প্রশ্ন: মাযহাব চারটা কেন?
সে অনেক কথা !
মাযহাব চারটা হবে কেন ? ইতিহাসে আরোও তো মাজহাব ছিলো, তবে এই চার মাযহাবকে মানতেই হবে কেন ? চার মাযহাব এসে ইসলামকে চারভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে। মাযহাবের মতানৈক্যর কারণে ইসলামের পতন হয়েছে। বাগদাদের পতন হয়েছে। এরকম কিছু প্রশ্ন আপনারা কি শুনতে পান ?
জ্বী, হ্যাঁ ! হয়তো আপনাদের অনেকেই ইতোমধ্যে এই প্রশ্নের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে আছেন । অনেকেই হয়তো প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে সদুত্তরের অভাবে নিরুত্তর হয়ে আছেন৷ তাই ভাবলাম, বিষয়টি নিয়ে কিছু লিখার দরকার৷ আল্লাহ তাওফীক দাতা!
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান !
বিষয়টি পরিস্কার করার জন্য লেখাটিকে দু'টি প্রশ্নে ভাগ করে নিচ্ছি। এতে আপনাদের বুঝতে সুবিধা হবে , ইনশাআল্লাহ !
১. মাযহাব কেন আসলো ?
২. অনেক মাযহাব থেকে চার মাযহাব কেন ?
প্রথম প্রশ্ন: মাযহাব কেন ?
উত্তর: আমরা জানি যে, আহকামুশ শারীয়া বা শারীয়াতের বিধি-নিষেধ দু'প্রকার -
১. স্পষ্ট আহকাম
২. অস্পষ্ট আহকাম
শারীয়াতের যে সকল বিষয়াদী একদম স্পষ্ট রয়েছে, সে'সব বিষয়ে মাযহাবের কোন বিতর্ক নাই। অপর কথায় বলা যায় যে, ইসলামের মৌলিক বিষয়ে মাযহাবের কোন বিতর্ক নাই। যেমন ধরুনঃ নামাজের হুকুম ফরজ , রোজার হুকুম ফরজ ইত্যাদি ।
শারীয়তের এমন কিছু বিষয় আছে, যা কোর'আন-হাদিসে অস্পষ্ট বা দুর্বোধ্য এসেছে। অপর কথায় বলা যায় যে, শারীয়তের ফুরুয়ী মাসালায় অস্পষ্টতা থাকার কারণে মতানৈক্য হয়েছে।
যেসব ফুরুয়ী বা শারীয়তের শাখাগত বিষয়ে অস্পষ্টতা এসেছে, সেসব বিষয়ে ইসলামের যুগ শ্রেষ্ঠ ইমামগণ নিজস্ব যোগ্যতার বলে গবেষণা করেছেন। আর সেই গবেষণার ফলাফল একাধিক এসেছে বিধায় মাজহাব বা একাধীক মতবাদ এসেছে৷
যেমন ধরুনঃ আল্লাহ তা'লা পবিত্র কোর'আনে সূরায়ে বাক্বারার ২২৯ নং আয়াতে বলেন -
والمطلقات يتربصن بانفسهن ثلاثة قروء
উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'লা তালাকপ্রাপ্তা মহিলাদের ইদ্দতের বর্ণনা দিয়েছেন। তবে আয়াতে ‘কুরু’ শব্দটা অস্পষ্ট । এই ‘কুরু’ শব্দ দ্বারা হায়েজ উদ্দেশ্য নাকি তুহুর উদ্দেশ্য, তা ক্লিয়ার না। যার কারণে, মাজহাবের ইমামগণ গবেষণা করে একটা ফলাফল বের করেছেন। আর এই ফলাফলের ভিন্নতার নামই হলো মাজহাব।
মোদ্দাকথাঃ সংক্ষেপে আমরা জানতে পারলাম দু'টা বিষয় —
১. শারীয়াতের মৌলিক কোন বিষয়ে মাযহাবের ইমামদের মতানৈক্য নাই। বরং ফুরুয়ী তথা শাখাগত বিষয়ে মতবেদ রয়েছে ।
২. শারীয়তের স্পষ্ট কোন বিষয় বর্ণনার জন্য মাজহাব তৈরী হয় নাই। বরং, অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য বিষয় বর্ণনার জন্য মাযহাব বা মতানৈক্য এসেছে ৷
৩ – অস্পষ্ট বিষয়ে গবেষণার একাধিক ফল হিসেবে একাধিক মাযহাব এসেছে ।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: অনেক মাযহাব থেকে চার মাযহাব কেন হলো?
উত্তর: এ কথা চির সত্য যে, সাহাবা ও কিবার ( বড় ) তাবেয়ী পরবর্তী যুগ থেকে অনেক মুজতাহিদ ইমামের গবেষণা থেকে মাজহাব আবিস্কৃত হয়েছিলো বা তারা ইমাম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। এমন শতাধীক মুজতাহিদ ইমামের নাম পাওয়া যায়, যারা নিজস্ব যোগ্যতায় ইজতেহাদ দ্বারা শারীয়াতের অনেক অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য বিষয়ের সমাধান দিয়ে গেছেন। তবে পরবর্তীতে তাদের মতবাদকে মাজহাব হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি।
এর অনেক কারণ আছে। তবে মৌলিক কয়েকটি কারণ আমি এখানে উল্লেখ করছি —
১. কোন মাযহাব তখনই স্বীকৃতি পাওয়ার কথা, যখন কোন মাযহাবে ইসলামের শুরু-শেষ সকল সম্ভাবনাময় সমস্যার সমাধান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, চার মাযহাব ছাড়া অন্য কোন মাযহাবে পূর্ণাঙ্গ সকল বিষয় ফুটে আসে নাই। যার ফলে, ইতিহাসে কেবল প্রসিদ্ধ চার মাযহাবই স্বীকৃতি পায়। অন্য কোন মাযহাব স্বীকৃতি পায় নাই।
২. মাযহাব এর জন্য অতীব প্রয়োজনীয় হলো উসূল বা মূলনীতি থাকা। কারণ, ভবিষ্যতে কোন নতুন বিষয়ে সমাধান দিতে হলে উসূল বা মূলনীতি এর প্রয়োজন হয় । আমরা দেখতে পাই, চার মাযহাব ছাড়া অন্য কোন ইমামের বা মাযহাবের কোন মূলনীতি নাই। যার কারণে চার মাযহাব ছাড়া অন্য কোন মাযহাব স্বীকৃতি পায় নাই।
৩. মাযহাব আমাদের পর্যন্ত কোন তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে পৌঁছে নাই। বরং, মাযহাবের ইমামগণ ইজতেহাদ করেছেন। তাদের গবেষণা প্রতিটা যুগে মুসলিম মনীষাগণ সংরক্ষণ করেছেন। ফলে আমাদের কাছে যথাসুন্দরে এই চার মাযহাব পৌঁছেছে৷ চার মাযহাব ছাড়া অন্য কোন মাযহাব সেভাবে আমাদের কাছে পৌঁছে নাই। ফলে চার মাযহাব ছাড়া অন্য কোন মাযহাব স্বীকৃতি পায় নাই।
৪. ইসলামের স্বীকৃত চার মাযহাবের ইমামগণের হাজার হাজার ছাত্র ছিলেন। যারা মাযহাবকে প্রচার-প্রসারে কাজ করেছিলেন। রাষ্ট্রীয়ভাবেও মাযহাব স্বীকৃতি পেয়েছিল। আব্বাসী যুগে হানাফী মাযহাব অনুযায়ী বিচার কার্য পরিচালিত হতো। অন্যান্য মাহাব সেভাবে হয়নি, বিধায় চার মাযহাব ছাড়া অন্য কোন মাযহাব স্বীকৃতি পায় নাই।
৫. স্বীকৃত চার মাযহাবের বই-পুস্তক আমাদের কাছে যেভাবে স্বতন্ত্র এসেছে, সেভাবে অন্যান্য কোন মাযহাবের বইপত্র আসে নাই। বিধায় চার মাযহাব ছাড়া অন্যান্য কোন মাযহাব এককভাবে অনুসরণীয় হিসেবে স্বীকৃতি পায় নাই।
মোদ্দাকথা, বলতে গেলে আরো অনেক কথা আছে। তবে সবচেয়ে গুরুতর বাস্তব কথা হলো, এটা আল্লাহ তা'লারই একটা ইচ্ছা যা নিয়ামত হিসেবে উম্মাহের উপর আরপিত রয়েছে। নতুবা, তেরো শত বছর আগের ইলম এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে অক্ষুণ্ণ থাকা মোটেও স্বাভাবিক বিষয় না। আল্লাহ তা'লার অনুগ্রহ না থাকলে এসব মাযহাব আরো অনেক আগেই দুনিয়া থেকে মুছে যেতো। কিন্তু, আল্লাহ তালা যুগে যুগে এমন মানুষ তৈরী করেছেন, যারা মাযহাবের পর্যালোচনাকে বুকে ধারণ করেছিলেন বিধায় আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে। যা চার মাযহাব ছাড়া অন্য কোন মাজহাবের বা মতবাদের ক্ষেত্রে ঘটে নাই।
আর এই চার মাযহাবের উপর আলিম-উলামার ইজমা রয়েছে । ইবনে নুজাইম আল-মিসরী (৯৭০) রাহ, বলেন –
“ চার মাযহাবের শক্ত প্রতিষ্টা , প্রচার-প্রসার ও অধিকতর অনুসারী হওয়ার কারণে এই চার মাযহাবের বিপরীত কোন কিছুর আমল না করার ব্যাপারে ইজমা রয়েছে”।
সূত্র – আল-আশবাহ ওয়ান্নাজাইর , ৯২
একজন ভাই একদিন এমন এক জিজ্ঞেস করে বসলেন, চার মাজহাবই যে হক্ব বা যে কোন একটা অনুসরণ হক্ব তার প্রমাণ কী ?
___
ভয়াবহ প্রশ্ন ! কিংকর্তব্যবিমুঢ় ছিলাম। কি বলবো, এলোপাথাড়ি ভাবনার শেষ বললাম —
প্রিয় ভাই,
দেখুন - কোন বাতিল পন্থা দীর্ঘস্থায়ী লাভ করতে পারে না। আল্লাহ তা'লা প্রত্যেক বাতিলের পরে হক্ব নিয়ে আসেন আর এই হক্ব আসার সাথে সাথেই বাতিল পরাভূত হয় !
মহান আল্লাহ তা'লা পবিত্র কোর'আনের সূরায়ে বনী ইসরাইলে বলেন -
جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ
অনুবাদ -
সত্য সমাগত ; মিথ্যা বিতাড়িত । বনী ইসরাইল ৮১
প্রিয় ভাই,
মাজহাব তো আজ থেকে বারো শত (১৩০০) বছর পূর্বে যাত্রা শুরু করেছে। প্রত্যেক যুগে যুগে আল্লাহ তা'লা বিশেষ কিছু মানুষ প্রেরণ করেছেন, যারা এই ইলমের বুঝা বহন করেছেন। ফলে, আমাদের পর্যন্ত এই মাজহাব পৌঁছেছে !
মাজহাব বাতিল হলে দীর্ঘ তেরোশত বছরের মধ্যে কোন না কোন সময় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু, আল্লাহ তা'লা তার বিশেষ অনুগ্রহে এই মাজহাবকে বুলন্দ করে রেখেছেন। যুগে যুগে মুজতাহিদ আলিম তৈরী করেছেন, যারা ইসলামের জন্য এই মাজহাবের জ্ঞান অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। যুগে যুগে মানুষ তৈরী করেছেন, যারা এই মাজহাব অনুসরণ করে গিয়েছেন।
আরো বললাম,
সম্মানীত ভাই আমার, এই মাজহাব বাতিল হলে আল্লাহ তা'লার ওয়াদানুযায়ী এতোদিনে অপর আরেকটি সত্য এসে বিলুপ্ত করে দিতো। কিন্তু, যুগ যুগ ধরে আল্লাহ তা'লা হেফাজত করে রেখেছেন। প্রতিটা যুগে বরং বাতিল এসে মাজহাবকে আক্রমণ করেছে। আল্লাহ তা'লা বাতিলকে বিতাড়িত করে মাজহাবকে স-সম্মানে উম্মাহের কাছে মর্যাদাপূর্ণ রেখেছেন।
লাকাল হামদু ইয়া আল্লাহ !
এ থেকে প্রমাণিত হয় মাজহাব কখনো বাতিল হতে পারে না, আর বাতিল কখনো উম্মাহের মাঝে এতো লম্বা সময় আহলে হক্বের কাছে স্থায়ী হতে পারে না। আমি ইনশাআল্লাহ, ছুম্মা ইনশা আল্লাহ বলতে পারি - মাজহাব হক্ব প্রতিষ্ঠিত !
সর্বশেষ ঐ ভাইকে দিলে দরদ নিয়ে আরো কিছু কথা বললাম -
চার মাযহাবের কোন ইমাম তাদের জীবদ্দশায় হয়তো জানতেনই না যে, তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা এভাবে সর্বযুগে বিশ্বব্যাপি কবুল করবেন। আল্লাহ তায়ালা ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহের উপর রহম করুন; তিনি বলেন
– ( উনার মাকুলাহ হিসেবে শ্রুত )
“দ্বীনের যে কাজ একমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য হবে, সেটা (কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের উপকারের জন্য) বাকি থাকবে; আর যেটা অন্য উদ্দেশ্যে হবে, তা কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে”।
ما کان لله يبقي، وما كان لغير الله يزول.ويدل عليه عموم قوله تعالي: {فَأَمَّا الزَّبَدُ فَيَذْهَبُ جُفَاءً ۖ وَأَمَّا مَا يَنفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ فِي الْأَرْضِ
অনুবাদ -
দ্বীনের যে কাজ একমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য হবে, সেটা (কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের উপকারের জন্য) বাকি থাকবে; আর যেটা অন্য উদ্দেশ্যে হবে, তা কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে’।
অতঃপর, দলিল হিসেবে ইমাম মালিক রাহ. কোরানে কারীমের সূরায়ে রা'দ এর একটা আয়াত পাঠ করেন,যার বঙ্গানুবাদ হলো -
“এভাবে আল্লাহ্ সত্য ও অসত্যের দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকেন। যা আবর্জনা তা ফেলে দেয়া হয় এবং যা মানুষের উপকারে আসে তা জমিতে থেকে যায়। এভাবে আল্লাহ্ উপমা দিয়ে থাকেন”। বনী ইসরাইল ৮১
চার মাযহাবের বিশ্বজনীন আবেদন এবং গ্রহণযোগ্যতা এর প্রচার প্রসার এটা আল্লাহ তায়ালার বিশেষ এক রহমত, ইনশা আল্লাহ। সাহাবাদের জীবন্ত নমুনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মুজতাহিদদের মক্ববুল এই খেদমতকে যারা ভ্রান্ত প্রমাণে মরিয়া হয়ে উঠেছেন, তাদের জন্য আক্ষেপ এবং দোয়া করা ছাড়া কিছুই করার নেই।
একনাগাড়ে এই কথাগুলো দিলে দরদ নিয়ে বলছিলাম আর প্রশ্নকারী ভাই অত্যন্ত বিনয়ের সাথে মাথা নিচু করে শুনছিলেন। আমার কথা শেষ হলে খানিকটা মাথা উঁচু করে বললেন –
আলহামদুলিল্লাহ ,
আমিও উঁচু বাক্যে বললাম – আলহামদুলিল্লাহ !
আহসানাল্লাহু ইলাইকুম !