ফরজ সালাতের পর সম্মিলিত দোয়া করা কি বিদআত নাকি মুস্তাহাব?

বিষয় : ফরজ নামাজের পর সম্মিলিত দুআ এবং দুআ শেষে উভয় হাত দ্বারা চেহারা মোছা।
প্রশ্ন:  আসসালামু আলাইকুম হুজুর,
মোনাজাতের পরে চেহারায় হাত মোছা কতটুকু শরিয়ত সম্মত? দলিল সহ জানালে উপকৃত হতাম।
ফরজ নামাজের পর সম্মিলিত মোনাজাতের কোনো হাদিস আছে কি না।?থাকলে কোথায় আছে?
প্রশ্নকারী আব্দুল কাদির 
                                                         حامدا ومصليا

উত্তর: ১. মোনাজাত শেষে চেহারায় হাত মোছা হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।হজরত উমার ইবনুল খাত্তাব রাজি. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআ করার সময় যখন তার উভয় হাত উঠাতেন,তখন তিনি (দুআ শেষে)উভয় হাত দিয়ে তার মুখমণ্ডল না মোছা পর্যন্ত উভয় হাত নামাতেন না। 
—সুনানে তিরমিজি, হাদিস ৩৩৮৬, মুসনাদুল বাজ্জার, হাদিস  ১১২৯, মুসতাদরাকে হাকেম,হাদিস ১৯৬৭
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাজি.এর সূত্রে এক হাদিসের শেষাংশে বর্ণিত আছে,  রাসলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ----- দুআ শেষে তোমাদের হাতের তালু দিয়ে নিজের চেহারা মুছবে। 
—সুনানে আবু দাউদ,হাদিস ১৪৮৫, মুস্তাদরাকে হাকেম,হাদিস ১৯৬৮, আলমুজামুল কাবির লিততাবারানি, হাদিস ১০৭৭৯

١)عن عمر بن الخطاب، رضي الله عنه قال كان رسول الله صلى الله عليه وسلم اذا رفع يديه في الدعاء لم يحطهما حتى يمسح بهما وجهه
٢)عبد الله بن عباس، ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال ‏”‏ لا تستروا الجدر، من نظر في كتاب اخيه بغير اذنه فانما ينظر في النار، سلوا الله ببطون اكفكم ولا تسالوه بظهورها، فاذا فرغتم فامسحوا بها وجوهكم ‏”‏

٣)عن الزهرى قال: كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يرفع يديه عند صدره فى الدعاء، ثم يمسح بهما وجهه (مصنف عبد الرزاق-2/247، 
                            
২. ফরজ নামাজের পর সম্মিলিত মোনাজাত করা মুস্তাহাব। এটা হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এজন্য এটাকে বেদা‌আত বলার কোনো সুযোগ নেই। তবে জরুরি মনে করা যাবে না।এ ব্যাপারে অনেক হাদিস রয়েছে। বুঝার সুবিধার্থে রাসুলের বিখ্যাত সাহাবি হজরত আলা বিন হাজরামি রাজি. এর একটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করছি। আশা করছি বোঝার জন্য এটি‌ই যথেষ্ট হবে।

 আলবিদায়া ওয়াননিহায়া গ্রন্থে আল্লামা ইবনে কাসির রাহি. সনদসহ বর্ণনা করেছেন।
যার সারমর্ম হলো ,আলা বিন হাজরামি রাজি.মুস্তাজাবুদ দাওয়া সাহাবি ছিলেন। একবার বাহরাইনের জিহাদ থেকে ফেরার পথে এক স্থানে যাত্রাবিরতি করলে খাবার দাবার, তাবু ও রসদসহ উটগুলো পালিয়ে যায়। তখন গভীর রাত। সবাই পেরেশান। ফজরের সময় হয়ে গেলে আজান হলো। সবাই নামাজ আদায় করলেন। নামাজ শেষে আলা বিন হাজরামি রাজি. সহ সবাই হাত তোলে সূর্য উদিত হয়ে সূর্যের কিরণ গায়ে লাগা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় দুআ করতে থাকেন। 
—আলবিদায়া ওয়াননিহায়া-৬/৩২৮-৩২৯
এখানে খুব স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, ফজরের নামাজ শেষ করে হজরত আলা বিন হাজরামি রাজি.  হাত তুলে সূর্যের কিরণ গায়ে লাগা পর্যন্ত অনেক দীর্ঘ মোনাজাত করেছেন এবং তার সাথে যারা ছিলেন তারা সকলেও তার সাথে হাত তুলে মোনাজাত করেছেন। 

উল্লেখ্য : অনেকে বলে থাকেন যে, যেহেতু এটি মুস্তাহাব একটি আমল। এজন্য মাঝেমধ্যে ছেড়ে  দিতে হবে। কারণ মুস্তাহাব আমল সর্বদা করলে বেদআত হয়ে যায়।
কিন্তু তাদের এ বক্তব্য সঠিক নয়।কারণ মুস্তাহাব প্রমাণিত করার জন্য মাঝেমধ্যে ছেড়ে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং মানুষকে বলতে হবে যে, এটি মুস্তাহাব আমল ; এটিকে জরুরি মনে করা যাবে না।
আর সর্বদা করলেন মুস্তাহাব আমল বেদআত হয়ে যায়- এ বক্তব্য‌ও সঠিক নয়।
কারণ শরিয়তে এর কোনো প্রমাণ বা নজির নেই।এর উল্টো মুস্তাহাব আমল সর্বদা চালিয়ে যাওয়া সাহাবায়ে কেরাম রাজি. থেকে বর্ণিত আছে।হজরত আয়শা রাজিয়াল্লাহু আনহা সর্বদা চাশতের নামাজ পড়তেন। তিনি কখনো চাশতের নামাজ ছাড়তেন না। অথচ চাশতের নামাজ মুস্তাহাব পর্যায়ের একটি আমল।মুআত্বা ইমাম মালেক গ্রন্থে হজরত আয়শা রাজিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত , তিনি চাশতের নামাজ ৮ রাকাত পড়তেন এবং বলতেন (চাশতের মুহূর্তে) আমার পিতা- মাতাকে জীবিত করে দেওয়া হলেও আমি এ নামাজ ছাড়বো না। 
—মুআত্বা ইমাম মালিক, পৃষ্ঠা ৫৩-৫৪
সুতরাং এখন যদি বলা হয়, মুস্তাহাব আমল সর্বদা করলে তা বেদআত হয়ে যায়, তাহলে কি হজরত আয়শা রাজিয়াল্লাহু আনহা বেদআত করেছেন?
 তিনি কি বেদআতি ছিলেন? কখনো না। এজন্য এসব কথা অবান্তর যে, মুস্তাহাব সর্বদা করলে বেদআত হয়ে যায়। শরিয়তে এমন মুস্তাহাব পর্যায়ের অনেক আমল রয়েছে যেগুলো মানুষ স্থায়ীভাবে করে।  কিন্তু তখন কেউ বেদআত হওয়ার স্লোগান দিয়ে সেগুলো ছেড়ে দেওয়ার দাবি উঠায় না। 
আমরা এখানে পাঠকদের সুবিধার্থে তিনটি উদাহরণ তুলে ধরছি।
১) জুব্বা পরিধান করা সুন্নতে আদিয়া বা মুস্তাহাব।যাকে সুন্নতে গায়রে হুদাও বলা হয়। তো অনেক আলেম সর্বদা জুব্বা পরিধান করেন। এভাবে অনেক ইমাম সাহেব সব সময় জুব্বা পরে নামাজ পড়ান। কিন্তু তখন তো কেউ এ প্রশ্ন ওঠায় না যে, সর্বদা জুব্বা পরা যাবে না বা ইমাম সাহেবরা সবসময় জুব্বা গায়ে দিয়ে নামাজ পড়াবেন না।  অন্যতায় এটা বেদআত হয়ে যাবে। তাহলে দুআর বেলায় এমন প্রশ্ন কেন? দুআও তো একটি মুস্তাহাব আমল।
২) পাগড়ি পরিধান করা একটি মুস্তাহাব আমল। যা সুন্নাতে গায়রে হুদার অন্তর্ভুক্ত।(সুন্নাতে গায়রে হুদা বলা হয় : যার উপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবাদত হিসেবে সওয়াবের নিয়তে আমল করেননি। বরং অন্য কোনো কারণে আমল করেছেন। যেমন, কখনো প্রয়োজনের তাগিদে, কখনো অভ্যাসগত কারণে, কখনো অভিজ্ঞতার আলোকে ইত্যাদি কারণে আমল করেছেন।) তো অনেক আলেমই সর্বদা পাগড়ি পরে।আবার অনেক ইমাম সাহেব সর্বদা পাগড়ি পরে ইমামতি করেন।  কিন্তু তখন তো কেউ প্রশ্ন তোলে না যে, পাগড়ি সর্বদা পরিধান করা যাবে না। মাঝেমধ্যে ছাড়তে হবে। অন্যথায় তা বেদআত হয়ে যাবে। তাহলে দুআর বেলায় এমন প্রশ্ন কেন ?
৩) বাবরি চুল রাখা অনেক বুজুর্গের দায়েমি অভ্যাস। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরও অভ্যাস ছিলো বাবরি চুল রাখার।  বাবরি চুল রাখার যে তিনটি নিয়ম আছে,  লিম্মা, জুম্মা,অফরা তথা কানের লতি থেকে লম্বা, কানের লতি পর্যন্ত এবং কানের মাঝখান পর্যন্ত। এই তিন পদ্ধতিই সুন্নতে আদিয়ার অন্তর্ভূক্ত।
—নিজামুল ফাতাওয়া, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৫৪

তো অনেক বুজুর্গ-আলেম বাবরি চুল রাখেন এবং বাবরি চুল রেখে অনেকেই নিয়মিত নামাজ পড়ান। কিন্তু তাদের বেলায়তো কেউ এই্ প্রশ্ন উঠায় না যে, মাঝেমধ্যে বাবরি চুল কাটতে হবে অন্যতায় সেটি বেদআত হয়ে যাবে। 
প্রশ্ন শুধু দুআর বেলায় কেন ?

সারকথা : মুস্তাহাব কোনো আমল সর্বদা করলে তা বেদআত হয় না। উপরে বর্ণিত উদাহরণ দ্বারা এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। এ জন্য ফরজ নামাজের পর সর্বদা হাত তুলে সম্মিলিতভাবে দুআ করা যাবে। বিদআত হয়ে যাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে মুস্তাহাব আমল ছেড়ে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
 তবে নামাজের পর দুআ করাকে জরুরী মনে করা যাবে না। 
এখানে একটি প্রশ্ন জাগতে পারে যে, কেউ যদি নামাজের পর দুআ করা জরুরী মনে করে, তাহলে কি দুআ করা ছেড়ে দিতে হবে?  উত্তর : না।
ছেড়ে দেওয়ার কোনো কারণ নেই বরং ওয়াজ- নসিহতের মাধ্যমে মোনাজাত মুস্তাহাব হওয়ার ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিবে। আর এটাই যুক্তিসঙ্গত।

أنس بْنَ مَالِكٍ، قَالَ: أَتَى رَجُلٌ أَعْرَابِيٌّ مِنْ أَهْلِ البَدْوِ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ الجُمُعَةِ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَلَكَتِ المَاشِيَةُ، هَلَكَ العِيَالُ هَلَكَ النَّاسُ، «فَرَفَعَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَدَيْهِ، يَدْعُو، وَرَفَعَ النَّاسُ أَيْدِيَهُمْ مَعَهُ يَدْعُونَ» 
أخرجه البخاري في صحيحه ، رقم الحديث  ١٠٢٩ 

عَنْ حَبِيبِ بْنِ مَسْلَمَةَ الْفِهْرِيِّ – وَكَانَ مُسْتَجَابًا -: أَنَّهُ أُمِّرَ عَلَى جَيْشٍ فَدَرِبَ الدُّرُوبِ، فَلَمَّا لَقِيَ الْعَدُوَّ قَالَ لِلنَّاسِ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – يَقُولُ: ” «لَا يَجْتَمِعُ مَلَأٌ فَيَدْعُو بَعْضُهُمْ وَيُؤَمِّنُ سَائِرُهُمْ، إِلَّا أَجَابَهُمُ اللَّهُ» “.

ثُمَّ إِنَّهُ حَمِدَ اللَّهَ، وَأَثْنَى عَلَيْهِ، وَقَالَ: اللَّهُمَّ احْقِنْ دِمَاءَنَا، وَاجْعَلْ أُجُورَنَا أُجُورَ الشُّهَدَاءِ،

رَوَاهُ الطَّبَرَانِيُّ وَقَالَ: الْهَنْبَاطُ بِالرُّومِيَّةِ: صَاحِبُ الْجَيْشِ. وَرِجَالُهُ رِجَالُ الصَّحِيحِ غَيْرَ ابْنِ لَهِيعَةَ، وَهُوَ حَسَنُ الْحَدِيثِ.
مجمع الزوائد ، رقم الحديث ١٧٣٤٧ 
المستدرك للحاكم  ،  رقم الحديث  ٥٤٧٨
المعجم الكبير ،  رقم الحديث ٣٥٣٦ 

وَقَدْ كَانَ الْعَلَاءُ مِنْ سَادَاتِ الصَّحابة الْعُلَمَاءِ العبَّاد مُجَابِي الدَّعوة، اتَّفق لَهُ فِي هَذِهِ الْغَزْوَةِ أنَّه نَزَلَ مَنْزِلًا فَلَمْ يَسْتَقِرَّ النَّاس عَلَى الْأَرْضِ حَتَّى نَفَرَتِ الْإِبِلُ بِمَا عَلَيْهَا مِنْ زَادِ الْجَيْشِ وَخِيَامِهِمْ وشرابهم، وبقوا على الأرض ليس معهم شئ سِوَى ثِيَابِهِمْ – وَذَلِكَ لَيْلًا – وَلَمْ يَقْدِرُوا مِنْهَا عَلَى بَعِيرٍ وَاحِدٍ، فَرَكِبَ النَّاس مِنَ الهمِّ والغمِّ مالا يُحَدُّ وَلَا يُوَصَفُ، وَجَعَلَ بَعْضُهُمْ يُوصِي إِلَى بَعْضٍ، فَنَادَى مُنَادِي الْعَلَاءِ فَاجْتَمَعَ النَّاس إِلَيْهِ، فَقَالَ: أيُّها النَّاس أَلَسْتُمُ الْمُسْلِمِينَ؟ أَلَسْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ؟

أَلَسْتُمْ أَنْصَارَ اللَّهِ؟ قَالُوا: بَلَى، قَالَ: فَأَبْشِرُوا فَوَاللَّهِ لَا يَخْذِلُ اللَّهُ مَنْ كَانَ فِي مِثْلِ حَالِكُمْ، وَنُودِيَ بِصَلَاةِ الصُّبح حِينَ طَلَعَ الْفَجْرُ فصلَّى بالنَّاس، فلمَّا قَضَى الصَّلاة جَثَا عَلَى رُكْبَتَيْهِ وَجَثَا النَّاس، وَنَصِبَ فِي الدُّعاء وَرَفَعَ يَدَيْهِ وَفَعَلَ النَّاس مِثْلَهُ حَتَّى طَلَعَتِ الشَّمْسُ، وَجَعَلَ النَّاسُ يَنْظُرُونَ إِلَى سَرَابِ الشَّمْسِ يَلْمَعُ مَرَّةً بَعْدَ أُخْرَى وَهُوَ يَجْتَهِدُ فِي الدُّعَاءِ
البداية والنهاية  ٦ : ٣٢٨ - ٣٢٩ 
                        والله تعالى أعلم 
উত্তর প্রদানে
আবদুর রহমান হোসাইনী
জামিয়া শায়খ যাকারিয়্যা ঢাকা 
৩/৬/২০২০ ইংরেজি

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.