মাযহাব কেন মানি দ্বিতীয় পর্ব

 


🌷🌷মাযহাব কেন মানি দ্বিতীয় পর্ব 🌿🌿💟💟💝💝💝💝💝💝💝💝💝

🌻🌻রাসূল ﷺ এর যুগে কিয়াস ইজতিহাদ ও তাকলীদ🌻🌻🌻🌻

ইসলামী শরী‘আতের চার উৎস-কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াসের পরিচিতিমূলক সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর আমরা কিয়াস সম্পর্কে সবিস্তারে আলোচনা করতে চাই। কুরআন ও সুন্নাহর শরয়ী দলীল হওয়ার বিষয়টি একমাত্র কাফের মুলহিদ ছাড়া কেউ অস্বীকার করে না। ইজমা দলীল হওয়ার ব্যাপারেও উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ও বৃহত্তর অংশের মতৈক্য রয়েছে। কিয়াসের ব্যাপারটিও তাই। কিন্তু মাযহাবের নিরাপদ গণ্ডিতে শরী‘আত অনুসরণকারীদের হেনস্থা করতে সুযোগসন্ধানীরা কিয়াসকে মোক্ষম হাতিয়ার মনে করে। তারা বলতে চায়, মাযহাবসমূহ বিশেষত হানাফী মাযহাব কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক নয়; বরং মাযহাবের উৎস হলো কিয়াস। তাদের এ বক্তব্য নিছক মূর্খতাপ্রসূত কিংবা পরিষ্কার হঠকারিতা। শরী‘আতের আইন সম্পর্কে যার ন্যূনতম ধারণা আছে তিনিও জানেন, দলীল চতুষ্টয়ের মধ্যে কিয়াসের ধারাক্রম চতুর্থ নম্বরে। অর্থাৎ উদ্ভূত কোনো সমস্যার সমাধান ধারাক্রম অনুযায়ী কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমায় পাওয়া না গেলে তখনই কেবল কিয়াসের আশ্রয় নেয়া যায়। তাও এ শর্তে যে, কিয়াসটি প্রথমোক্ত তিন দীললের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হতে হবে। তবে শরী‘আতের জ্ঞানে বুৎপত্তি নেই এমন ব্যক্তির নিকট কিয়াসলব্ধ সিদ্ধান্তকে ক্ষেত্রবিশেষে কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা পরিপন্থী মনে হতে পারে; কিন্তু বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিয়ে খতিয়ে দেখলে তার কাছেও সেটা পরিষ্কার কুরআন, সুন্নাহ প্রতিভাত হবে। কিয়াস যে শরী‘আতের অন্যতম দলীল তা অনস্বীকার্য। এতদসংক্রান্ত সন্দেহ-সংশয়ের নিরসনে আমরা স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে সংঘটিত কিয়াস ও ইজতিহাদ নিয়ে আলোচনা করব।

জানা দরকার, কিয়াস মূলত ইজতিহাদের অন্তর্ভুক্ত; ভিন্ন কিছু নয়। কারণ রায় বা ইজতিহাদ বলা হয় নব উদ্ভাবিত বিষয়ের বিধান শরী‘আতের মূল ভাষ্য কুরআন, সুন্নাহ থেকে সাহাবা, তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনের পদ্ধতিতে উদ্ঘাটন করা। তাঁদের পদ্ধতি হলো, বিধান-অজ্ঞাত বিষয়কে কুরআন সুন্নাহ বর্ণিত বিধানজ্ঞাত অনুরূপ বিষয়ের সঙ্গে তুলনা করে জ্ঞাত বিধানটিকে অজ্ঞাত বিষয়ের ওপর আরোপ করা। আর এটাই কিয়াস।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লমের ইজতিহাদঃ

আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট ওহীর আগমন সত্ত্বেও রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক বিষয়ে ইজতিহাদ করে বিধান জারি করেছেন। হাদীস, সীরাত ও নির্ভরযোগ্য ইতিহাসগ্রন্থে এর বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।

দৃষ্টান্ত-১
ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক স্থানে শিবির স্থাপন করলেন। হুবাব ইবনুল মুনযির রা. আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার এ অবস্থান আল্লাহ তা‘আলার হুকুমে, না আপনার ব্যক্তিগত মতের ভিত্তিতে? রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা আমার নিজস্ব মতামত। হুবাব ইবনুল মুনযির রা. বললেন, আমার মতে আপনি শত্রুপক্ষের আগমনের পূর্বে বদরের পানিবিশিষ্ট অংশে ছাউনি ফেলুন। যুদ্ধকৌশল উপযোগী এ মত শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি একটি উত্তম পরামর্শ দিয়েছো। তারপর নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে অনুযায়ী ছাউনি ফেললেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩/২৮০, সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৩২, উসূলুল জাসসাস ২/২০৮-২০৯)

এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে নিজ রায়ের ভিত্তিতে একটি স্থান নির্বাচন করলেন, তারপর হুবাব রা. এর মতামত শুনে সেটাকে স্বীয় দ্বিতীয় ইজতিহাদ দ্বারা প্রাধান্য দিলেন।

দৃষ্টান্ত-২
মক্কাবাসীরা বদর যুদ্ধের মুক্তিপণ পাঠাল। রাসূল তনয়া হযরত যায়নাব রা. এর স্বামী আবূল আসের (যিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি) মুক্তিপণ হিসেবে একটি হার পাঠালেন। হারটি যায়নাবের বিবাহের সময় হযরত খাদিজা রা. উপহার দিয়েছিলেন। খাদিজা রা. এর স্মৃতিবহ হারটি নবীজীকে পুরনো দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দিল। সাহাবায়ে কেরামকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেনঃ

ان رايتم ان تطلقوالها اسيرها وتردوا عليها الذي لها فافعلوا.

তোমরা ভালো মনে করলে যায়নাবের খাতিরে তার বন্দিকে ছেড়ে দিতে পারো এবং হারটি তাকে ফিরিয়ে দিতে পারো। নবীঅন্তঃপ্রাণ সাহাবায়ে কেরাম বলে উঠলেন, কেন নয়, ইয়া রাসূলুল্লাহ! অতঃপর তারা আবূল আসকে ছেড়ে দিলেন এবং হারটি যায়নাব রা. এর নিকট ফিরিয়ে দিলেন।(আল বিদায়া ওয়ান নিয়াহা ৩/৩২৭)

এখানেও রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিদয়া নিয়ে বন্দিমুক্তির ব্যাপারটি নিজ ইজতিহাদের মাধ্যমে করেছেন। কারণ মুক্তিপণ নেয়া আল্লাহর বিধান হলে সেখানে কাউকে ছাড় দেয়ার প্রশ্নই আসত না। অপরদিকে যায়নাবের ব্যাপারে আলাদা বিধান হলে সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শেরও প্রয়োজন হতো না।

দৃষ্টান্ত-৩
খন্দক যুদ্ধের সময় আরবের জাতিপুঞ্জ নিজেদের শক্তি নিয়ে মদীনা অবরোধ করে বসল। অবরোধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় এবং দুঃখ-কষ্ট অসহনীয় হয়ে ওঠায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাবতে লাগলেন, না জানি আনসারগণ ভগ্নোৎসাহ হয়ে পড়েন। তাই তিনি মদীনার উৎপন্ন ফসলের এক তৃতীয়াংশের বিনিময়ে গাতফানীদের নিকট অবরোধ তুলে নেয়ার শর্তে সন্ধি প্রস্তাব করলেন। উভয় পক্ষ সম্মত হলো এবং সন্ধিপত্র লেখা হলো। কেবল স্বাক্ষরিত হওয়াই বাকি ছিল। অবশিষ্ট কাজটুকু করার পূর্বে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের সরদার সাদ ইবনে মুআয ও সাদ ইবনে উবাদা রা. কে ডেকে এ ব্যাপারে তাদেরকে অবহিত করলেন এবং পরামর্শ চাইলেন। তারা উভয়ে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! এটা কি আমাদের কল্যাণার্থে আপনার নিজের প্রস্তাব, না আল্লাহ আপনাকে এ জন্য নির্দেশ দিয়েছেন, যা আমাদেরকে করতে হবে? অন্য বর্ণনামতে তাদের প্রশ্ন ছিল, এটা আপনার মতামত, নাকি ওহী? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা আমার নিজের উদ্যোগ। কারণ, আমি দেখছি গোটা আরব ঐক্যবদ্ধ হয়ে তোমাদের ওপর সর্বাত্মক হামলা চালিয়েছে এবং সবদিক দিয়ে তোমাদের ওপর দুর্লঙ্ঘ অবরোধ আরোপ করেছে। তাই যতটা পারা যায় আমি তাদের শক্তি চূর্ণ করতে চাচ্ছি।

হযরত সাআদ ইবনে মুআয রা. বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! ইতিপূর্বে আমরা এবং এসব লোক শিরক ও মূর্তিপূজায় লিপ্ত ছিলাম। তখন আমরা আল্লাহকে চিনতাম না এবং আল্লাহর ইবাদত করতাম না। সে সময় তারা মেহমানদারী অথবা বিক্রয়ের সূত্রে ছাড়া আমাদের একটা খোরমাও খেতে পারেনি। আর আজ আল্লাহ তা‘আলা যখন আমাদেরকে ইসলামের গৌরব ও সম্মানে ভূষিত করেছেন, সত্যের পথে চালিত করেছেন, তখন তাদেরকে আমাদের ধন-সম্পদ দিতে হবে? আল্লাহর কসম! আমাদের এসবের কোনো প্রয়োজন নেই। আল্লাহর কসম! তরবারির আঘাত ছাড়া তাদেরকে আমরা আর কিছুই দিব না। এভাবেই আল্লাহ তাদের ও আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝতে পারলেন, আনসারগণ ভগ্নোৎসাহ হওয়ার পাত্র নন। বললেন, বেশ তাহলে এ ব্যাপারে তোমার মতই মেনে নিলাম। এর পর হযরত সাআদ ইবনে মুআয রা. চুক্তিপত্রখানা হাতে নিয়ে সমস্ত লেখা মুছে ফেললেন এবং বললেন, ওরা যা পারে করুক। (সীরাতে ইবনে হিশাম ৩/২৪৬, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৪/১১৩)

এই ঘটনায়ও হুজুর সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিজস্ব ইজতিহাদ পরিলক্ষিত হলো। নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম ইজতিহাদ তরক করে দ্বিতীয় ইজতিহাদটি গ্রহণ করলেন।

দৃষ্টান্ত-৪
একবার হযরত আলী রা. নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি আমাকে কোথাও কোনো দায়িত্ব দিয়ে পাঠালে সে ক্ষেত্রে আমি কি সীলমোহরকৃত মুদ্রার ন্যায় হবো, নাকি প্রত্যক্ষদর্শী হবো যে, সব কিছু নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করব? অর্থাৎ আপনি যেভাবে বলে দিয়েছেন হুবহু সেভাবেই করব, নাকি অবস্থা বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেব। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, তুমি বরং প্রত্যক্ষদর্শির ন্যায় হবে যে এমন অনেক বিষয় লক্ষ্য করে, যা অনুপস্থিত ব্যক্তি করে না। (মুসনাদে আহমাদ হা. ৬২৮)

এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী রা. কে পরিস্থিতি দেখে বিবেচনা করে কাজ করার অনুমতি দিয়েছেন। এরই নাম ইজতিহাদ।

দৃষ্টান্ত-৫
বারীরা নাম্নী এক মহিলা হযরত আয়েশা রা. এর বাঁদী ছিল। নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রা. কে বারীরাকে আযাদ করে দিতে বললেন। বারীরার স্বামী মুগীছও ছিল এক ব্যক্তির গোলাম। আযাদ করার পর বিধিমতে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারীরাকে তার পূর্বস্বামী মুগীছ কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তিকে স্বামীরূপে গ্রহণ করার ইচ্ছাধিকার দিলেন। মুগীছ ছিলেন কালো বর্ণের অসুন্দর পুরুষ। কাজেই বারীরা মুগীছকে স্বামীরূপে গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিল। এদিকে মুগীছ ছিলেন বারীরার প্রতি সীমাহীন আসক্ত। তিনি বারীরার পেছন পেছন মদীনার অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে কেঁদে বুক ভাসাতেন। কিন্তু বারীরা ছিল নিজ সিদ্ধান্তে অনড়। একপর্যায়ে ব্যাপারটি নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও ভাবিয়ে তুলল। তিনি বারীরাকে বললেন, তুমি যদি আবার মুগীছকে গ্রহণ করতে! সে বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি কি আমাকে আদেশ করছেন? নবীজী বললেন, না, আমি তো সুপারিশ করছি মাত্র। বারীরা বলল, তাহলে তার ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহ নেই। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং ৫২৮৩)

এই ঘটনায়ও নবীজীর ইজতিহাদ লক্ষ্য করা গেল। এছাড়া নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে চাষাবাদ, চিকিৎসা ও ওষুধ ব্যবহার-সংক্রান্ত অনেক ঘটনা পাওয়া যায় যেখানে তিনি ইজতিহাদ ও রায় দ্বারা ফায়সালা করেছেন। (উসূলুল জাসসাস ২/২২৪)

কিয়াস অস্বীকারকারী বন্ধুরা উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে নিজেদের চিন্তা-ভাবনা পুনর্বিবেচনা করার যথেষ্ট উপকরণ পেয়ে যাবেন আশা করি। আল্লাহ তা‘আলাই তাওফীকদাতা। অবশ্য এটুকুতে ক্ষান্ত না করে কিয়াসের স্বপক্ষে আমরা আরো কিছু প্রমাণ পেশ করছি।

উলামা সাহাবাদের প্রতি ইজতিহাদের নির্দেশঃ

আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন, ‘আর তাদের নিকট যখন কোনো বিষয়ের সংবাদ পৌঁছে, নিরাপত্তার হোক বা ভয়ের হোক, তারা (যাচাই না করে তৎক্ষণাৎ) প্রচার শুরু করে দেয়। তারা যদি এটাকে রাসূলের ওপর এবং তাদের মধ্যে যারা এরূপ বিষয় বুঝতে সক্ষম তাদের ওপর সমর্পন করত তবে তাদের মধ্যে যারা সঠিক তথ্য অনুসন্ধান করে তারা তার বাস্তবতা জেনে নিত।’ (সূরা নিসা ৮৩)

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘এমন কেন করা হয় না যে, তাদের প্রত্যেকটি বড় দল হতে এক একটি ছোট দল (জিহাদে) বের হয় যাতে অবশিষ্ট লোক দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করতে থাকে, আর যাতে তারা নিজ কওম (অর্থাৎ জিহাদে যোগদানকারীদেরকে নাফরমানী) হতে ভয় প্রদর্শন করে, যখন জিহাদকারীরা এদের নিকট প্রত্যাবর্তন করে যেন তারা পরহেয করে চলে।’ (সূরা তাওবা ১২২)

এ ছাড়া আরও বহু আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ইজতিহাদ, ইস্তিম্বাত অর্থাৎ দ্বীনের পরিপক্ব গভীর জ্ঞান অর্জন করে মাসাইল বের করার প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন।

হাদীসের বাণীঃ
হযরত আমর ইবনুল আস রা. হতে বর্ণিত, নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, বিচারক যখন ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্ত দেয় তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ ছওয়াব, আর যদি তার ইজতিহাদে ভুল হয় তার জন্য রয়েছে ইজতিহাদের ছওয়াব। (বুখারী শরীফ ৭৩৫৯, মুসলিম শরীফ ২৬৫৬)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মুআয ইবনে জাবাল রা. কে ইয়ামান প্রেরণের প্রাক্কালে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে কোনো বিচার এলে তুমি কিভাবে তার ফায়সালা করবে? তিনি বললেন, কিতাবুল্লাহ দ্বারা ফায়সালা করব। নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি কিতাবুল্লায় না পাও? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহর সুন্নাহ দ্বারা। বললেন, যদি কিতাবুল্লাহ এবং রাসূলের সুন্নাহয়ও না পাও? তিনি বললেন, আমার রায় দ্বারা গবেষণা করে সিদ্ধান্ত দেব এবং এতে কোনোরূপ ত্রুটি করব না। জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম (খুশিতে) তার সিনায় চাপড় মেরে বললেন, আল্লাহ তা‘আলারই সকল প্রশংসা যিনি রাসুলুল্লাহর দূতকে এমন বিষয়ের তাওফীক দিয়েছেন, যা রাসুলুল্লাহকে সন্তুষ্ট করে দেয়। (সুনানে আবূ দাউদ ৩৫৯২)

হযরত মু‘আবিয়া রা. থেকে বর্ণিত, নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা‘আলা যার কল্যাণ চান তাঁকে তাফাক্কুহ ফিদ দ্বীন অর্থাৎ দ্বীনের গভীর বুৎপত্তি দান করেন। (বুখারী শরীফ ৭১, মুসলিম শরীফ ১০৩৭)

হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত রা. থেকে বর্ণিত, নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ইলমের অনেক বাহক আছে যে তার চেয়ে বেশি বোঝে এমন কারও নিকট ইলম পৌঁছে দেয়। (সুনানে আবূ দাউদ ৩৬৬০, জামে তিরমিযী ২৬৫৬)

এই হাদীস থেকে জানা গেল বাহক এখানে ইলমের শুধু মূল কথাটি কিংবা সামান্য ব্যাখ্যাসহ মূল কথাটি পৌঁছে দিচ্ছে আর যাকে পৌঁছানো হলো সে মূলের আলোকে গবেষণা করে আরও প্রচুর ইলম বের করে আনছে।

এসব হাদীস দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করে মূল ভাষ্য থেকে মাসআলা বের করার প্রতি উৎসাহ ও নির্দেশ প্রদান করে।

🌷🌷নবীজী ﷺ কর্তৃক সাহাবায়ে কিরামের ইজতিহাদ সমর্থন🌷🌷🌷

সাহাবায়ে কেরাম রা. স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায়ও অনেক বিষয়ে ইজতিহাদ করেছেন। তাদের এ ইজতিহাদকে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমর্থনও করেছেন। এ জাতীয় ঘটনার পরিমাণ এত অধিক যে, সবগুলো জড়ো করলে তাওয়াতুর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ফলে ইজতিহাদ ও কিয়াসকে শরয়ী দলীল স্বীকার না করে গত্যন্তর থাকে না। যেমনঃ

(ক) খন্দক যুদ্ধের শেষ দিন একদল সাহাবায়ে কেরামকে লক্ষ্য করে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, তোমাদের কেউ যেন বনু কুরাইযায় পৌঁছা ব্যতীত আসরের নামায না পড়ে। পথিমধ্যে আসরের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার উপক্রম হলো। একদল সাহাবী নবীজীর বাহ্যিক নির্দেশের ওপর আমল করতঃ সূর্যাস্তের পর বনু কুরাইযায় গিয়ে আসর পড়লেন। আরেক দল সাহাবী নবীজীর নির্দেশ থেকে অভীষ্ট লক্ষ্যে যথা দ্রুত পৌঁছার বিধান বের করে সেমতে পথিমধ্যে সময় মতো আসর পড়ে নিলেন। অতঃপর এ ব্যাপারে অবগত হয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই দলের কাউকেও তিরস্কার করেননি। (বুখারী শরীফ ৪১১৯)

(খ) নামাযের জন্য লোকজনকে কিভাবে জমায়েত করা যায় এ মর্মে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। কেউ বললেন, নামাযের সময় পতাকা ওড়ানো হোক। লোকেরা পতাকা দেখে একে অপরকে জানিয়ে দিবে। মতটি নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পছন্দ হলো না। কেউ বললেন, শিঙ্গা বাজানো হোক। নবীজী ইরশাদ করলেন, এটা তো ইয়াহুদীদের কাজ। কেউ পরামর্শ দিলেন, ঘণ্টাধ্বনি দেওয়া হোক। নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা তো নাসারারা করে থাকে। (সুনানে আবূ দাউদ ৪৯৮)

এখানেও সাহাবায়ে কেরাম নিজস্ব কিয়াস ও ইজতিহাদের ভিত্তিতে বিভিন্ন রকম পরামর্শ পেশ করেছেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেগুলো খণ্ডন করেছেন বটে কিন্তু কাউকে ভর্ৎসনা করেননি।

(গ) আরবগণ ইস্তিঞ্জার সময় সাধারণত ঢিলা ও পানির যে কোনো একটি ব্যবহার করত। কুবার অধিবাসীরা ইজতিহাদ করে ঢিলা ও পানির সমন্বয় ঘটাল। আল্লাহ তাদের প্রশংসায় আয়াত নাযিল করলেন, ‘সেখানে এমন সব লোক রয়েছে যারা উত্তমরূপে পবিত্র হতে পছন্দ করে। আর আল্লাহ তা‘আলা উত্তমরূপে পবিত্রতা সম্পাদনকারীদেরকে পছন্দ করেন।’ (সূরা তাওবা ১০৮)

আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুবার আনসারদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আনসার সম্প্রদায়! তোমরা এমন কী আমল শুরু করেছো, যার জন্য আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের প্রশংসা করেছেন। তাঁরা বললেন, আমরা (ঢিলার সঙ্গে)পানি দ্বারা ইস্তিঞ্জা করি।(জামে তিরমিযী ৩১০০)

দেখা যাচ্ছে, কুবার অধিবাসীরা নবীজীকে না জানিয়ে নিজেরা ইজতিহাদ করে ইস্তিঞ্জার নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করলেন। ইজতিহাদকে বৈধ মনে না করলে তারা কখনও এটা করতেন না। হাদীস ও ইতিহাসের কিতাবে এ জাতীয় বহু ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। যা দৃষ্টে বুঝে আসে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায়ই সাহাবায়ে কেরাম ইজতিহাদ করেছেন আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনই তাদেরকে ইজতিহাদ করতে নিষেধ করেননি বরং সমর্থন করেছেন এবং ইজতিহাদে ভুল হলে তা শুধরে দিয়েছেন।

শরয়ী কিয়াস যেহেতু ইজতিহাদেরই অন্তর্ভুক্ত তাই উপর্যুক্ত দলীলগুলোই কিয়াসের প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। এ ছাড়াও কুরআন সুন্নাহয় শরয়ী কিয়াসের অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। তার কিছু নিম্নে তুলে ধরা হচ্ছেঃ

আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইহরাম অবস্থায় বন্য শিকারকে হত্যা করো না, আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ইচ্ছাপূর্বক তা হত্যা করবে, তার ওপর বিনিময় ওয়াজিব হবে, যা (মূল্যের দিক দিয়ে) সেই জানোয়ারের সমতুল্য হয়, যাকে সে হত্যা করেছে। এর (আনুমানিক মূল্যের) মীমাংসা করে দেবে তোমাদের মধ্যে হতে দুজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি..।’ (সূরা মায়িদা ৯৫)

ইবনে আবদুল বার রহ. বলেন, এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা একটি বস্তুকে তার সমপর্যায়ের অনুরূপ ও সদৃশ বস্তুর সঙ্গে তুলনা করে তার ওপর বিধান আরোপ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ফুকাহায়ে কেরামের দৃষ্টিতে এটাই কিয়াস। (জামিউ বায়ানিল ইলমি ওরা ফাজলিহী ২/৮৬৯)

আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, فاعتبروا يااولي الابصار ...অতএব হে চক্ষুষ্মানেরা! তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো। (সূরা হাশর-২)

ইমাম আবূ বকর জাসসাস রহ. বলেন, ইবরাহীম ইবনে উলাইয়া রহ. এই আয়াত দ্বারা কিয়াস প্রমাণ করেছেন। এভাবে যে, আয়াতে اعتبار এর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর এ‘তেবার হলো অতিক্রম করা, এক বস্তু থেকে আরেক বস্তুর দিকে যাওয়া। কিয়াসের মধ্যেও এই অর্থ পাওয়া যায়। কারণ কিয়াস অর্থ হলো কুরআন সুন্নাহয় বর্ণিত মূল বিধানটি শাখার ওপর আরোপ করা। (উসুলুল জাসসাস ২/২১২)

🌻🌻রাসূলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক কিয়াস করণ🌻🌻🌻🌻🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🍀

ক) এক ব্যক্তি নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের কেউ তার স্ত্রীর সঙ্গে জৈবিক চাহিদা পূরণ করে, এতেও কি সে সওয়াব লাভ করবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, তোমার কি ধারণা, সে যদি হারাম পন্থায় তার চাহিদা পূরণ করতো তাহলে কি গোনাহগার হতো না? লোকটি বলল, হ্যাঁ, তাতো হতো। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ঠিক তেমনি বৈধভাবে বাসনা পূরণের মাধ্যমেও সওয়াব লাভ করবে। কি মনে কর? তোমাদের মন্দের বদলা দেওয়া হবে আর ভালোর প্রতিদান দেওয়া হবে না।... (মুসলিম শরীফ ১০০৬)

খ) এক ব্যক্তি নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে আরজ করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার একটি কালো বর্ণের সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে। (অথচ আমরা স্বামী স্ত্রী কেউ কালো বর্ণের নই।) নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি উট আছে? সে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিল। জিজ্ঞেস করলেন সেগুলো কি বর্ণের? বলল, লাল বর্ণের। জানতে চাইলেন, লাল উটের গর্ভজাত ছাই বর্ণের উট নেই? বলল, আছে। জিজ্ঞেস করলেন, (লাল বর্ণের নরমাদীর প্রজনন সত্ত্বেও তাদের গর্ভজাত ছাই রঙা উট) কোথা থেকে আসল? বলল কোনোও রগ তাকে টেনে এনেছে। (অর্থাৎ পূর্বে তার বংশে এই বর্ণের উট ছিল।...) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, তোমার এই ছেলেকেও হয়তো কোনো রগ টেনে এনেছে। (বুখারী শরীফ ৫৩০৫, ৬৮৪৭)

এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্নকারীকে কিয়াসের মাধ্যমে জবাব দিয়েছেন যে, লাল উট কখনও ছাই বর্ণের উট জন্ম দেয় যখন তার বংশে এই বর্ণের উট থাকে। তেমনি ফর্সা দম্পতির সন্তানও কালো বর্ণের হয় যখন তার উর্ধ্বতন কেউ কালো বর্ণের থাকে।

গ) হযরত উমর ফারুক রা. একবার নবীজীর নিকট আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজ আমি বড় একটি অপরাধ করে ফেলেছি। আমি রোযা রেখে স্ত্রীকে চুম্বন করেছি। নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তোমার কি ধারণা তুমি যদি রোযা অবস্থায় পানি দিয়ে কুলি করতে (তাহলে রোযার কোনো ক্ষতি হতো?) হযরত উমর রা. বললেন, না এতে তো কোনো ক্ষতি দেখছি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, চুম্বনও অনুরূপ একটি ব্যাপার। (সহীহ সনদে সুনানে আবূ দাউদ ২৩৮৫)

ঘ) জুহাইনা গোত্রের এক মহিলা নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট জানতে চাইলেন, আমার মা হজ্জের মান্নত করেছিল। কিন্তু হজ্জ না করেই তিনি মারা গিয়েছিলেন। এখন আমি কি তার পক্ষ হতে হজ্জ করব? নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, হ্যাঁ, তার পক্ষ থেকে হজ্জ কর। তোমার মায়ের ওপর কোনো ঋণ থাকলে তুমি কি তা আদায় করতে না? (অবশ্যই করতে) কাজেই তোমরা আল্লাহর ঋণও আদায় কর। আল্লাহ তা‘আলা ঋণ আদায়ের অধিক হকদার। (বুখারী শরীফ ১৮৫২)

ঙ) রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বংশ সম্পর্কের কারণে যাদের সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ করেছেন দুধপান জনিত কারণেও তাদের সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ করেছেন। (জামে তিরমিযী ১১৪৬)

এখানে দুধ পানজনিত সম্পর্ককে বংশসম্পর্কের ওপর কিয়াস করা হয়েছে।

চ) বিড়ালের উচ্ছিষ্ট পাক, না নাপাক এ সম্পর্কে নবীজীকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি একটি আয়াতের ওপর কিয়াস করে (যেখানে বারবার অনুমতি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করা কঠিন হওয়ার নির্দিষ্ট সময় ব্যতীত অন্য সময়ের জন্য তা শিথিল করা হয়েছে) বিড়ালের উচ্ছিষ্টকে পাক বলেছেন। (তাফসীরে ইবনে কাসীর ৬/৯২, কুরতুবী ১২/২৮০)

🌻🌻🌷🌷রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবদ্দশায় সাহাবা কর্তৃক কিয়াস🌷🌷

১. হযরত মুআয ইবনে জাবাল রা.কে ইয়ামানে প্রেরণ করার সময় নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কিভাবে ফায়সালা করবে? তিনি বললেন, কিতাবুল্লাহ দ্বারা। নবীজী জিজ্ঞেস করলেন, যদি কিতাবুল্লাহয় না পাও? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহর সুন্নাহ দ্বারা। আবার বলা হল, যদি কিতাবুল্লাহ এবং সুন্নাহ কোনোটিতে না পাও? তিনি জবাব দিলেন, আমি আমার রায় দ্বারা গবেষণা করে ফায়সালা করবো এবং চেষ্টার কমতি করবো না। তাঁর এ জবাবে নবীজী অত্যন্ত সন্তোষ প্রকাশ করলেন। (সুনানে আবূ দাউদ ৩৫৯২)

এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশাতেই কিয়াসের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করা যায়। কারণ হাদীস দৃষ্টে বোঝা যায় উম্মত এমন বিষয়েরও সম্মুখীন হবে যার সমাধান কুরআন-সুন্নাহয় সুস্পষ্টরূপে থাকবে না। সে ক্ষেত্রে কুরআন সুন্নাহর সিদ্ধান্তের আলোকে কিয়াস করেই সমস্যার সমাধান করতে হবে।

২. হযরত আম্মার রা. এর বর্ণনা, তিনি বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এক যুদ্ধে পাঠালেন। এক পর্যায়ে আমার গোসল ফরজ হল। গোসল করব এ পরিমাণ পানিও ধারে কাছে ছিল না। এজন্য গোসলের বিকল্প হিসেবে আমি মাটিতে গড়াগড়ি খেলাম ঠিক যেমন কোনো প্রাণী মাটিতে গড়াগড়ি খায়। মদীনায় ফিরে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উক্ত ঘটনা ব্যক্ত করলাম। শুনে তিনি বললেন, তোমার জন্য দুই হাত মাটিতে মেরে (ধুলা-বালি) ঝেড়ে মুখমণ্ডল আর দুই হাত (কনুই পর্যন্ত) মাসাহ করে নিলেই যথেষ্ট ছিল। (মুসলিম শরীফ ১৬১)

দেখা যাচ্ছে হযরত আম্মার রা. উযূর তায়াম্মুমের ওপর গোসলের তায়াম্মুমকে কিয়াস করেছেন। অর্থাৎ উযূর বদলে যেমন তায়াম্মুম হয় গোসলের বদলেও তায়াম্মুম হবে। কিন্তু কিয়াসে সামান্য ভুল হওয়ায় নবীজী তা শুধরে দিয়েছিলেন যে, তোমার কিয়াস তো ঠিক কিন্তু গোসলের তায়াম্মুম উযূর তায়াম্মুমের মতই হবে। ভিন্ন রকম হবে না। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য কিয়াস করতে তাকে নিষেধ করেননি।

এ ঘটনা এক মস্তবড় দলীল যে, সাহাবায়ে কেরামও বিধান অজ্ঞাত বিষয়ের সম্মুখীন হলে তার সমাধানে কিয়াসের সহায়তা নিতেন।

এ সমস্ত দলীল প্রমাণ দ্বারা সুস্পষ্টরূপে সাব্যস্ত হল, কিয়াস শরী‘আতের মজবুত দলীল। এছাড়া দ্বীন পূর্ণাঙ্গ হতেই পারে না। সুতরাং এর অস্বীকার গোমরাহী। যারা এটাকে অস্বীকার করে তাদের তাওবা করা উচিত।

পরের পর্বে বাকি লেখা আসবে ইনশা'আল্লাহ

লিখেছেনঃ  Mawlana Mujahidul Islam


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.