ভ্রান্তির নিরসন: আখিরাতের নাজাত প্রাপ্ত দল কোনটি ⁉️

>>>>> আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াল জা‘মাআতই একমাত্র নাজাত প্রাপ্ত দল <<<<<

প্রায় দেড় হাজার বছর গত হয়ে গেল ইসলাম ধর্ম এ পৃথিবীতে এসেছে। এর মধ্যে অনেক বিপদাপদের মোকাবেলা করতে হয়েছে এ পবিত্র ধর্মকে। রাসূল (ﷺ)‘র সুশোভিত এ উদ্যানের উপর দিয়ে অনেক প্রলয়ঙ্করী ঝড়-তুফান বয়ে গেছে। কিন্তু খোদার লাখো শুকরিয়া যে, এ বাগান পূর্ববৎ সজীব ও প্রাণবন্ত রয়েছে। এ ধর্ম কখনো কুখ্যাত ইয়াযিদের শাসনামলে মেঘাচ্ছন্ন হয়েছে, কখনও হাজ্জাজের আমলের নির্যাতনে ধূলিধূসরিত হয়েছে, কখনো খলিফা মামুনের আমলে বাতিল পন্থীদের আক্রমণের শিকার হয়েছে, আবার কখনও তাতারীরা বীর-বিক্রমে এর উপর প্রচন্ড আঘাত হেনেছে, আবার কখনও খারেজিদের সাথেও মোকাবেলা করতে হয়েছে। রাফেজিরাও একে সমূলে ধ্বংসের নীল নকশা তৈরী করেছিল। বর্তমান শতাব্দীতে আহলে হাদিস ও নব্য সালাফি ফিতনাও ইসলামকে বিনাশ সাধনের জন্য ইসলামকে কেচি দ্বারা থ্রি কোয়ার্টার প্যান্টের মত ছোট করতে শুরু করেছে। কিন্তু ইসলাম এমন এক স্থির পাহাড়, যার সম্মুখে কোন শক্তিই টিকে থাকতে পারেনি। এটা যেমন ছিল তেমনই মজবুত রয়েছে। আর যতগুলো বাতিল দলই উদ্ভাবিত হোক না কেন সকল বাতিল মতবাদের মুখোশ উন্মোচনে তার থেকে একটি হকপন্থি সত্যান্বেষী দল কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে, যারা রাসূল (ﷺ) এবং তাঁর সাহাবিগণ এবং সলফে সালেহিনের আক্বিদা, আমল, মত এবং পথের উপর প্রতিষ্ঠিত। সে দলের নাম হলো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত।

পবিত্র কুরআনে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত

আল্লাহ তা‘য়ালা পবিত্র কোরআনের সূরা আলে-ইমরানের ১০৬ নং আয়াতে বলেছেন-

يَوْمَ تَبْيَضُّ وُجُوهٌ وَتَسْوَدُّ وُجُوهٌ فَأَمَّا الَّذِينَ اسْوَدَّتْ وُجُوهُهُمْ أَكَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنْتُمْ تَكْفُرُونَ

-‘‘সেদিন (কিয়ামতের দিন) কোন কোন মুখ উজ্জ্বল হবে, আর কোন কোন মুখ হবে কালো। বস্তুত যাদের মুখ কালো হবে, তাদরেকে বলা হবে তোমরা কি ঈমান আনার পর কাফির হয়ে গিয়েছিলে? এবার সে কুফুুরির বিনিময়ে আযাবের স্বাদ আস্বাদন করো।’’

এখন আমরা দেখবো হাশরের ময়দানে কাদের মুখ কালো হবে আর কাদের মুখ হবে উজ্জ্বল।

১. সকল দেওবন্দী ও আহলে হাদিসদের মান্যবড় আল্লামা ইবনে কাসির (رحمة الله) পবিত্র কোরআনের এ আয়াতের ব্যাখ্যায় সাহাবি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه)‘র উক্তি বর্ণনা করেছেন-

وَتَبْيَضُّ وُجُوهُ أَهْلِ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ

-‘‘কিয়ামতের দিন যাদের মুখ উজ্জল হবে তারা হল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসারী।’’

➤ইবনে কাসির, তাফসীরে ইবনে কাসীর, ২/৭৯পৃষ্ঠা, দারুল কুতুব ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন, প্রকাশ- ১৪১৯হিজরি। 

বুঝা গেল সাহাবিদের যুগ থেকেই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আলোচনা ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে এবং যে দলের সফলতার ইঙ্গিত বহন করে মহান আল্লাহর বাণী পবিত্র কোরআন।

২. ইমাম ইবনে আবি হাতেম (ওফাত.৩২৭হি.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় সনদ সহ একটি হাদিস সংকলন করেন এভাবে-

عَنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ فِي قَوْلِهِ: يَوْمَ تَبْيَضُّ وُجُوهٌ وَتَسْوَدُّ وُجُوهٌ قَالَ: تَبْيَضُّ وُجُوهُ أَهْلِ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ.

-‘‘হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (رضي الله عنه) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه) হতে বর্ণনা করেন...কিয়ামতের দিন যাদের মুখ উজ্জ্বল হবে তারাই হলো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত।’’  

➤ইমাম আবি হাতেম, আত্-তাফসীর, ৩/৭২৯পৃষ্ঠা, হাদিস, ৩৯৫০, ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী, তাফসীরে আদ্-দুররুল মানসূর, ২/২৯১পৃষ্ঠা, দারুল ফিকর ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন।

৩. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতী (ওফাত.৯১১হি.) বলেন-

وَأخرج ابْن أبي حَاتِم وَأَبُو نصر فِي الْإِبَانَة والخطيب فِي تَارِيخه واللالكائي فِي السّنة عَن ابْن عَبَّاس فِي هَذِه الْآيَة قَالَ {تبيض وُجُوه وَتسود وُجُوه} قَالَ تبيض وُجُوه أهل السّنة وَالْجَمَاعَة وَتسود وُجُوه أهل الْبدع والضلالة

-‘‘ইমাম আবু হাতেম তার তাফসীরে, আবু নছর তার ইবানাত গ্রন্থে, খতিবে বাগদাদী তাঁর তারিখে বাগদাদে, ইমাম লালকায়ী তাঁর সুন্নাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, কিয়ামতের দিন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মুখ উজ্জ্বল হবে এবং আহলে বিদআতি বা দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মুখ কালো হবে।’’  

➤ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী, তাফসীরে আদ্-দুররুল মানসূর, ২/২৯১পৃষ্ঠা, দারুল ফিকর ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন।

৪. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (ওফাত.৯১১হি.) আরও বর্ণনা করেন-

وَأخرج الْخَطِيب فِي رُوَاة مَالك والديلمي عَن ابْن عمر عَن النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم فِي قَوْله تَعَالَى {يَوْم تبيض وُجُوه وَتسود وُجُوه} قَالَ: تبيض وُجُوه أهل السّنة وَتسود وُجُوه أهل الْبدع

-‘‘ইমাম খতিবে বাগদাদি তাঁর তারিখে বাগদাদে, ইমাম মালেক, ইমাম দায়লামী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (رضي الله عنه) হতে এ আয়াতের ব্যাখ্যা স্বরূপ বর্ণনা করেন যে, কিয়ামতের দিন যাদের মুখ উজ্জ্বল হবে তারাই হলো আহলে সুন্নাহ (জামাত)। আর আহলে বিদআতী বা দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মুখ কালো হবে।’’  

➤ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী, তাফসীরে দুররুল মানসূর, ২/২৯১পৃষ্ঠা, দারুল ফিকর ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন, তাহের পাটনী, তাযকিরাতুল মাওদ্বুআত, ১/৮৪পৃষ্ঠা।

৫. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতি (ওফাত.৯১১হি.) আরও বর্ণনা করেন-

وَأخرج أَبُو نصر السجْزِي فِي الْإِبَانَة عَن أبي سعيد الْخُدْرِيّ أَن رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم قَرَأَ {يَوْم تبيض وُجُوه وَتسود وُجُوه} قَالَ: تبيض وُجُوه أهل الْجَمَاعَات وَالسّنة وَتسود وُجُوه أهل الْبدع والأهواء

-‘‘ ইমাম আবু নছর আল-সায্যি তার আল-ইবানাত গ্রন্থে, হযরত আবু সাঈদ খুদরী (رضي الله عنه) হতে এ আয়াতের ব্যাখ্যাস্বরূপ বর্ণনা করেন যে, কিয়ামতের দিন যাদের মুখ উজ্জল হবে তারাই হলো আহলে জামাত অর্থাৎ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাত, আর আহলে বিদআতী বা ও দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এবং যাদের মধ্যে প্রবৃত্তিপূজা থাকবে তাদের মুখ কালো হবে।’’

➤ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী, তাফসীরে দুররুল মানসূর, ২/২৯১পৃষ্ঠা, দারুল ফিকর ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন, ইমাম আবি হাতেম, আত্-তাফসীর, ৩/৭২৯পৃষ্ঠা।

৬. আহলে হাদিসদের ইমাম শাওকানী এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেন-

وَأَخْرَجَ ابْنُ أَبِي حَاتِمٍ، وَالْخَطِيبُ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ فِي قَوْلِهِ: يَوْمَ تَبْيَضُّ وُجُوهٌ قَالَ: تَبْيَضُّ وُجُوهُ أَهْلِ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ، وَتَسْوَدُّ وُجُوهُ أَهْلِ الْبِدَعِ وَالضَّلَالَةِ.

-‘‘ কিয়ামতের দিন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মুখ উজ্জ্বল হবে এবং বিদআতী ও দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মুখ কালো হবে (যাদেরকে আহলুল বিদআত ওয়াল ফুরকা বলা হয়)।’’  

➤শাওকানী, ফতহুল ক্বদীর, ১/৪২৫পৃষ্ঠা, দারু ইবনে কাসির, দামেস্ক, বয়রুত, প্রকাশ-১৪১৪হিজরি।

৭. ইমাম দায়লামী (رحمة الله) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (رضي الله عنه) বর্ণনা করেন-

{يَوْم تبيض وُجُوه وَتسود وُجُوه} تبيض وُجُوه أهل السّنة وَتسود وُجُوه أهل الْبدع

-‘‘এ আয়াতের ব্যাখ্যাস্বরূপ বর্ণনা করেন যে, কিয়ামতের দিন যাঁদের মুখ উজ্জ্বল হবে তারাই হলো আহলে সুন্নাহ (জামাত)। আর আহলে বিদআতি বা দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মুখ কালো হবে।’’  

➤ইমাম দায়লামী, আল-ফিরদাউস, ৫/৫২৯পৃষ্ঠা, হাদিস, ৮৯৮৬

৮. আহলে হাদিসদের ইমাম ইবনে তাইমিয়া এ আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেন-

قال ابن عباس رضي الله عنهما: تبيض وجوه أهل السنة والجماعة وتسود وجوه أهل البدعة والفرقة.

-‘‘হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, কিয়ামতের দিন যাদের মুখ উজ্জ্বল হবে তারাই হল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত এবং বিদআতী ও দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মুখ কালো হবে (তাদেরকে আহলুল বিদআত ওয়াল ফুরকা বলা হয়)।’’

➤ইবনে তাইমিয়া, মুস্তাদরাক আ‘লা মাজমাউল ফাত্ওয়া, ২/২৫২পৃষ্ঠা, (শামিলা)

হাদিসের আলোকে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের প্রমাণ

প্রথম হাদিসঃ

হযরত ইবনে আমর (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেন-‘‘আমার উম্মতের মধ্যে সে সমস্ত জিনিসের আবির্ভাব ঘটবে, যা বনী ইসরালের মধ্যে ছিল। দু‘টি জুতার একটি অপরটির সাথে যেমন মিল থাকে। এমনকি বনী ইসরাঈলের কেউ যদি প্রকাশ্যে মায়ের সাথে যিনা করে, তবে আমার উম্মতের মধ্যেও এমন লোকের আবির্ভাব হবে, যে তা করবে। নিশ্চয় বনী ইসরাঈল বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছে এবং আমার উম্মত তিয়াত্তার দলে বিভক্ত হবে। তাদের সকলেই জাহান্নামে যাবে তবে একটি দল ব্যতীত। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, তারা কারা? রাসূল (ﷺ) উত্তর দিলেন, قَالَ مَا أَنَا عَلَيْهِ وأصحابي -‘‘আমি এবং আমার সাহাবার আদর্শের ওপর যারা প্রতিষ্ঠিত থাকবে।’’  

➤খতিব তিবরিযি, মিশকাতুল মাসাবিহ, ১/৬১পৃষ্ঠা, কিতাবুল ই‘তিসাম বিস্-সুন্নাহ, হাদিস নং ১৬১, তিরমিযি, আস্-সুনান, ৫/২৬পৃষ্ঠা, হাদিস, ২৬৪১, আহলে হাদিস আলবানী সুনানে তিরমিযির তাহক্বীকে হাদিসটি ‘হাসান’ বলেছেন, তাবরানী, মু‘জামুল কাবীর, ১৩/৩০পৃষ্ঠা, হাদিস, ৬২, ১৪/৫২পৃষ্ঠা, হাদিস, ১৪৬৪৬, মাকতুবাতু ইবনে তাইমিয়া, কাহেরা, মিশর, প্রকাশ-১৪১৫হিজরি। বায়হাকি, ই‘তিক্বাদ, ১/২৩৩পৃষ্ঠা, বাগভী, শরহে সুন্নাহ, ১/২১৩পৃষ্ঠা, হাদিস, ১০৪

প্রথম এ হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসদের অভিমতঃ

আমরা এখন দেখবো যে উপরের হাদিসের ব্যাখ্যায় বিজ্ঞ মুহাদ্দিস, মুফাসসির, ফকিহগণ কোন দলের কথা বলেছেন।

১.এ হাদিসের ব্যাখ্যায় আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী (رحمة الله) বলেন-

فَلَا شَكَّ وَلَا رَيْبَ أَنَّهُمْ هُمْ أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ

-‘‘এতে কোন সন্দেহ নেই যে, নাজাতপ্রাপ্ত দলটিই হলো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত।’’  

➤মোল্লা আলী ক্বারী, মেরকাত, ১/ ২৫৯পৃষ্ঠা, দারুল ফিকর ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন, প্রথম প্রকাশ- ১৪২২হিজরি।।

২. আল্লামা ইমাম ইরাকী (رحمة الله) বলেন-

أهل السّنة وَالْجَمَاعَة -‘‘এটাই হলো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জা‘আমাত।’’  

➤ইমাম ইরাকী, তাখরীজে ইহইয়াঊল ঊলূম, ১/ ১১৩৩পৃষ্ঠা, দারুল ইবনে হাযম, বয়রুত, লেবানন, প্রথম প্রকাশ- ১৪২২হিজরি।।

৩. বিখ্যাত তাফসিরকারক আল্লামা ইসমাঈল হাক্কি (رحمة الله) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন- وفرقة ناجية وهم اهل السنة والجماعة -‘‘নাজাতপ্রাপ্ত দলই হলো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত।’’  

➤ ইসমাঈল হাক্কী, তাফসীরে রূহুল বায়ান, ১/১৩পৃষ্ঠা, সুরা ফাতেহার ব্যাখ্যা, দারুল ফিকর ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন।

৪. আহলে হাদিসদের মুহাদ্দিস মোবারকপুরী এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন-

ولا شك أنهم أهل السنة والجماعة. -‘‘এতে কোন সন্দেহ নেই নাজাত প্রাপ্ত দলটিই হলো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাত।’’  

➤মোবারকপুরী, মের‘আতুল মাফাতিহ, ১/ ২৭৫পৃষ্ঠা।

দ্বিতীয় হাদিসঃ 

এ বিষয়ে উপরের হাদিসের ন্যায় সাহাবি হযরত মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান (رحمة الله) হতে আরেকটি সূত্র বর্ণিত এভাবে আছে যে, রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেন ‘‘তোমাদের পূর্বে আহলে কিতাব (ইহুদি ও খ্রিষ্টান) বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছে। আর আমার উম্মত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে।

كُلُّهَا فِي النَّارِ إِلَّا وَاحِدَةً، وَهِيَ الْجَمَاعَةُ

‘বাহাত্তর দল জাহান্নামে যাবে এবং একটি দল জান্নাতে যাবে। আর তারা হল জামাত অথার্ৎ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত।’ আর আমার উম্মতের মাঝে এমন একদল লোকের আবির্ভাব হবে, যাদের মধ্যে প্রবৃত্তিপূজা এমনভাবে প্রবেশ করবে, যেমন জলাতঙ্ক রোগ, এ রোগ আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতিটি শিরা-উপশিরায় প্রবেশ করে।’’ ➤ খতিব তিবরিযি, মিশকাতুল মাসাবিহ, ১/৬১পৃষ্ঠা, কিতাবুল ই‘তিসাম বিস্-সুন্নাহ, হাদিস নং ১৬২, মুসনাদে আহমদ,আবু দাউদ, আস্-সুনান, ৪/১৯৮পৃষ্ঠা, কিতাবুস্-সুন্নাহ, হাদিস, ৪৫৯৭, আহলে হাদিস আলবানী সুনানে আবি দাউদের তাহক্বীকে হাদিসটি ‘হাসান’ বলেছে কিন্তু পাগলের মত আবার মিশকাতে সহিহ বলেছে।

এই দ্বিতীয় হাদিসের বিষয়ে বিজ্ঞ উলামাদের ব্যাখ্যাঃ

১.আল্লামা শায়খ মাতুলী শা‘রাভী {ওফাত.১৪১৮হি.}এ হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেন-

والجماعة: هم أهل السنة والجماعة

-‘‘এখানে জামাত বলতে রাসূল (ﷺ) আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতকে বুঝিয়েছেন।’’  

➤শায়খ শারাভী, তাফসীরে শারাভী, ৭/৪০০২পৃষ্ঠা,।  

২-৩. এ হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম আব্দুর রউফ মানাভী (رحمة الله) বলেন-

والجماعة أي أهل السنة والجماعة-

‘‘এখানে জামাত বলতে রাসূল (ﷺ) আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতকে বুঝিয়েছেন।’’

➤ মানাভী, ফয়যুল কাদীর, ২/২০পৃষ্ঠা, হাদিসঃ ১২২৩, মাকতুবাতুল তাযারিয়াতুল কোবরা, মিশর, প্রকাশ- ১৩৫৬হিজরি।।   

এ হাদিসের ব্যাখ্যায় তিনি আরও বলেন-

الفرقة الناجية هي أهل السنة والجماعة

-‘‘নাজাত প্রাপ্ত দলই হলো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত।’’  

➤ মানাভী, ফয়যুল কাদীর, ২/২০পৃষ্ঠা, হাদিসঃ ১২২৩, মাকতুবাতুল তাযারিয়াতুল কোবরা, মিশর, প্রকাশ-১৩৫৬হিজরি।।  

৪. আহলে হাদিস সম্প্রদায়ের আলেম আযিমাবাদী (ওফাত.১৩২৯হি.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন-

 هُمْ أهل السنة والجماعة وهي الفرقة الناجية

-‘‘এটা দ্বারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতকে বুঝানো হয়েছে, যা একমাত্র নাজাত প্রাপ্ত দল।’’  

➤ আযিমাবাদী, শরহে সুনানে আবি দাউদ, ১২/২২৩পৃষ্ঠা,দারুল কুতুব ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন, প্রকাশ- ১৪১৫ হিজরি।।

৫. আহলে হাদিস মোবারকপুরী (ওফাত.১৩৫৩হি.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন-

هُمْ أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ وَهِيَ الْفِرْقَةُ النَّاجِيَةُ -‘‘এটা দ্বারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতকে বুঝানো হয়েছে, যা একমাত্র নাজাত প্রাপ্ত দল।’’  

➤ মোবারকপুরী, তুহফাতুল আহওয়াযি, ৭/৩৩২পৃষ্ঠা, ও মের‘আতুল মাফাতিহ, ১/২৭১পৃষ্ঠা, ও ১/২৭৮পৃষ্ঠা, দারুল কুতুব ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন।

তৃতীয় হাদিসঃ 

এ ছাড়া এ বিষয়ে উপরের হাদিসের অনুরূপ সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (رضي الله عنه) হতে আরেকটি সূত্র পাওয়া যায়।

➤ ইমাম আবু নুয়াইম ইস্পাহানী, হুলিয়াতুল আউলিয়া, ৯/১৩৮পৃষ্ঠা, দারু ইহইয়াউত্-তুরাসুল আরাবী, বয়রুত, লেবানন।  

চতুর্থ হাদিসঃ

ইমাম আবু লাইস সমরকন্দী {ওফাত.৩৭৩হি.} এ হাদিসটি কিছুটা মতন পরিবর্তন করে সংকলন করেন এভাবে-

قالوا: يا رسول الله ما هذه الواحدة؟ قال: أهْلَ السُّنَّةِ وَالجَمَاعَةِ الَّذِي أنا عَلَيْهِ، وأصْحَابِي

-‘‘সাহাবায়ে কেরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! নাজাতপ্রাপ্ত একমাত্র দল কোনটি? তিনি বললেন, তারা হলো আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াল জা’মাত যারা আমার এবং সাহাবিদের আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত।’’

➤ ইমাম আবু লাইস সমরকন্দী, তাফসীরে বাহারুল উলূম, ১/৪৫৬পৃষ্ঠা, দারু ইহইয়াউত্-তুরাসুল আরাবী, বয়রুত, লেবানন।

উপরের হাদিসে প্রমাণিত হলো যে রাসূল (ﷺ)‘র মুখেই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের নাম উচ্চারিত হয়েছে বা প্রচলন ছিল। তার আরেকটি প্রমাণ পাওয়া যায় সাহাবিদের যুগেই এ সঠিক দলের নামের প্রচলন ছিল। যেমন আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (رحمة الله) বর্ণনা করেন-

سُئِلَ أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ عَنْ عَلَامَاتِ أَهْلِ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ؟ فَقَالَ: أَنْ تُحِبَّ الشَّيْخَيْنِ، وَلَا تَطْعَنَ الْخَتَنَيْنِ، وَتَمْسَحَ عَلَى الْخُفَّيْنِ.

-‘‘হযরত আনাস বিন মালেক (رضي الله عنه) কে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আলামত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি বলেছেন- শায়খাইন অর্থাৎ হযরত আবু বকর ও উমর (رضي الله عنه) কে মুহাব্বত করা। এবং হযরত আলী য ও হযরত উসমান (رضي الله عنه)‘র সমালোচনা না করা এবং চামড়ার মৌজাদ্বয়ের উপরে মাসেহ করা। (মোল্লা আলী ক্বারী, মিরকাত, ২/৪৭২পৃ.) এ রকম বর্ণনা হযরত ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه) এর পাওয়া যায় (তথ্য সূত্রঃ মোল্লা জিওন, তাফসীরে আহমদিয়্যাহ তে সুরা আনআমের ১৫৩ নং আয়াতের ব্যাখ্যায়।) এ ছাড়া আমরা সুরা আলে ইমরানের ১০৬ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় আমরা বিস্তারিত আলোকপাত করেছি।

এ সমস্ত হাদিসে সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত দলের পরিচয় দেওয়া হয়েছে, যারা রাসূল (ﷺ) এবং সাহাবায়ে কেরামের আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। আর রাসূল (ﷺ) এবং সাহাবিদের আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত একমাত্র দল হলো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত। এ বিষয়ে আরও অনেক হাদিসে পাক জানতে আপনারা আমার লিখিত ‘প্রমাণিত হাদিসকে জাল বানানোর স্বরূপ উন্মোচন’ দ্বিতীয় খন্ড দেখুন।

এ ছাড়া যত সম্প্রদায় তথা রাফেযী, খারেজী, মুরজিয়া, ক্বাদারীয়া, জাহমিয়া, হারুরিয়া, শিয়া, আহলে হাদিস-সালাফি সকলেই ভ্রান্ত এবং পথভ্রষ্ট।

পঞ্চম হাদিসঃ 

হযরত মুয়াবিয়া বিন কুররাতা (رضي الله عنه) তিনি তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেন-

لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي مَنْصُورِينَ، لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ

-‘‘আমার উম্মতের মাঝে একদল কিয়ামত পর্যন্ত (শত্রু পক্ষের উপর) সর্বদা সাহায্যপ্রাপ্ত থাকবে। যে তাদেরকে লাঞ্ছিত করতে চায়, সে তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।’’  

➤ ইমাম ইবনে মাযাহ, আস্-সুনান, ১/৪পৃষ্ঠা, হাদিসঃ ৬, আবু নুয়াইম ইস্পাহানী, হুলিয়াতুল আউলিয়া, ৯/৩০৭পৃষ্ঠা, সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিসঃ ৬৮৩৫, মুসনাদে আহমদ, হাদিসঃ ৮২৭৪

পঞ্চম হাদিসের ব্যাখ্যায় বিজ্ঞ উলামাদের ব্যাখ্যা

১.এ হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম কাযি আয়াজ মালেকী (رحمة الله) এবং ইমাম নববী (رحمة الله) বলেন-

قَالَ الْقَاضِي عِيَاضٌ إِنَّمَا أَرَادَ أَحْمَدُ أَهْلَ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ وَمَنْ يَعْتَقِدُ مَذْهَبَ أَهْلِ الْحَدِيثِ

-‘‘ইমাম কাযি আয়ায (رحمة الله) বলেন, নিশ্চয় ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (رحمة الله) এ হাদিস থেকে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতকে উদ্দেশ্য বা ইচ্ছা পোষণ করেছেন যারা হাদিস বিশারদগণের আক্বিদার উপর রয়েছেন।’’ ➤ ইমাম নাওয়াবী, শরহে মুসলিম, ১৩/৬৭পৃষ্ঠা, দারু ইহ্ইয়াউত-তুরাসুল আরাবী, বয়রুত, লেবানন, প্রকাশ- ১৩৯২হিজরি।

২. আল্লামা ইমাম বদরুদ্দীন আইনী (رحمة الله) এর ব্যাখ্যায় লিখেন-

وَقَالَ الإِمَام أَحْمد: إِن لم يَكُونُوا أهل الحَدِيث فَلَا أَدْرِي من هم. وَقَالَ القَاضِي عِيَاض: إِنَّمَا أَرَادَ الإِمَام أَحْمد أهل السّنة وَالْجَمَاعَة.

-‘‘ইমাম আহমদ (رحمة الله) বলেন, যদি (সে দলের লোকেরা ) তারা হাদিস বিশারদগণ না হয় তাহলে তাদের সম্পর্কে আমি জানি না। ইমাম কাযি আয়ায (رحمة الله) বলেন, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (رحمة الله) (এ হাদিসে পাকের ব্যাখ্যায়) (এখানে তায়েফা বা একটি দল বলতে) আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতকেই উদ্দেশ্য বা ইচ্ছা পোষণ করেছেন।’’

➤ ইমাম বদরুদ্দীন আইনী, শরহে বুখারী, ২/৫২পৃষ্ঠা, এবং ১৬/১৬৪পৃষ্ঠা, দারু ইহ্ইয়াউত - তুরাসুল আরাবী, বয়রুত, লেবানন।

৩. এ হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (ওফাত.৯১১হি.) বলেন-

قَالَ أَحْمد بن حَنْبَل فِي هَذِه الطَّائِفَة إِن لم يَكُونُوا هم أهل الحَدِيث فَلَا أَدْرِي من هم أخرجه الْحَاكِم فِي عُلُوم الحَدِيث قَالَ القَاضِي عِيَاض وَإِنَّمَا أَرَادَ أهل السّنة وَالْجَمَاعَة وَمن يعْتَقد مَذْهَب أهل الحَدِيث

-‘‘ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (رحمة الله) ঐ দল সম্পর্কে বলেন যদি তারা হাদিস বিশারদগণ না হন তাহলে আমি তাদেরকে চিনি না। ইমাম হাকেম নিশাপুরী (رحمة الله) তাঁর ‘উলূমুল হাদিস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ইমাম কাযি আয়ায (رحمة الله) বলেছেন, (ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল) যারা হাদিস বিশারদগণের আক্বিদার উপরে তিনি তাদেরকেই আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত বলে বুঝিয়েছেন।’’  

➤ ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী, শরহে সুনানে ইবনে মাযাহ, ১/২পৃষ্ঠা, (শামিলা)

৪. আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (رحمة الله) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন- فَالْمُرَادُ بِهِمْ أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ.-

-‘‘এখানে তায়েফা বা একদল দ্বারা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে।’’  

➤ ইমাম মোল্লা আলী ক্বারী, মেরকাত, ৯/৪০৫২পৃষ্ঠা, হাদিস নং ৬২৯২, দারুল কুতুব ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন, প্রকাশ-১৪০৫ হিজরি।

৫. আহলে হাদিস আযিমাবাদী (ওফাত.১৩২৯হি.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন-

وقال أحمد بن حنبل إن لم يكونوا أهل الحديث فلا أدري من هم -قال القاضي عياض إنما أراد أحمد أهل السنة والجماعة ومن يعتقد مذهب أهل الحديث

-‘‘ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (رحمة الله) ঐ দল সম্পর্কে বলেন যদি তারা হাদিস বিশারদগণ না হন তাহলে আমি তাদেরকে চিনি না। ইমাম কাযি আয়ায (رحمة الله) বলেছেন, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (رحمة الله) এখানে যারা হাদিস বিশারদগণের আক্বিদার উপরে রয়েছেন তথা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতকেই ইচ্ছা পোষণ বা উদ্দেশ্য করেছেন।’’  

➤আযিমাবাদী, শরহে সুনানে আবি দাউদ, ৭/১১৭পৃষ্ঠা, দারুল কুতুব ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন, প্রকাশ- ১৪১৫ হিজরি।

৬. আহলে হাদিস মোবারকপুরী (ওফাত.১৩৫৩হি.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন-

وَقَالَ الْحَافِظُ فِي الْفَتْحِ وأخرج الحاكم فِي عُلُومِ الْحَدِيثِ بِسَنَدٍ صَحِيحٍ عَنْ أَحْمَدَ إِنْ لَمْ يَكُونُوا أَهْلَ الْحَدِيثِ فَلَا أَدْرِي مَنْ هُمْ وَمِنْ طَرِيقِ يَزِيدَ بْنِ هَارُونَ مِثْلُهُ انْتَهَى قَالَ الْقَاضِي عِيَاضٌ إِنَّمَا أَرَادَ أَحْمَدُ أَهْلَ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ وَمَنْ يَعْتَقِدُ مَذْهَبَ أَهْلِ الْحَدِيثِ

-‘‘ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (رحمة الله) তাঁর ‘ফতহুল বারী’ গ্রন্থে এবং ইমাম হাকেম নিশাপুরী (رحمة الله) তার ‘উলূমুল হাদিস’ গ্রন্থে সহিহ সনদে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (رحمة الله) থেকে বর্ণনা করেন ঐ দল সম্পর্কে বলেন যদি তারা হাদিস বিশারদগণ না হন তাহলে আমি তাদেরকে চিনি না। বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ইয়াযিদ ইবনে হারুন (رحمة الله) ও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। ইমাম কাযি আয়ায (رحمة الله) বলেছেন, (ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল) যারা হাদিস বিশারদগণের আক্বিদার উপরে রয়েছেন তিনি তাদেরকেই তথা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত বলে উদ্ধেশ্য বা ইচ্ছা পোষণ করেছেন।’’

➤ মোবারকপুরী, তুহফাতুল আহওয়াযি, ৬/৩৬০পৃষ্ঠা,দারুল কুতুব ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন।

আল্লামা ইবনে কাসির দামেস্কী (رحمة الله) ও এ মত পেশ করেছেন যে, তায়েফা বা সে দলটি হলো আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত।

➤ ইবনে কাসির, বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৬/৭৩পৃষ্ঠা,দারুল ফিকর ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন, প্রকাশ- ১৪০৭হিজরি।।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আদর্শঃ

আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াল জামাতের পরিচয় সম্পর্কে আল্লামা মায়দানী (رحمة الله) লিখেছেন-

أَهْلِ السُّنَّةِ السيرة والطريقة المحمدية و أَهْلِ الْجَمَاعَةِ من الصحابة والتابعين ومن بعدهم من المتبعين للنبي صلى الله عليه وسلم

-‘‘আহলুস সুন্নাহ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, রাসূল (ﷺ)‘র সীরাত এবং তাঁর তরিকার ওপর যারা প্রতিষ্ঠিত এবং আহলুল জামা‘আত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যারা রাসূল (ﷺ)‘র অনুসারী সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন এবং তাবে-তাবেয়ীগণের আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত।’’(শরহে আক্বিদাতুত তাহাবী, পৃ.৪৪)

সদরুশ শরিয়া আল্লামা উবায়দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (رضي الله عنه) লিখেন-

أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ هُمُ الذين والطريقهم طريقة الرسول وَأَصْحَابِهِ دون أَهْلِ الْبِدَعِ

-‘‘যাঁদের তরিকা হলো, রাসূল (ﷺ) এবং সাহাবাবিদের তরিকা, তারাই হলো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত এবং তারা কোন বিদআতী সম্প্রদায় নয়।  

➤ আল্লামা উবায়দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আত-তাওযীহ, ৩/৩৮পৃষ্ঠা

আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াল জামাতের পরিচয় সম্পর্কে আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (رحمة الله) বলেন-

أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ، وَهُمُ الَّذِينَ طَرِيقَتُهُمْ كَطَرِيقَةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ–وَأَصْحَابِهِ – رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ -، دُونَ أَهْلِ الْبِدَعِ

-‘‘ যাদের তরিকা হলো, রাসূল (ﷺ) এবং সাহাবাবিগণের তরিকা, তারাই হলো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত এবং তারা কোন বিদআতী সম্প্রদায় নয়।’’

➤ ইমাম মোল্লা আলী ক্বারী, মেরকাত, ৯/৪০৪৪পৃষ্ঠা, দারুল ফিকর ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন, প্রথম প্রকাশ- ১৪২২হি।

আহলে হাদিসদের ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন-

والبدعة مقرونة بالْجَمَاعَةِ فيقال: أَهْلِ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ كما يقال اهل البدعة والفرقة

-‘‘বিদআত শব্দটি ফিরকা’ (বিচ্ছিন্নতাবাদ)‘র সাথে সম্পর্কিত এবং সুন্নাত শব্দটি জামাত (বৃহত্তম) দলের সাথে সম্পর্কিত। যেমন বলা হয়ে থাকে, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাত এবং বলা হয়, আহলুল বিদআত ওয়াল ফিরকা।’’ (আল-ইস্তিমাতু, ১/৪২পৃ.)

ইমাম তিরমিযি (رحمة الله) এক সঠিক মতটিকে উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেন-

وَهَكَذَا قَوْلُ أَهْلِ العِلْمِ مِنْ أَهْلِ السُّنَّةِ وَالجَمَاعَةِ

-‘‘আর এটিই আহলে ইলম তথা আহলু সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আক্বিদা।’’

➤ তিরমিযি, আস্-সুনান, ৩/৪১পৃষ্ঠা, হাদিসঃ ৬৬২।

ইমাম জুরকানী (رحمة الله) একটি বিষয়কে হক প্রমাণে এবং বাতিলদের খন্ডনে বলতে গিয়ে লিখেন-

 قَالَ أَهْلُ الْعِلْمِ مِنْ أَهْلِ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ -

‘‘আর এটিই আহলে ইলম ( যারা ইলমে হাদিস ও ফিকহের অধিকারী) তথা আহলু সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আক্বিদা।’’  

➤জুরকানী, শরহে মুয়াত্তা, ৪/৬৬৩পৃষ্ঠা, আযিমাবাদী, শরহে সুনানে আবি দাউদ, ১৩/১৩পৃষ্ঠা,দারুল কুতুব ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন, প্রকাশ-১৪১৫ হিজরি।। 

আহলে হাদিসদের ইমাম শাওকানী এক পর্যায়ে আহলু সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতকে হক এভাবে লিখেন-

لِأَنَّ الْمَسْحَ ثَبَتَ بِالتَّوَاتُرِ وَاتَّفَقَ عَلَيْهِ أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ

-‘‘নিশ্চয় (জুতার উপর মোজা) মাসেহ করা মুতাওয়াতির পর্যায়ের হাদিস দ্বারা প্রমাণিত এবং আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন।’’  

➤ শাওকানী, নায়লুল আউতার, ১/২৩১পৃষ্ঠা, দারুল হাদিস, মিশর, প্রকাশ-১৪১৩হিজরি। 

আহলে হাদিস মোবারকপুরী (ওফাত.১৩৫৩হি.) আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত সম্পর্কে তার কিতাবের এক স্থানে লিখেন-

الشيخ الجيلاني في الغنية: وأما الفرقة الناجية فهي أهل السنة والجماعة.

-‘‘বড় পীর হযরত শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (رحمة الله) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘গুনিয়াতুত-ত্বালেবীন’ এ লিখেন, আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতই হলো একমাত্র নাযাতপ্রাপ্ত দল।’’  

➤ মোবারকপুরী, তুহফাতুল আহওয়াযি, ৭/৩৩২পৃষ্ঠা,ও মের‘আতুল মাফাতিহ, ১/২৭১পৃষ্ঠা,দারুল কুতুব ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন।

 

ইমাম খতিবে বাগদাদী (رحمة الله) একজন রাবির গ্রহণযোগ্যতা ও সে সঠিক আক্বিদায় বিশ্বাসী ছিল বলতে গিয়ে লিখেন-

وكان شيخا صالحا صدوقا من أهل السنة، معروفا بالخير،

-‘‘তিনি হাদিসের শায়খ ছিলেন, সৎ, সত্যবাদী, আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আক্বিদায় বিশ্বাসী ছিলেন, পরিচিত ভালো ব্যক্তি ছিলেন।’’

➤ খতিবে বাগদাদ, তারীখে বাগদাদ, ৪/২২পৃষ্ঠা, ক্রমিক:১২৩৩, দারুল গুরুবুল ইসলামি, বয়রুত, লেবানন।

(সংগ্রহীত)

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.