েছেন এবং এ উদ্দেশ্যে সফর করেছেন। ইলমে ফিকহের সূক্ষাতিসূক্ষ্ম বিষয়ে তিনিই সর্বশেষ আশ্রয়স্থল। এ ব্যাপারে সকল মানুষ তার কাছে দায়বদ্ধ। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ৬/৩৯০)
৩. ফিকহী আহকাম নিরূপণে ইমাম সাহেবের নীতি ছিল বিস্ময়কর ও সূক্ষাতিসূক্ষ্ম । তিনি প্রতিটি মাসআলার দলীল গ্রহণ ও মান নিরুপণে এমন সুদক্ষ ছিলেন যে, তার দক্ষ শিষ্যগণও হতবাক হয়ে যেতেন। ইমাম সাহেবের বিস্ময়কর এ যোগ্যতা সম্পর্কে ইমাম মালেক রহ. মন্তব্য করেছেন:
هذا رجل لواراد أن يقيم الدليل على أن هذه السارية من ذهب لا ستطاع.
ইমাম আবূ হানীফা রহ. তো এমন এক ব্যক্তি, এই স্তম্ভটিকে দলিলের মাধ্যমে স্বর্ণ বলে প্রমাণ করতে চাইলে অবশ্যই তাতে সক্ষম হবেন। (আস সুন্নাহ ওয়া মাকানাতুহা ফিত তাশরীইল ইসলামী পৃ. ৪৪২)
৪. ইমাম শাফেয়ী রহ.-এর শায়েখ ওয়াকী ইবনুল জাররাহ রহ. বলেন,
ما لقيت أحدا أفقه من أبي حنيفة
‘আমি ইমাম আবূ হানীফা রহ.-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো ফকীহর সাক্ষাৎ পাইনি।’ (তারীখে বাগদাদ ১২/২৪৫)
৫. স্বয়ং ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন,
من أراد أي يعرف الفقيه فليلزم أبا حنيفة وأصحابه فإن الناس كلهم عيال عليه في الفقه.
“যে ব্যক্তি ইলমে ফিকহ শিখতে চায় সে যেন ইমাম আবূ হানীফা রহ. ও তার শিষ্যদেরকে আঁকড়ে ধরে। কেননা সকল মানুষ ফিকহ বিষয়ে আবূ হানীফা রহ. এর নিকট দায়বদ্ধ। (তারীখে বাগদাদ-১৩/২৮৬)
৬. মুহাম্মাদ ইবনে বিশর বলেন,
كنت اختلط الى أبي حنيفة وسفيان الثوري فاتيت سفيان الثوري فيقول من أين جئت؟ فاقول من عند أبي حنيفة فيقول : لقد جئت من عند أفقه الأرض.
“আমি ইমাম আবূ হানীফা ও সুফিয়ান সাওরীর নিকট আসা-যাওয়া করতাম। একদা সুফিয়ান সাওরীর নিকট গমন করলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কোথা হতে এলে? বললাম, আবূ হানীফার নিকট থেকে। শুনে তিনি মন্তব্য করলেন, তুমি তো ভূপৃষ্ঠের শ্রেষ্ঠ ফকীহর নিকট থেকে এসেছো। (আল খাইরাতুল হিসান পৃ. ২১০)
৭. শামসুল আইম্মাহ হুলওয়ানী রহ. বলেন,
قلت لأبي عاصم النبيل : أبو حنيفة أفقه أو السفيان؟ قال أبو حنيفة عندي أفقه من سفيان.
“আমি আবূ আসেম নাবীলকে জিজ্ঞেস করলাম, আবূ হানীফা বড় ফকীহ নাকি সুফিয়ান সাওরী? তিনি বললেন, আমার দৃষ্টিতে সুফিয়ানের তুলনায় আবূ হানীফা শ্রেষ্ঠ ফকীহ। (তারীখে বাগদাদ-১৩/৩৪২)
৮. হুসাইন ইবনে ইবরাহীম বলেন,
سمعت أبا بكر بن عياش يقول : كان النعمان بن ثابت فهما من أفقه أهل زمانه.
“আমি আবূ বকর ইবনে আইয়াশকে বলতে শুনেছি, আবূ হানীফ ছিলেন তীক্ষ্ণ ধীশক্তিসম্পন্ন যুগশ্রেষ্ঠ ফকীহ। (ফাযাইলু আবী হানীফা পৃ.৮১)
৯. নসর ইবনে শুমাইল বলেন,
كان الناس نياما في الفقه حتى أيقظهم أبو حنيفة بما تفقه وبينه ولخصه.
“ফিকহের ব্যাপারে সকলে ঘুমিয়ে ছিল। আবূ হানীফা রহ. ফিকহ চর্চা ও গবেষণার মাধ্যেমে তাদেরকে জাগ্রত করেছেন। (তাবয়ীযুস সহীফা পৃ. ২৪)
১০. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. বলতেন,
أفقه الناس أبو حنيفة ما رأيت في الفقه مثله.
“আবূ হানীফা রহ. মানবকুলের শ্রেষ্ঠ ফকীহ। এ ব্যাপারে কাউকে তার সমতুল্য দেখিনি। (তাবয়ীযুস সহীফা পৃ. ২৪)
১১. আবূ হাইয়্যান তাওহীদী রহ. বলেন, ...
الملوك عيال عمر اذا اساسوا والفقهاء عيال أبي حنيفة اذا قاسوا والمحدثون عيال على أحمد بن حنبل اذا اسندوا.
“শাসকবর্গ রাজনীতির ব্যাপারে হযরত উমরের নিকট দায়বদ্ধ। ফুকাহয়ে কেরাম কিয়াস প্রশ্নে ইমাম আবূ হানীফার নিকট দায়বদ্ধ। আর মুহাদ্দিসীনে কেরাম সনদ বর্ণনার ক্ষেত্রে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের নিকট দায়বদ্ধ। (মানাকিবুল কারী পৃ. ৪৬১)
১২. হাফেয সাম‘আনী রহ. স্বীয় কিতাব আল আনসাব এ লেখেনঃ
رأى أبو حنيفة في المنام أنه ينبش قبر النبي صلى الله عليه وسلم فقيل لمحمد بن سيرين فقال : صاحب هذه الرؤيا يثور علما لم يسبقه أحد قبله.
“ইমাম আবূ হানীফা রহ. একদা স্বপ্নে দেখেন, তিনি নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর খনন করছেন। মুহাম্মাদ ইবনে সীরীনকে (বা অন্য কোনো বুযুর্গকে) এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, এই স্বপ্নদ্রষ্টা ইলমের এমন একটি ভিত্তি রাখবেন, যা এ পর্যন্ত অন্য কেউ রাখতে পারেনি। (কিতাবুল আনসাব : সাম’আনী)
১৩. প্রখ্যাত তাবেঈ ইসরাঈল রহ. বলেন,
كان نعم الرجل النعمان ما كان احفظه لكل حديث فيه فقه وأشد فحصه وأعلمه بما فيه من الفقه.
“ইমাম আবূ হানীফা রহ. কেমন বিস্ময়কর ব্যক্তি। কী বিস্ময়করভাবেই না তিনি ফিকহসংবলিত হাদীসসমূহ মুখস্ত করে নিতেন। হাদীস থেকে ফিকহ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে তার চেয়ে অগ্রগামী কাউকে দেখিনি। হাদীসের ফিকহ উপলব্ধির ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সবার সেরা। (তারীখে বাগদাদ ১৩/৩৩৯)
১৪. ইমাম আবূ ইউসুফ রহ. বলেন,
ما رأيت احدا أعلم بتفسير الحديث ومواضع النكت التي فيه من الفقه من أبي حنيفة (
হাদীস ও হাদীসের ফিকহ সংবলিত সূক্ষ্ম স্থানের ব্যাখ্যাদানে আমি ইমাম আবূ হানীফা রহ.-এর চেয়ে পারদর্শী আর কাউকে দেখিনি। (তারীখে বাগদাদ ১৩/৩৪০)
১৫. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. বলেন,
ان كان الأثر قد عرف واحتج الى الرأي فرأى مالك وسفيان وأبي حنيفة وأبو حنيفة أحسنهم وادقهم فطنة وأغوصهم على الفقه وهو أفقه الثلاثة.
“যদি কোনো হাদীসে ব্যাখ্যার প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে ইমাম মালেক রহ., সুফিয়ান সাওরী রহ. ও ইমাম আবূ হানীফা রহ.- এর ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য হবে। তাদের মধ্যে ইমাম আবূ হানীফা রহ. হলেন সর্বোত্তম, সবচেয়ে সূক্ষ্মদর্শী ও ফিকহশাস্ত্রে অধিক মনোযোগী। তিনজনের মধ্যে তিনিই শ্রেষ্ঠ ফকীহ। (তারীখে বাগদাদ ১৩/৩৪৩)
১৬. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. আরও বলেন, আমি হাসান ইবনে উমারাকে আবূ হানীফা রহ. -এর বাহন ধরা অবস্থায় দেখেছি, তিনি বলছিলেন, আল্লহার কসম! আমরা আপনার মতো ফিকহ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গতর এবং সংক্ষিপ্ততর কথা বলতে আর কাউকে দেখিনি। আপনার সমসাময়িক যারা ফিকহ নিয়ে গবেষণা করছে আপনি হচ্ছেন তাদের সরদার। কেবল হিংসুকেরাই আপনার সমালোচনা করে থাকে। (মুকাদ্দামা : ই’লাউস সুনান পৃ. ১১)
১৭. হাফেয সাম‘আনী রহ. বলেন,
دخل يوما على المنصور وكان عنده عيسى بن موسى فقال للمنصور : هذا عالم الدنيا اليوم.
“ইমাম আবূ হানীফা রহ. একদিন খলীফা মানসুরের দরবারে উপস্থিত হলেন। সেখানে ঈসা ইবনে মূসাও উপস্থিত ছিলেন। তিনি খলীফাকে বললেন, ইনি (আবূ হানীফা রহ. বর্তমান বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ আলেম। (কিতাবুল আনসাব লিস সাম’আনী)
১৮. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. বলেন, আমি কূফায় সেখানকার উলামায়ে কেরামকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের দেশের সবচেয়ে বড় আলেম কে? সকলে একবাক্যে উত্তর দিলেন, ইমাম আবূ হানীফা। তারপর আমি যেকোনো উত্তম গুণাবলী ও কৃতিত্বের ব্যাপারেই জানতে চাইলাম। তারা সবাই বললেন, ইমাম আবূ হানীফা ব্যতীত এসব গুণের অধিকারী অন্য কাউকে আমরা দেখি না। কেউ আছে বলেও আমাদের জানা নেই। (মীযানুল কুবরা লিশ শা’রানী ১/৮৭)
১৯. ইয়াযিদ ইবনে হারুন বলেন,
ادركت ألف رجل وكتبت عن أكثرهم ما رأيت فيهم أفقه ولا أورع ولا أعلم من خمسة أولهم أبو حنيفة.
“আমি প্রায় একহাজার আলেমদের সাক্ষাৎ পেয়েছি এবং তাদের অনেকের থেকে হাদীস সংগ্রহ করেছি। তাদের মধ্যে পাঁচজনকে পেয়েছি, যাঁরা ছিলেন শ্রেষ্ঠ ফকীহ ও শ্রেষ্ঠ খোদাভীরু ও শ্রেষ্ঠ আলেম। আর তাদের সেরা জন হলেন ইমাম আবূ হানীফা রহ. (জামেউ বয়ানিল ইলম ১/২৯)
২০. শাদ্দাদ ইবনে হাকীম বলেন, ما رأيت أعلم ن أبي حنيفة “আমি ইমাম আবূ হানীফা রহ.-এর চেয়ে বড় কোনো আলেম দেখিনি। (তারীখে বাগদাদ)
২১. ইমাম বুখারী রহ. -এর শ্রেষ্ঠতম উস্তাদ মক্কী ইবনে ইবরাহীম রহ. বলেন,
أبو حنيفة كان أعلم أهل زمانه.
“আবূ হানীফা রহ. ছিলেন স্বীয় যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম।’
তো দেখা যাচ্ছে, সর্বযুগের সত্য ও ইনসাফ প্রিয় উলামায়ে কেরাম ইমাম আবূ হানীফা রহ.-এর প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। অকুণ্ঠচিত্তে তারা তার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করেছেন। সুতরাং যেসব বন্ধু ইমাম আযম রহ. ও তার মাযহাবের সমালোচনাকে নিজেদের যিন্দেগীর অজিফা বানিয়ে নিয়েছেন তারা একটু ভেবে দেখবেন কী? হিংসা কিংবা অজ্ঞতাবশত তারা কোন মহান ব্যক্তিত্বকে আহত করছেনঃ শেখ সাদী কী চমৎকার বলেছেন,
راست خاهي هزار چشم جهاں كور بهتر كها آفتاب سياه.
সত্য শুনতে চাও, তো বলি- চামচিকার হাজারো চোখ অন্ধ থাকা মেনে নেবো এক সূর্য আলোহীন হওয়ার চেয়ে।
🌷🌷🌷🌷যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস🌹🌹🌹🌍🌍🌍🌍🌍🌍🌍🌍🌍🌍🌍🌍
ইমাম আবূ হানীফা রহ. যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ছিলেনঃ
পূর্বোক্ত আলোচনায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ইমামে আযম আবূ হানীফা রহ. যুগশ্রেষ্ঠ মুজতাহিদ ও ফকীহ ছিলেন। আর ফিকহের উৎস হলো কুরআন, হাদীস, ইজমা ও কিয়াস। কাজেই ফকীহ ও মুজতাহিদের জন্য ফিকহের উৎসসমূহের ওপর সর্বোচ্চ পর্যায়ের পাণ্ডিত্য থাকা অপরিহার্য একটি বিষয়। সুতরাং কাউকে ফকীহ স্বীকার করে নেয়ার পর এই প্রশ্ন তোলা যে, হাদীসের ওপর তার দখল ছিল না নিতান্তই যুক্তিহীন ও গর্হিত কাজ। আহলে হাদীস ভাইয়েরা বলে বেড়ান যে, ইমাম আবূ হানীফা রহ. হাদীস শাস্ত্রে দুর্বল ছিলেন, তার মাত্র সতেরটি হাদীস জানা ছিল। পীর মাওলানা যুলফিকার আলী দা.বা. এই ভিত্তিহীন প্রোপাগান্ডার মোক্ষম জবাবটি প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, ব্যাপারটি যদি বাস্তবিকই এমন হয়ে থাকে তাহলে তো হানাফী মাযহাবকে আমরা আরও মজবুতভাবে আঁকড়ে থাকব: কিছুতেই এর থেকে বিচ্যুত হব না, কারণ মাত্র সতেরটি হাদীসের ওপর গবেষণা করে যিনি দ্বীনের সকল বিষয়ে কমপক্ষে পাঁচ লক্ষাধিক ফিকহী মাসাইল উম্মতকে উপহার দিতে পারেন এবং হাজার বছরেরও অধিককাল ধরে তা কিতাবের পাতায় ও উম্মতের আমলের খাতায় অবিকৃতভাবে সংরক্ষিত থাকতে পারে, তার মাযহাব না মেনে উপায় কী? ইমামে আযমের প্রতি হাদীস না জানার অপবাদ আরোপকারীদেরকে কে বোঝাবে যে, স্বল্প পরিমাণে হাদীস বর্ণনা করা আর হাদীস জানা না থাকা এক বিষয নয়। দুধ থেকে মিষ্টিদ্রব্য প্রস্তুতকারীকে দুধও বিক্রি করতে হবে এমন উদ্ভট শর্ত কেউ আরোপ করেছে কোনো দিন? রেওয়ায়েত কম বলে সাইয়্যিদুনা আবূ বকর সিদ্দিক রা. হাদীস কম জানতেন। কিংবা হাদীস শাস্ত্রে তিনি দুর্বল ছিলেন এমন দাবি করে নিজের মুর্খতা জানান দিতে তো গণ্ডমুর্খও রাজি হবে না।
বস্তুত আল্লাহ তা‘আলা একেক মানুষকে একেক কাজের প্রতি আগ্রহী ও রুচিশীল করে সৃষ্টি করেছেন। বহুকাজে দক্ষতা ও পারদর্শিতা সত্ত্বেও সময়ের দাবি ও রুচি বৈচিত্র্যের কারণে কর্মবিশেষের প্রতি মানুষের ঝোঁক ও প্রবল আগ্রহ থাকে। ফলে মানুষ সে কাজে তার মেধাও শ্রম অকাতরে বিলিয়ে দেয়। তারপর এক সময় অন্য সকল পারদর্শিতা ছাপিয়ে সেই কর্মবিশেষের সঙ্গেই তার নাম ও যশ ছড়িয়ে পড়ে। আল্লাহ তা‘আলা ইমামে আযম রহ. কে ফিকহের আগ্রহ ও রুচি সর্বাধিক পরিমাণে দান করেছিলেন। আর ফিকহ সংকলনও ছিল সময়ের দাবি। ফলে বহু বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব ও পারদর্শিতা সত্ত্বেও তিনি ফকীহ হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। যেমন প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন ইমাম বুখারী রহ. মুহাদ্দিস হিসেবে। অথচ তিনি একজন মুজতাহিদ ফকীহও ছিলেন।
এবার হাদীস শাস্ত্রে ইমাম আযম রহ. এর পাণ্ডিত্য, বুৎপত্তি ও উৎকর্ষের ব্যপারে শাস্ত্রবিশেষজ্ঞ ও সর্বজনমান্য মনীষীদের উক্তির প্রতি নজর ফেরানো যাক।
হাদীস শিক্ষার উদ্দেশ্যে ইমামে আযমের দেশ সফর ও তার উস্তাদবৃন্দঃ
কুফা নগরীর অধিবাসী হওয়ায় স্বভাবতই এই শহরে তার হাদীস শিক্ষার গোড়াপত্তন হয়। ইমাম সাহেবের কুফানগরীর মুহাদ্দিস উস্তাদগণ সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, ইমাম আবূ হানীফা রহ. কুফার ৯৩ (তিরানব্বই) জন মুহাদ্দিস তাবেঈ ও তাবে তাবেঈ থেকে হাদীস শিক্ষা করেছেন।
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর কুফা নগরীর ২৯ জন হাদীসের উস্তাদের অধিকাংশ ছিলেন বড় বড় তাবেঈ। তাদের মধ্যে ইমাম শাবী, সালামা ইবনে কুহাইল, মুহারিব ইবনে দিসার, আ‘মাশ, ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মাদ, আদী ইবনে মারসাদ, আমর ইবনে মুররাহ প্রমুখ জগদ্বিখ্যাত মুহাদ্দিসের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
কুফা নগরীর পর হাদীস শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি বসরা গমন করেন। এ শহরে তার হাদীসের উস্তাদ ছিলেন হযরত হাসান বসরী, শুবা, কাতাদা প্রমুখ বিশিষ্ট তাবেঈগণ। তারপর এতোদুদ্দেশ্যে হারামাইন শরীফাইনসহ পাশ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ সফর করে সমকালীন শ্রেষ্ঠ হাদীস বিশারদে পরিণত হন। মক্কা নগরীতে তার হাদীসের অন্যতম উস্তাদ ছিলেন আতা ইবনে আবী রাবাহ রহ.। হাফেয যাহাবী রহ. বলেন.وسمع الحديث من عطاء ابن ابي رباح بمكة ইমাম আবূ হানীফা রহ. মক্কায় আতা ইবনে আবী রাবাহ রহ. হতে হাদীস শিক্ষা করেছেন। (তারীখে বাগদাদ ১৩/৪৫০) হারেস ইবনে আব্দুর রহমান বলেন,
كنا نكون عند عطاء بعضنا خلف بعض فاذا جاء أبوحنيفة اوسع له وادناه
‘আমরা বিশিষ্ট মুহাদ্দিস আতা ইবনে আবী রাবাহ রহ. এর দরসে একজনের পেছনে আরেকজন উপবেশন করতাম। যখন আবূ হানীফা রহ. উপস্থিত হতেন আতা রহ. তার জন্য মজলিস প্রশস্ত করে দিতেন এবং তাকে কাছে নিয়ে বসাতেন (মাকানাতুল ইমাম আবী হানীফা ফিল হাদীস পৃ:১৯)
হাদীস অন্বেষণের উদ্দেশ্যে দেশ-বিদেশের এসব সফর শেষে ইমাম আযম রহ. এ শাস্ত্রের সকল শাখায় কী পরিমাণ গভীরতা ও বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন তা তারই এক শিষ্য ইমাম আবূ ইউসুফ রহ. এর মুখে শুনুন। তিনি বলেন,
ان اباحنيفة اذا استنبط مسئلة ذهبت الى شيوخ الكوفة لجمع الاحاديث فرجعت واسمعته الاحاديث ليفرح فيتكلم في الاحاديث كلها فلايحتج به ثم قال : انا اعلم بعلم اهل الكوفة.
অর্থঃ ইমাম আবূ হানীফা রহ. যখন দলিল উল্লেখ না করে কোনো মাসআলা বর্ণনা করতেন, আমি তার বর্ণিত মাসআলার সমর্থনে হাদীস সংগ্রহ করতে কুফার মুহাদ্দিসগণের নিকট গমন করতাম। তারপর ফিরে এসে সংগৃহীত হাদীসগুলো তাকে শোনাতাম যেন তিনি খুশি হন। হাদীসগুলো শ্রবণ করে ইমাম আবূ হানীফা রহ. সকল হাদীসের বক্তব্য ও বর্ণনাকারীদের দোষ-ক্রটি সম্পর্কে বিভিন্ন মন্তব্য করে বলে দিতেন যে, এগুলো দ্বারা দলীল পেশ করা যাবে না। তারপর বলতেন, কুফাবাসীদের নিকট যত ইলম আছে তার সবই আমার জানা। (মানাকিবে আবী হানীফা, মোল্লা আলী কারী)
হাদীস শাস্ত্রে ইমামে আযম রহ. এর বিশ্বস্ততা, নির্ভরযোগ্যতা, প্রাজ্ঞতা ও উচ্চ মাকাম সম্পর্কে মনীষীদের উক্তি
১. জারহ ও তা‘দীলের ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন রহ. বলেন,
كان ابو حنيفة ثقة صدوقا في الفقه والحديث مامونا على دين الله.
ইমাম আবূ হানীফা রহ. ফিকহ ও হাদীস উভয় শাস্ত্রে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও সর্বাপেক্ষা সত্যবাদী ছিলেন। তিনি ছিলেন ধর্মীয় সকল ক্ষেত্রে আস্থাভাজন। (তারীখে বাগদাদ ১৩/৪৫০)
২. ইমাম বুখারী রহ. এর উস্তাদ মাক্কী ইবনে ইবরাহীম রহ. বলেন,
كان ابو حنيفة زاهدا عالما راغبا في الاخرة صدوق اللسان احفظ اهل زمانه.
ইমাম আবূ হানীফা রহ. দুনিয়া বিমুখ, আলেমে দ্বীন, আখেরাতে অনুরাগী, সত্যভাষী ও যুগশ্রেষ্ঠ হাফেযে হাদীস ছিলেন। (মানাকিবুল ইমামিল আযম, ছদরুল আইম্মা মক্কী রহ. পৃ: ১৭০)
৩. আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. বলেন, كان والله ورعا حافظا للسنة আল্লাহর কসম! আবূ হানীফা রহ. সর্বাধিক খোদাভীরু ও হাফেযে হাদীস ছিলেন। (মানাকিবে আবী হানীফা, মুওয়াফফক মক্কী- ১৮০)
৪. ইয়াহইয়া ইবনে সাইদ আল কাত্তান রহ. বলেন,
انه والله لاعلم هذه الامة بماجاء عن الله وعن رسوله
আল্লাহর শপথ করে বলছি, আবূ হানীফা রহ. আল্লাহর কুরআন ও রাসুলের হাদীস সম্পর্কে এই উম্মতের সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি। (আল ইমাম ইবনে মাজাহ ওয়া কিতাবুহুস সুনান পৃ: ৫১, মুকাদ্দিমাতু কিতাবিত তালীম ১৩৪)
৫. প্রখ্যাত তাবেঈ ইসরাইল রহ. বলেন,
كان نعم الرجل النعمان ماكان احفظه لكل حديث فيه فقه
ইমাম আবূ হানীফা নুমান এক বিস্ময়কর ব্যক্তি। কী আশ্চর্যজনকভাবেই না তিনি ফিকহসম্বলিত সকল হাদীস মুখস্ত করে নিয়েছিলেন। (তারীখে বাগদাদ ১৩/৩৩৯)
৬. ইমাম খালক ইবনে আইয়ূব রহ. বলেন,
صار العلم من الله الى محمد صلى الله عليه وسلم ثم صار الى اصحابه ثم صار الى التابعين ثم صار الى ابي حنيفة واصحابه فمن شاء فليرض ومن شاء فليسخط.
ইলমে শরী‘আত আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দান করা হয়েছে। তাঁর ইলম সাহাবীদের নিকট পৌঁছেছে। তাদের ইলম তাবেঈদের নিকট পৌঁছেছে। অবশেষে তাবেঈদের ইলম আবূ হানীফা রহ. ও তার শিষ্যদের নিকট পৌঁছেছে। অতএব, যার ইচ্ছা সে সন্তুষ্ট হোক আর যার ইচ্ছা অসন্তুষ্ট হোক। (তারীখে বাগদাদ ১৩/৩৩৬)
৭. খতীবে বাগদাদী রহ. ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন রহ. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
,كان ابو حنيفة لايحدث بالحديث الاما يحفظ ولايحدث مالايحفظ.
ইমাম আবূ হানীফা রহ. কখনো মুখস্ত নেই এমন হাদীস বর্ণনা করতেন না। (তারীখে বাগদাদ, ১৩/৪৪৯)
৮. যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও মুফাসসির আল্লামা সুয়ূতী রহ. বলেন,
كان ابوحنيفة ثقة لايحدث بالحديث الا ما يحفظ ولايحدث بمالايحفظ.
আবূ হানীফা রহ. বিশ্বস্ত মুহাদ্দিস ছিলেন। তিনি কেবল মুখস্ত হাদীসই বর্ণনা করতেন, যা তার মুখস্ত নেই তিনি তা বর্ণনা করতেন না।
৯. ইয়াহইয়া ইবনে নসর রহ. বলেন,
سمعت اباحنيفة يقول! عندي صناديق من الحديث ماخرجت منها الااليسير الذي ينتفع به.
আমি আবূ হানীফা রহ. কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আমার নিকট হাদীসের বহু সিন্দুক রয়েছে। তা থেকে উপকারী অল্প কিছু হাদীসই আমি বর্ণনা করেছি মাত্র। (আল খাইরাতুল হিসান পৃ. ২১১)
১০. ইমাম বুখারী রহ. এর উস্তাদ আলী ইবনুল জাদ রহ. বলেন,
ابو حنيفة اذا جاء بالحديث جاء به مثل الدر.
আবূ হানীফা রহ. যখন হাদীস বর্ণনা করেন মনে হয় যেন মণি-মুক্তা বর্ষণ করছেন। (অর্থাৎ কেবল সহীহ ও মূল্যবান হাদীসগুলো বর্ণনা করেন।) (মাকানাতুল ইমাম আবী হানীফা. আ. রশীদ নুমানকৃত পৃ. ৫৮, জামিউ মাসানীদিল ইমামিল আযম, খাওয়ারিজমী ২/৩০৮)
১১. মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ সালেহী রহ. বলেন,
كان ابو حنيفة من كبار حفاظ الحديث واعيانهم ولولاكثرة اعتنائه بالحديث ماتهيأله استنباط مسائل الفقه.
ইমাম আবূ হানীফা রহ. বড় বড় হাফেযে হাদীস ও শ্রেষ্ঠতম মুহাদ্দিসগণের অন্তর্ভুক্ত। তিনি যদি হাদীসের প্রতি অত্যাধিক মনোযোগী না হতেন তাহলে ফিকহের এত মাসআলা উদ্ভাবন করা তার পক্ষে সম্ভব হতো না। (আল হাদীস ওয়াল মুহাদ্দিস পৃ: ২৮৪)
১২. ইমাম সাহেবের বিশিষ্ট শাগরেদ ইমাম আবূ ইউসুফ রহ. বলেন,
مارأيت احدا اعلم بتفسير الحديث من ابي حنيفة وكان ابو حنيفة ابصر بالحديث الصحيح مني.
হাদীসের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ব্যাপারে ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর চেয়ে অধিক জ্ঞানী আমি আর কাউকে দেখিনি। তিনি সহীহ হাদীস সম্পর্কে আমার চেয়ে অধিক সূক্ষ্মদর্শী ছিলেন। (আল খাইরাতুল হিসান পৃ. ২১)
১৩. একবার ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন রহ. কে আবূ হানীফা রহ. এর নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তরে বলেন,
عدل ثقة ماظنك بمن عدله ابن المبارك ووكيع.
আবূ হানীফা রহ. বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। যাকে আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক ও ওয়াকী রহ. এর মতো ব্যক্তিবর্গ বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য বলে ঘোষণা দিয়েছেন, তার ব্যাপারে তোমার কী ধারণা? (মুকাদ্দামাতু কিতাবিল আসার পৃ: ৮)
১৪. উকুদুল জুমান নামক গ্রন্থে আছে,
كان بصيرا بعلل الاحاديث والتعليل والتجريح
আবূ হানীফা রহ. হাদীসের ইলাল, জরহ ও তাদীল (হাদীসের সনদ ও মতনের ত্রুটি-বিচ্যুতিবিষয়ক সূক্ষ্মতর বিচারবোধ) সম্পর্কে দূরদর্শী ও বোদ্ধা ছিলেন। (উকুদুল জুমান ফী মানাকিবে আবী হানীফাতান নুমান পৃ: ১৬৮)
১৫. বুখারী ও মুসলিম শরীফের অন্যতম বর্ণনাকারী ইমাম শু‘বা রহ. বলেন,
كان والله حسن الفهم جيد الحفظ.
আল্লাহর কসম করে বলছি, ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর বুঝশক্তি উৎকৃষ্ট পর্যায়ের আর স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিল। (আল খাইরাতুল হিসান পৃ: ৩৪)
১৬. আবূ দাউদ শরীফ প্রণেতা ইমাম আবূ দাউদ সিজিস্তানী রহ. বলেন,
رحم الله مالكا كان اماما رحم الله الشافعي كان اماما رحم الله اباحنيفة كان اماما.
আল্লাহ তা‘আলা মালেক, শাফেয়ী ও আবূ হানীফার প্রতি করুণা বর্ষণ করুন। তারা তো ইমাম ছিলেন। অর্থাৎ উম্মতের অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। (ইমাম আবূ দাউদ রহ. এর মতো জগদ্বিখ্যাত মুহাদ্দিস কাউকে মুসলমানদের ইমাম হিসেবে আখ্যায়িত করবেন আর তিনি হাদীস শাস্ত্রে দুর্বল হবেন, এটা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়।)
১৭. শাইখুল ইসলাম ইয়াযিদ ইবনে হারুন রহ. বলেন,
كان ابوحنيفة نقيا تقيا زاهدا عابدا عالما صدوق اللسان احفظ اهل زمانه.
ইমাম আবূ হানীফা রহ. পবিত্রাত্মা, খোদাভীরু, দুনিয়াবিমুখ, ইবাদতগুজার, যবরদস্ত আলিম, সত্যভাষী এবং সমকালীন সকলের চেয়ে বড় হাফেযে হাদীস ছিলেন। (মুকাদ্দিমাতু কিতাবিল আসার পৃ: ৮, মানাকিবু আবী হানীফা, সাইমুরী)
১৮. ইমাম ইয়াহইয়াহ ইবনে সাঈদ রহ. কে একবার ইমাম আবূ হানীফা রহ. সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন,
هو ثقة ما سمعت احدا ضعفه هذا شعبة ابن اللحجاج يكتب اليه ان يحدث ويأمره وشعبة شعبة!!
ইমাম আবূ হানীফা বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। (হাদীসের ক্ষেত্রে) আমি কাউকেই তাকে দুর্বল বলতে শুনিনি। এই যে বিখ্যাত মুহাদ্দিস শুবা ইবনুল হাজ্জাজ তিনি স্বয়ং আবূ হানীফা রহ. কে হাদীস বর্ণনা করতে চিঠি লিখেছেন এবং তাকে এ ব্যাপারে আদেশ করেছেন। আর ইমাম শুবাতো শুবাই। অর্থাৎ তার মতো হাদীস বিশেষজ্ঞ বিরল। সুতরাং তিনি যাকে চিঠি দিয়ে হাদীস বর্ণনা করার নির্দেশ দেন তার সম্পর্কেই বা তোমাদের কী ধারণা? (তাযকিরাতুল হুফফায ১/১৬৮, আল জাওয়াহিরুল মুযিয়্যা ১/৫৬)
১৯. ইমাম হাসান ইবনে যিয়াদ বলেন,
قدانتخب ابو حنيفة كتاب الاثار من اربعين الف حديث.
ইমাম আবূ হানীফা রহ. চল্লিশ হাজার হাদীস হতে বাছাই করে কিতাবুল আসার গ্রন্থটি সংকলন করেন। (আল খাইরাতুল হিসান পৃ. ২১১)
২০. ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন রহ. বলেন,
مارأيت احدا اقدمه على وكيع وكان يفتى برأي ابي حنيفة وكان يحفظ حديثه كله وكان قد سمع من ابي حنيفة حديثا كثيرا.
আমি ইমাম ওয়াকীর ওপর প্রাধান্য দেয়া যায় এমন কাউকে দেখিনি। অথচ তিনিও ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর মতানুযায়ী ফাতাওয়া দিতেন; তার সকল হাদীস মুখস্ত করতেন। আর তিনি তার থেকে প্রচুরসংখ্যক হাদীস শিক্ষা করেছেন। (হাশিয়ায়ে মুসনাদুল ইমামিল আযম পৃ. ৬১, মুকাদ্দামাতু ইলাইস সুনান পৃ. ১৬)
২১. ইমাম আ’মাশ রহ. বলেন,
يامعشر الفقهاء انتم الاطباء ونحن الصيادلة وانت ايها الرجل احذت بكلاالطرفين.
হে ফকীহ সম্প্রদায়! তোমরা উম্মতের চিকিৎসক আর আমরা মুহাদ্দিসগণ ওষুধ বিক্রেতা। আর হে আবূ হানীফা! আপনি একাধারে চিকিৎসক ও ওষুধ বিক্রেতাও। (অর্থাৎ আপনি ফকীহও মুহাদ্দিসও) (আল ফকীহ ওয়াল মুতাফাককিহ ২/৮৪)
২২. খতীবে বাগদাদী রহ. ইমাম বুখারী রহ. এর উস্তাদ আব্দুল্লাহ ইবনে দাউদ কোরাইবীর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন যে, তিনি বলেছেন,
يجب على اهل الاسلام ان يدعوا لابي حنيفة في صلاتهم لحفظه عليهم السنة والفقه.
মুসলমানদের উচিত প্রত্যেক নামাযের পর আবূ হানীফা রহ. এর জন্য দুআ করা। কারণ, তিনি তাদের জন্য হাদীস ও ফিকহ সংরক্ষণ করেছেন। (তারীখে বাগদাদ ১৩/৩৪৪)
২৩. লা মাযহাবী বন্ধুদের গর্ব ও অনুসৃত ইমাম আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রহ. এর একটি বক্তব্য পেশ করেই এ আলোচনা শেষ করতে চাচ্ছি। তিনি বলেন,
ائمة اهل الحديث والتفسير والفقه مثل ائمة الاربعة واتباعهم.
চার ইমাম ও তাদের শিষ্যদের মতো ব্যক্তিবর্গই হচ্ছেন হাদীস, তাফসীর ও ফিকহ শাস্ত্রের ইমাম। (মিনহাজুল সুন্নাহ ১/১৭২)
উপরোক্ত জগদ্বিখ্যাত মনীষীবৃন্দের বক্তব্য ও বিশেষতঃ আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রহ. এর মন্তব্যের দ্বারা নিশ্চিতভাবে জানা গেল যে, ইমামে আযম আবূ হানীফা রহ. শুধু একজন ফকীহই ছিলেন না; তিনি ছিলেন দ্বীনী সকল বিষয়ে এবং সকল শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞ পণ্ডিত। বিশেষতঃ হাদীস শাস্ত্রে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী একজন সূক্ষ্মদর্শী মুহাদ্দিস ও সুদক্ষ হাদীস বিশারদ। আজ যারা নিজেদের জ্ঞানের দৈন্য অথবা নির্ভেজাল শত্রুতার বশে ইমাম সাহেবকে হাদীস শাস্ত্রে অজ্ঞ ও দুর্বল বলে প্রচার করেন তাদের প্রতি আরজ, অনুগ্রহপূর্বক উট পাখির নীতি অবলম্বন করবেন না। কাগজ কলমের অপব্যবহার করে উপর্যুক্ত মনীষীদের সব মন্তব্যকেই না হয় দুমড়ে-মুচড়ে দিবেন কিন্তু ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন আর আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রহ. কে কিভাবে পিঠ দেখাবেন? আল্লাহর দিকে তাকিয়ে আপন মত ও পথকে পুনর্বিবেচনা করে দেখুন। আল্লাহর বাণী শাশ্বত ও চিরন্তন ‘আর যারা আমার উদ্দেশ্যে প্রচেষ্টা চালায় আমি তাদেরকে অবশ্যই আমার পথে উপনীত করব।’ (সূরা আনকাবুত, আয়াত ৬৯)
ইনশা আল্লাহ ধারাবাহিক আলোচনা চলবে
writer: Mawlana Mujahidul Islam