একসাথে তিন তালাক এক তালাক ফতোয়া লা -মাযহাবী তৈরির একটি ভয়ংকর পদ্ধতি!
যা কুরআন হাদিস ইজমায়ে সাহাবা ও ইজমায়ে উম্মাহর পরিপন্থী।।
কুরআনের পরিস্কার নির্দেশ-
الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ
অর্থাৎ তালাক হবে দুইবার ৷ (সুরা বাকারাঃ ২২৯)
এইতো গেল দুই তালাকের বিধান। এরপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তিন তালাক প্রদানের বিধান ঘোষণা করে ইরশাদ করেন-
قَالَ اللّٰہُ تَعَالٰی: فَاِنْ طَلَّقَھَا فَلاَ تَحِلُّ لَہُ مِنْ بَعْدُ حَتّٰی تَنْکِحَ زَوْجًا غَیْرَہُ۔ ۗ فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَن يَتَرَاجَعَا إِن ظَنَّا أَن يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ ۗ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ يُبَيِّنُهَا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ [٢:٢٣٠]
তারপর যদি সে স্ত্রীকে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়া হয়, তবে সে স্ত্রী যে পর্যন্ত তাকে ছাড়া অপর কোন স্বামীর সাথে বিয়ে করে না নেবে, তার জন্য হালাল নয়। অতঃপর যদি দ্বিতীয় স্বামী তালাক দিয়ে দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের জন্যই পরস্পরকে পুনরায় বিয়ে করাতে কোন পাপ নেই। যদি আল্লাহর হুকুম বজায় রাখার ইচ্ছা থাকে। আর এই হলো আল্লাহ কতৃক নির্ধারিত সীমা; যারা উপলব্ধি করে তাদের জন্য এসব বর্ণনা করা হয়। {সূরা বাকারা-২৩০}
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম শাফেয়ী রহ উল্লেখ করেছেন যে,
1: قَالَ الْاِمَامُ مُحَمَّدُ بْنُ اِدْرِیْسَ الشَّافِعِیُّ:وَالْقُرْآنُ یَدُلُّ وَاللّٰہُ اَعْلَمُ عَلٰی اَنَّ مَنْ طَلَّقَ زَوْجَۃً لَّہُ دَخَلَ بِھَا اَوْلَمْ یَدْخُلْ بِھَاثَلَاثًالَمْ تَحِلَّ لَہُ حَتّٰی تَنْکِحَ زَوْجاً غَیْرَہُ۔
(کتاب الام ؛امام محمد بن ادریس الشافعی ج2ص1939)
অর্থাৎ, কুরআনুল কারিম থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, যে লোক নিজের স্ত্রীকে তিন তালাক দিল, তার সাথে সহবাস হোক আর নাহোক সে স্ত্রী তার জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত হালাল নয় যতক্ষণ সে স্ত্রীর অন্য কারো সাথে বিয়েতে আবদ্ধ না হয়। (কিতাবু উম ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস শাফেয়ী ২/১৯৩৯)
অতএব,তিন তালাক বললে এক তালাক পতিত হবার কথা একটি মুর্খতাসূলভ বক্তব্য ছাড়া আর কিছু নয়। যা পরিস্কার আয়াতের খেলাফ। আর রাসূল সাঃ থেকে এমন কোন হাদীস বর্ণিত হয়নি যে, কোন ব্যক্তি তিন তালাক প্রদান করছে, আর রাসূল সাঃ তাকে বলেছেন যে, এক্ষেত্রে তিন তালাক হয়নি বরং এক তালাক হয়েছে। এমন কোন ঘটনা না রাসূল সাঃ থেকে পাওয়া যায়, না সাহাবীদের থেকে পাওয়া যায়।
এটি সম্পূর্ণই একটি ভুল ফাতওয়া।
সাহাবায়ে কিরাম,তাবেয়ীগণ,মুজতাহিদ ৪ ইমামগণ ও অধিকাংশ ওলামায়ে কিরাম, সেই সাথে বর্তমান সৌদি আরবের নির্ভরযোগ্য সকল ওলামায়ে কিরামগণ এক মজলিসে তিন তালাক দিলে তিন তালাকই পতিত হয়, এক তালাক নয় মর্মে ফতোয়া দিয়েছেন। এ বিষয়ে পূর্ণ ইসলামের ইতিহাসে কোন গ্রহণযোগ্য আলেম দ্বিমত পোষণ করেননি। কেবল মাত্র আল্লামা ইবনে তাইমিয়্যা রহঃ ও তার অন্ধ পুজারী শিষ্য আল্লামা ইবনুল কাইয়্যুম রহঃ ব্যতিত। কিন্তু সকল উম্মতের বিপরীত (যেখানে ইমাম চতুষ্টয়- ইমাম আবু হানীফা রহঃ, ইমাম শা‘ফী রহঃ, ইমাম মালেক রহঃ, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহঃ অন্তর্ভূক্ত) এই দুই জনের সিদ্ধান্ত কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যা কুরআনের আয়াত ও অগণিত হাদিস এবং সাহাবায়ে কিরামের আমল দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত।
মুজাহিদ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন
, عَنْ مُجَاهِدٍ قَالَ: كُنْتُ عِنْدَ ابْنِ عَبَّاسٍ فَجَاءَهُ رَجُلٌ، فَقَالَ: إِنَّهُ طَلَّقَ امْرَأَتَهُ ثَلَاثًا، قَالَ: فَسَكَتَ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ رَادُّهَا إِلَيْهِ، ثُمَّ قَالَ: " يَنْطَلِقُ أَحَدُكُمْ، فَيَرْكَبُ الْحُمُوقَةَ ثُمَّ يَقُولُ يَا ابْنَ عَبَّاسٍ، يَا ابْنَ عَبَّاسٍ، وَإِنَّ اللَّهَ قَالَ: (وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا) [الطلاق: ٢]، وَإِنَّكَ لَمْ تَتَّقِ اللَّهَ فَلَمْ أَجِدْ لَكَ مَخْرَجًا، عَصَيْتَ رَبَّكَ، وَبَانَتْ مِنْكَ امْرَأَتُكَ،
আমি হযরত ইবনে আব্বাস রা.-এর সাথে ছিলাম। তাঁর কাছে এক ব্যাক্তি এসে বললো যে, সে তার স্ত্রীকে তিন-তালাক দিয়ে ফেলেছে। মুজাহিদ রহ. বলেন, তিনি (তার একথা শুনে) চুপ করে থাকলেন। এমনকি আমি ধারনা করছিলাম যে, তিনি তার স্ত্রীকে তার কাছে ফিরিয়ে দিবেন। অতঃপর তিনি বললেন: তোমাদের কেউ কেউ (কিছু কিছু ব্যাপারে) হঠকারীতা করে অগ্রসর হয়, তারপর (তার মাথায়) নির্বুদ্ধিতা চেঁপে বসে (এবং আল্লাহ’কে ভয় না করে তড়িঘড়ি করে কিছু করে ফেলে), এরপর (এসে) বলে- হে ইবনে আব্বাস, হে ইবনে আব্বাস! আর আল্লাহ তাআলা বলেছেন- وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا – ‘আর যে ব্যাক্তি আল্লাহ’কে ভয় করবে, তিনি তার জন্য পথ বের করে দিবেন’। আর তুমি আল্লাহকে ভয় করো নি, তাই আমিও তোমার জন্য কোনো পথ পাচ্ছিনা। তুমি তোমার রবের নাফরমানী করেছো এবং তোমার স্ত্রী তোমার (বিবাহ-বন্ধন) থেকে ছিন্ন হয়ে গেছে। [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২১৯৭ ]
ইমাম মাজাহ রহঃ অধ্যায় লিখেছেন "যে ব্যক্তি একেই মজলিসে ৩ তালাক দেয়"
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ رُمْحٍ حَدَّثَنَا اللَّيْثُ بْنُ سَعْدٍ عَنْ إِسْحَقَ بْنِ أَبِي فَرْوَةَ عَنْ أَبِي الزِّنَادِ عَنْ عَامِرٍ الشَّعْبِيِّ قَالَ قُلْتُ لِفَاطِمَةَ بِنْتِ قَيْسٍ حَدِّثِينِي عَنْ طَلَاقِكِ قَالَتْ طَلَّقَنِي زَوْجِي ثَلَاثًا وَهُوَ خَارِجٌ إِلَى الْيَمَنِ فَأَجَازَ ذَلِكَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم
আমির থেকে বর্ণিতঃ:
আমি ফাতিমাহ্ বিনতু কায়স (রাঃ) কে বললাম, আপনার তালাকের ঘটনাটি আমাকে বলুন। তিনি বলেন, আমার স্বামী ইয়ামানে থাকা অবস্থায় আমাকে তিন তালাক দেয়। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এটিকে জায়িয বলে গণ্য করেন।
[সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২০২৪,সুনানে আন-নাসায়ী, হাদিস নং ৩৪০৫]
ইমাম বুখারী রহঃ তার সহিহ বুখারী শরিফে উল্লেখ করেন,
وَقَالَ اللَّيْثُ حَدَّثَنِي نَافِعٌ قَالَ كَانَ ابْنُ عُمَرَ أَنَّ ابْنَ عُمَرَ كَانَ يَقُولُ لِلرَّجُلِ إِذَا سَأَلَهُ عَنْ طَلَاقِ الْحَائِضِ فَأَخْبَرَهُ بِمَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ , ثُمَّ يَقُولُ ابْنُ عُمَرَ: «أَمَّا أَنْتَ فَطَلَّقْتَ امْرَأَتَكَ وَاحِدَةً أَوِ اثْنَتَيْنِ فَإِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَدْ أَمَرَنِي بِهَذَا , وَأَمَّا أَنْتَ فَطَلَّقَتْ ثَلَاثًا فَقَدْ حُرِّمَتْ عَلَيْكَ حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَكَ وَقَدْ عَصَيْتَ رَبَّكَ فِيمَا أَمَرَكَ بِهِ مِنَ الطَّلَاقِ»
ইব্নু ‘উমার (রাঃ)- কে এক লোক হায়েযাবস্থায় একইসাথে তিন ত্বলাক্ব প্রদানকারী সম্বন্ধে রাসুলুল্লাহ সঃ কিছু বলেছেন কীনা? জিজ্ঞেস করলে হযরত ইবনে ওমর রাঃ বলেনঃ যদি তুমি একবার তালাক দাও অথবা দু‘বার দাও-তাহলে রাসুলুল্লাহ সঃ বলেছেন যে, অবশ্যই তুমি তোমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারবে ! কিন্তু তুমি স্ত্রীকে উক্ত (হায়েজাবস্তায়)অর্থাৎ একই সময়ে তিন ত্বলাক্ব দিয়ে দিলে সেই স্ত্রীলোকটি তোমার জন্য হারাম হয়ে যাবে, যতক্ষণ না সে (স্ত্রী) তোমাকে ছাড়া অন্য স্বামীকে বিয়ে করে।
আর অবশ্যই এইরূপ একইসাথে তিন তালাক দেওয়া হলো তালাক বিষয়ে আল্লাহর নির্দেশনার নাফরমানী করা ৷৷
(সহিহ বুখারী, হাঃ নং ৫২৬৪, ৫৩৩২; সুনানে দারাকুতনী, হাঃ নং ৩৯৬৯, ৩৯৬৬)
3974 - نا عَلِيُّ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ عُبَيْدٍ الْحَافِظُ , نا مُحَمَّدُ بْنُ شَاذَانَ الْجَوْهَرِيُّ , نا مُعَلَّى بْنُ مَنْصُورٍ , نا شُعَيْبُ بْنُ رُزَيْقٍ , أَنَّ عَطَاءً الْخُرَاسَانِيَّ حَدَّثَهُمْ , عَنِ الْحَسَنِ , قَالَ: نا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ , أَنَّهُ طَلَّقَ امْرَأَتَهُ تَطْلِيقَةً وَهِيَ حَائِضٌ ثُمَّ أَرَادَ أَنْ يُتْبِعَهَا بِتَطْلِيقَتَيْنِ أُخْرَاوَيْنِ عِنْدَ الْقُرْئَيْنِ فَبَلَغَ ذَلِكَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ , فَقَالَ: «يَا ابْنَ عُمَرَ مَا هَكَذَا أَمَرَكَ اللَّهُ إِنَّكَ قَدْ أَخْطَأْتَ السُّنَّةَ، وَالسُّنَّةُ أَنْ تَسْتَقْبِلَ الطُّهْرُ فَيُطَلِّقَ لِكُلِّ قُرُوءٍ» , قَالَ: فَأَمَرَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَرَاجَعْتُهَا , ثُمَّ قَالَ: «إِذَا هِيَ طَهُرَتْ فَطَلِّقْ عِنْدَ ذَلِكَ أَوْ أَمْسِكْ» , فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ رَأَيْتَ لَوْ أَنِّي طَلَّقْتُهَا ثَلَاثًا كَانَ يَحِلُّ لِي أَنْ أُرَاجِعَهَا؟ , قَالَ: «لَا كَانَتْ تَبِينُ مِنْكَ وَتَكُونُ مَعْصِيَةً
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) তাঁর স্ত্রীকে ঋতুমতী অবস্থায় এক তালাক দেন। এর পর ইচ্ছা করলেন বাকী দুই তালাক দুই কুরু অর্থাৎ দুই পবিত্রাবস্থায় প্রদান করবেন।
রাসুলুল্লাহ সঃ বিষয়টি জ্ঞাত হওয়ার পরে তিনি হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর রাঃ কে বললেনঃ- হে ইবনে ওমর ! তোমাকে তো আল্লাহ তাআলা এরূপ হুকুম দেননি? তুমি তো সুন্নাতের বিপরীত কাজ করেছে ! তালাকের সুন্নাত হলো— স্ত্রী যখন হায়েজ থেকে তুহুর বা পবিত্রাবস্থায় থাকবে, তখন প্রত্যেক পবিত্রাবস্থায় তাকে (এক) তালাক দেবে।৷
(যেহেতু এক তালাক দিয়েছিলাম, তাই) রাসুলুল্লাহ সঃ আমাকে হুকুম করলেন যে, তুমি স্ত্রীকে প্রত্যাবর্তন (রাজাআত) করো ৷। তারপর বললেনঃ স্ত্রী যখন পবিত্রাবস্থাতে থাকবে, তখন তুমি তোমার ঐরূপ তালাক প্রদান করবে ৷
অতপর, আমি জিজ্ঞেস করলাম:- হে আল্লাহর রাসুল!! যদি আমি আমার স্ত্রীকে ঐ অবস্থায় একইসাথে তিন তালাক ই দিয়ে দিতাম তখন কি আমি প্রত্যাবর্তন করলে সে আমার জন্য হালাল হতো? নবী করিম (সা.) উত্তরে ইরশাদ করেন:— না !! সে তোমার কাছ থেকে পৃথক হয়ে যেত এবং এই কাজ করা গুনাহ।
(সুনানে দারাকুতনী, হাদীস নং ৩৯৭৪ , সুনানে বায়হাকী কুবরা, হাদীস নং-১৪৭৩২}
حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ زَیَّادِ الْقَطَّانُ نَااِبْرَاہِیْمُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ الْھَیْثَمِ صَاحِبُ الطَّعَامِ حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ حُمَیْدٍ نَا سَلْمَۃُ بْنُ الْفَضْلِ عَنْ عَمْرِوبْنِ أبِیْ قَیْسٍ عَنْ اِبْرَاھِیْمَ بْنِ عَبْدِالْأعْلٰی عَنْ سُوَیْدِ بْنِ غَفْلَۃَ قَالَ: لَمَّا مَاتَ عَلِيٌّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ جَاءَتْ عَائِشَةُ بِنْتُ خَلِيفَةَ الْخَثْعَمِيَّةُ امْرَأَةُ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ , فَقَالَتْ لَهُ: لِتَهْنِكَ الْإِمَارَةَ , فَقَالَ لَهَا: تُهَنِّينِي بِمَوْتِ أَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ انْطَلِقِي فَأَنْتِ طَالِقٌ فَتَقَنَّعْتُ بِثَوْبِهَا , وَقَالَتِ: اللَّهُمَّ إِنِّي لَمْ أُرِدْ إِلَّا خَيْرًا فَبَعَثَ إِلَيْهَا بِمُتْعَةٍ عَشَرَةِ آلَافٍ وَبَقِيَّةَ صَدَاقِهَا فَلَمَّا وُضِعَ بَيْنَ يَدَيْهَا بَكَتْ , وَقَالَتْ: مَتَاعٌ قَلِيلٌ مِنْ حَبِيبٍ مَفَارِقٍ فَأَخْبَرَهُ الرَّسُولُ , فَبَكَى وَقَالَ: لَوْلَا أَنِّي أَبَنْتُ الطَّلَاقَ لَهَا لَرَاجَعْتُهَا , وَلَكِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «أَيُّمَا رَجُلٍ طَلَّقَ امْرَأَتَهُ ثَلَاثًا عِنْدَ كُلِّ طُهْرٍ تَطْلِيقَةً أَوْ عِنْدَ رَأْسِ كُلِّ شَهْرٍ تَطْلِيقَةً أَوْ طَلَّقَهَا ثَلَاثًا جَمِيعًا لَمْ تَحِلَّ حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ»
হযরত সুওয়াইদ ইবনে গাফলা (রহ.) বলেন, হযরত আলী রাঃ ইন্তেকাল করলে হযরত হাসান বিন আলী রাঃ এর স্ত্রী আয়েশা বিনতে খলীফাতাল খাছ আমিয়াহ রহঃ এসেছিলেন ৷
তিনি আমিরুল মু'মিনীন আলী রাঃ এর ইন্তেকালে আনন্দ প্রকাশ করলে হযরত হাসান রাঃ তাকে একত্রে তিন তালাক দেন এবং ইদ্দত পালনের পর তাকে বাকী মোহর এবং অতিরিক্ত দশ হাজার টাকা দিয়ে দেন। তখন সে তালাক প্রাপ্তা স্ত্রী বলল তালাক দানকারী থেকে এ মালের মূল্য খুবই নগণ্য ৷
তখন হযরত হাসান (রা:) কেঁদে ফেললেন এবং বললেন যদি তোমাকে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকতো,তবে আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিতাম ৷
কিন্তু, আমি রাসুলুল্লাহ সঃ বলতে শুনেছি:- রাসুলুল্লাহ সঃ ইরশাদ করেনঃ— “যে ব্যক্তি নিজের স্ত্রীকে প্রত্যেক পবিত্রাবস্থায় (তুহুরে) একটি করে অথবা প্রত্যেক মাসের শেষে একটি করে অথবা একই কুরুতে একই সাথে তিনবার তালাক দিয়ে দিলো, তবে সে তার জন্য পুনরায় হালাল হবে না, যতক্ষণ না স্ত্রীলোকটি কোন অন্য লোকের সাথে বিবাহ/সহবাস করে ।
(সুনানে দারাকুতনী, হাঃ নং ৩৯৭৩,সুনানে কুবরা, বাইহাকী- ৭/৩৩৬; আল-মু’জামুল কাবীর, ত্বাবরাণী- ৩/৯১)
ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী রহ. তাঁর কিতাব
بيان مشكل الأحاديث الواردة في أن الطلاق الثلاث واحدة
-এ এই রেওয়ায়েতটি উল্লেখ করার পর বলেছেন –
اسناده صحيح
এর সনদ সহিহ। [আল-ইশফাক্ব আলা আহকামিত ত্বালাক, কাউসারী- ২৪ পৃ:]
وَحَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ رَافِعٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ، أَخْبَرَنَا ابْنُ جُرَيْجٍ، أَخْبَرَنِي ابْنُ شِهَابٍ، عَنِ الْمُتَلاَعِنَيْنِ، وَعَنِ السُّنَّةِ، فِيهِمَا عَنْ حَدِيثِ، سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ أَخِي بَنِي سَاعِدَةَ أَنَّ رَجُلاً، مِنَ الأَنْصَارِ جَاءَ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ رَجُلاً وَجَدَ مَعَ امْرَأَتِهِ رَجُلاً وَذَكَرَ الْحَدِيثَ بِقِصَّتِهِ . وَزَادَ فِيهِ فَتَلاَعَنَا فِي الْمَسْجِدِ وَأَنَا شَاهِدٌ . وَقَالَ فِي الْحَدِيثِ فَطَلَّقَهَا ثَلاَثًا قَبْلَ أَنْ يَأْمُرَهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم . فَفَارَقَهَا عِنْدَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم " ذَاكُمُ التَّفْرِيقُ بَيْنَ كُلِّ مُتَلاَعِنَيْنِ " .
ইবনু জুরায়জ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমাকে ইবনু শিহাব (রহঃ) বানু সা'ইদাহ গোত্রের ইবনু সা'দ বর্ণিত দু'জন লি'আনকারী ও তার বিধান সম্পর্কে অবহিত করেছেন। তিনি (সাহল) বলেনঃ জনৈক আনসারী নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এলেন এবং বললেনঃ হে আল্লাহর রসূল! যদি কোন লোক তার স্ত্রীর সঙ্গে (ব্যভিচাররত) অন্য কোন পুরুষকে দেখতে পায় তাহলে সে সম্পর্কে আপনার মতামত কী? এরপর পুরো ঘটনাসহ হাদীস বর্ণনা করেন। এতে বাড়তি বর্ণনা করেন যে, (স্বামী-স্ত্রী) উভয়ে মসজিদের ভেতরে লি'আন করল আর আমি উপস্থিত ছিলাম। আর তিনি এ হাদীসে বলেছেনঃ
//রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কোন নির্দেশ দেয়ার পুর্বেই তিনি তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্মুখেই তাকে আলাদা করে দেন।// তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ–এ উভয়ই লি'আনকারীর মাঝখানে বিচ্ছেদ।
সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৫২৫৯,৫৩০৮,৫৩০৯. সহিহ মুসলিম, ৩৬৩৭,সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২২৫০
وَحَدَّثَنِي مُحَمَّدُ بْنُ رَافِعٍ، حَدَّثَنَا حُسَيْنُ بْنُ مُحَمَّدٍ، حَدَّثَنَا شَيْبَانُ، عَنْ يَحْيَى، - وَهُوَ ابْنُ أَبِي كَثِيرٍ - أَخْبَرَنِي أَبُو سَلَمَةَ، أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ قَيْسٍ، أُخْتَ الضَّحَّاكِ بْنِ قَيْسٍ أَخْبَرَتْهُ أَنَّ أَبَا حَفْصِ بْنَ الْمُغِيرَةِ الْمَخْزُومِيَّ طَلَّقَهَا ثَلاَثًا ثُمَّ انْطَلَقَ إِلَى الْيَمَنِ فَقَالَ لَهَا أَهْلُهُ لَيْسَ لَكِ عَلَيْنَا نَفَقَةٌ . فَانْطَلَقَ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ فِي نَفَرٍ فَأَتَوْا رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي بَيْتِ مَيْمُونَةَ فَقَالُوا إِنَّ أَبَا حَفْصٍ طَلَّقَ امْرَأَتَهُ ثَلاَثًا فَهَلْ لَهَا مِنْ نَفَقَةٍ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " لَيْسَتْ لَهَا نَفَقَةٌ وَعَلَيْهَا الْعِدَّةُ " . وَأَرْسَلَ إِلَيْهَا " أَنْ لاَ تَسْبِقِينِي بِنَفْسِكِ " . وَأَمَرَهَا أَنْ تَنْتَقِلَ إِلَى أُمِّ شَرِيكٍ ثُمَّ أَرْسَلَ إِلَيْهَا " أَنَّ أُمَّ شَرِيكٍ يَأْتِيهَا الْمُهَاجِرُونَ الأَوَّلُونَ فَانْطَلِقِي إِلَى ابْنِ أُمِّ مَكْتُومٍ الأَعْمَى فَإِنَّكِ إِذَا وَضَعْتِ خِمَارَكِ لَمْ يَرَكِ " . فَانْطَلَقَتْ إِلَيْهِ فَلَمَّا مَضَتْ عِدَّتُهَا أَنْكَحَهَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أُسَامَةَ بْنَ زَيْدِ بْنِ حَارِثَةَ.
যাহ্হাক ইবনু ক্বায়স-এর ভগ্নী ফাত্বিমাহ্ বিনতু ক্বায়স (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:
তার স্বামী আবূ হাফ্স ইবনু মুগীরাহ্ (রাঃ) তাকে #একত্রে_তিন_ত্বলাক্ব_প্রদান_করেন। এরপর তিনি ইয়ামান চলে যান। তখন তার( আবূ ‘আমর-এর) পরিবারের লোকজন তাকে (ফাত্বিমাকে) বলল, তোমার জন্য আমাদের দায়িত্বে কোন খোরপোষ নেই। এরপর খালিদ ইবনু ওয়ালিদ (রাযি:) একদল লোকসহ রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এলেন। তখন তিনি মায়মূনাহ্ (রাঃ) এর ঘরে অবস্থান করছিলেন। তারা বললেন, (ইয়া রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)!) আবূ হাফস্ তার স্ত্রীকে তিন ত্বলাক্ব দিয়েছেন। এখন তার স্ত্রী কি খোরপোষ পাবে?! বললেনঃ না, তার জন্য কোন খোরপোষ নেই; তার উপর ‘ইদ্দাত পালন করা ওয়াজিব। তিনি তাকে বলে পাঠালেন যে, তুমি আমাকে না জানিয়ে বিবাহের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে না। তিনি তাকে ‘ইদ্দাত পালনের জন্য উম্মু শারীক–এর ঘরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। এরপর তিনি তাকে লোক মারফত জানিয়ে দিলেন যে, উম্মু শারীক এমন একজন মহিলা যার কাছে প্রাথমিক হিজরতকারী সাহাবীগণ যাওয়া আসা করে থাকেন। সুতরাং তুমি অন্ধ ইবনু উম্মু মাকতূম এর ঘরে চলে যাও। কারণ সেখানে তুমি প্রয়োজনবোধে তোমার দোপাট্টা (ওড়না) নামিয়ে রাখলে সে তোমাকে দেখতে পাবে না। যখন তার ‘ইদ্দাত পূর্ণ হল তখন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উসামাহ্ ইবনু হারিসাহ্ (রাঃ)-এর সঙ্গে তার বিয়ে দিয়ে দিলেন।
(মুসলিমঃ ৩৫৯২,নাসাঈঃ ৩৪০৬,দারাকুৎনীঃ ৩৯২২ )
🍂নোট:— একই রুকুতে একইসাথে তিন তালাক দেওয়া কবিরাহ গুনাহ ৷ কিন্তু, উপরের হাদীসের রাসুলুল্লাহর সঃ ভাষ্য মোতাবেক প্রমাণিত হলো যে, লি'আন এবং একই কুরুতে একই বৈঠকে তিন তালাক– উভয়েই চূড়ান্তভাবে তালাক হয়ে যায়।।
তিন তালাক দিলে তিন তালাক পতিত হওয়ার বিষয় উম্মতের ইজমা বা ঐক্যমত
1: قَدْ قَالَ الْاِمَامُ أَبُوْبَکْرِ ابْنُ الْمُنْذِرِ النِّیْشَابُوْرِیُّ: وَأجْمَعُوْا عَلٰی أَنَّ الرَّجُلَ اِذَاطَلَّقَ اِمْرَأتَہُ ثَلاَ ثًا أَنَّھَالَاتَحِلُّ لَہُ اِلَّابَعْدَ زَوْجٍ عَلٰی مَا جَائَ بِہٖ حَدِیْثُ النَّبِیِّ صَلَّی اللہُ عَلَیْہِ وَسَلَّمَ ثُمَّ قَالَ:أَوْ اَجْمَعُوْاعَلٰی أَنَّہُ اِنْ قَالَ لَھَا أَنْتِ طَالِقٌ ثَلاَثاً اِلَّا ثَلاَثاً اَنَّھَا اُطْلِقَ ثَلاَ ثًا۔
(کتاب الاجماع لابن المنذر ص92)
ইমাম ইবনে মুনযির (রহ.) বলেন, “ফক্বীহগণ এবং মুহাদ্দিসগণ এই বিষয়ে একমত যে, যদি কোন লোক নিজের স্ত্রীকে তিন তালাক দেয় তবে সে স্ত্রী তার জন্য হালাল থাকে না। হাঁ যদি সে নারী অন্য স্বামীর সাথে বিয়েতে আবদ্ধ হয় (এর পর স্বাভাবিকভাবে সে তালাক দেয়) তখন তার জন্য হালাল হয়ে যায়। কারণ সে ব্যাপারে নবী করীম (সা.) হতে হাদীস বর্ণিত আছে। ইবনুল মুনযির বলেন “ফক্বীহ ও মুহাদ্দিসগণ এই বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যদি স্বামী নিজ স্ত্রীকে বলে, انت طالق ثلاثا الا ثلاثا (তোমাকে তিন তালাক কিন্তু তিন তালাক) তখনও তিন তালাক পতিত হবে। (কিতাবুল ইজমা লিইবনে মুনযার ৯২)
2: قَالَ الْاِمَامُ الْحَافِظُ الْمُحَدِّثُ الْفَقِیْہُ أَبُوْجَعْفَرٍ أَحْمَدُ بْنُ مُحَمَّدِ الطَّحَاوِیُّ مَنْ طَلَّقَ اِمْرَأتَہُ ثَلاَثاً فَاَوْقَعَ کُلاًّ فِیْ وَقْتِ الطَّلَاقِ لَزِمَہُ مِنْ ذٰلِکَ…فَخَاطَبَ عُمَرُبِذٰلِکَ النَّاسَ جَمِیْعًا وَفِیْھِمْ أَصْحَابُ رَسُوْلِ اللّٰہِ صَلَّی اللہُ عَلَیْہِ وَسَلَّمَ وَرَضِیَ اللّٰہُ عَنْھُمُ الَّذِیْنَ قَدْعَلِمُوْامَاتَقَدَّمَ مِنْ ذٰلِکَ فِیْ زَمَنِ رَسُوْلِ اللّٰہِ صَلَّی اللہُ عَلَیْہِ وَسَلَّمَ فَلَمْ یُنْکِرْہُ عَلَیْہِ مِنْھُمْ مُنْکِرٌوَلَمْ یَدْفَعْہُ دَافِعٌ فَکَاَنَّ ذٰلِکَ اَکْبَرُ الْحُجَّۃِ فِیْ نَسْخٍ مَاتَقَدَّمَ مِنْ ذٰلِکَ لِاَنَّہُ لَمَّاکَانَ فِعْلُ اَصْحَابِ رَسُوْلِ اللّٰہِ صَلَّی اللہُ عَلَیْہِ وَسَلَّمَ جَمِیْعاً فِعْلاً یَجِبُ بِہِ الْحُجَّۃُ کَانَ کَذٰلِکَ اَیْضاً اِجْمَاعُھُمْ عَلَی الْقَوْلِ اِجْمَاعاً یَجِبُ بِہِ الْحُجَّۃُ۔
(سنن الطحاوی ج2ص34باب الرجل یطلق امرأتہ ثلاثاً معا،ونحوہ فی مسلم ج1 ص477 )
মুহাদ্দিসে কবীর ইমাম আবু জাফর তাহাবী (রহ.) বলেন, যে নিজের স্ত্রীকে তিন তালাক দিল এবং তিন তালাক সাব্যস্তও করেছে তবে তা অবশ্যক হয়ে যাবে। (দলীল হলো এই বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের ইজমা) যখন হযরত উমর (রা.) সকল লোককে যখন এ বিষয়ে সম্বোধন করে বললেন তিন তালাকের তিন তালাকই পতিত হয় এবং সে লোকদের মধ্যে নবী সা. এর সাহাবীও উপস্থিত ছিলেন যারা নবী সা. এর যুগের সব কিছু সম্পর্কে ভালভাবে ওয়াকিফহাল ছিলেন কিন্তু কেউ হযরত উমর (রা.) এর এই কথার উপর অস্বীকৃতি জানাননি। তাহলে এটিই সব চেয়ে বড় দলীল যে, এর পূর্বে যা ঘটেছে সবই রহিত হয়েগেছে। কারণ সকল সাহাবায়ে কেরামের আমল এত শক্তি শালী যে, তা থেকে দলীল গ্রহণ করা ওয়াজিব সেরূপ তাদের কোন বিষয়ের উপর ঐক্যমত্য পোষণও দলীল। (সুনানে তাহাবী ২/৩৪, অনুরূপ মুসলিম ১/৪৭৭)
সৌদী উলামাদের সর্বসম্মত ফাতওয়া
সৌদী আরবের গ্রহণযোগ্য গবেষক আলেমগণ গবেষণা করে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, তিন তালাকে তিন তালাকই পতিত হবে। সৌদী ওলামাদের নির্ধারিত সিদ্ধান্তের কপি নিম্নরূপ-
بعد الاطلاع على البحث المقدم من الأمانة العامة لهيئة كبار العلماء والمعد من قبل اللجنة الدائمة للبحوث والإفتاء في موضوع ( الطلاق الثلاث بلفظ واحد ) .
وبعد دراسة المسألة ، وتداول الرأي ، واستعراض الأقوال التي قيلت فيها ، ومناقشة ما على كل قول من إيراد – توصل المجلس بأكثريته إلى اختيار القول بوقوع الطلاق الثلاث بلفظ واحد ثلاثا ___الخ (مجلة البحوث الإسلامية، المجلة الأول، العدد الثالث، سنة 1397 ه)
অর্থ: লাজনাতুত দায়িমা লিল বুহুস ওয়াল ইফতা পরিষদ সৌদী আরব কর্তৃক নির্বাচিত ‘এক শব্দে তিন তালাক’ বিষয়ে গবেষণা কর্মে দায়িত্বরত শীর্ষ ওলামাদের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক প্রদত্ত গবেষণাপত্র ও এ বিষয়ে গভীর অধ্যয়ন,প্রতিটি উক্তির বাছ বিচার ও তার পক্ষে-বিপক্ষে উপস্থাপিত সকল প্রশ্নের উত্তর উত্থাপিত হওয়ার পর অধিকাংশ ওলামায়ে কিরামের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিষদ এই সিদ্ধান্তে উপনিত হয় যে,এক শব্দে তিন তালাক দিলে তিন তালাকই পতিত হবে। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যা, প্রথম খন্ড, তৃতীয় সংখ্যা, ১৩৯৭ হিজরী)
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা আশা করি এ বিষয়টি পরিস্কার হয়ে গেছে যে, কুরআন ও হাদীস ও উম্মতের ইজমায়ী সিদ্ধান্ত হল, তিন তালাক এক বাক্যে প্রদান করুক, এক বৈঠকে প্রদান করুক, বা একদিন প্রদান করুক, বা এক মাসে প্রদান করুক, যেভাবেই তিন তালাক প্রদান করুক, তিন তালাকই পতিত হবে।এক তালাক নয়। যা কুরআন ও হাদীস ও উম্মতের ইজমা দ্বারা প্রমাণিত।
একটি সন্দেহের অপনোদন
আহলে হাদীস নামধারী বা লা মাযহাবী বন্ধুরা তিন তালাক একসাথে প্রদান করলে এক তালাক হবে মর্মে যে ফাতওয়া প্রদান করেন, সেটির স্বপক্ষে একটি হাদীস পেশ করে থাকেন। যা সহীহ মুসলিমে বর্ণিত।
মূলত উক্ত হাদীসটির যথার্থ অর্থ না বুঝার কারণে তারা এ হাদীস দিয়ে দলীল পেশ করে থাকেন।
হাদীসটি হল,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ كَانَ الطَّلاَقُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- وَأَبِى بَكْرٍ وَسَنَتَيْنِ مِنْ خِلاَفَةِ عُمَرَ طَلاَقُ الثَّلاَثِ وَاحِدَةً فَقَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ إِنَّ النَّاسَ قَدِ اسْتَعْجَلُوا فِى أَمْرٍ قَدْ كَانَتْ لَهُمْ فِيهِ أَنَاةٌ فَلَوْ أَمْضَيْنَاهُ عَلَيْهِمْ. فَأَمْضَاهُ عَلَيْهِمْ.
হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, এবং আবু বকর সিদ্দীক রাঃ এবং হযরত উমর রাঃ এর খিলাফতের প্রথম দুই বছর তিন তালাককে এক তালাক গণ্য করা হতো। তারপর উমর বিন খাত্তাব রাঃ বললেন, লোকেরা ঐ বিষয়ে দ্রুততা করছে, যার ক্ষেত্রে তাদের সুযোগ ছিল। যদি আমি তাদের উপর উপরোক্ত বিষয়টি নির্ধারণ করে দেই? তারপর তিনি তা নির্দিষ্ট করে দিলেন। {সহীহ মুসলিম। হাদীস নং-৩৭৪৬}
এ হাদীসে ‘নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগ ও আবুবকর রাঃ ও উমর রাঃ এর যুগের প্রথম দুই বছর তিন তালাককে এক তালাক গণ্য করা হতো’ মর্মের কথাটি সঠিক মর্মার্থ উদ্ধারে যারা অক্ষম তারা বাহ্যিক তরজমা হিসেবে বলে যে, আগে তিন তালাক বললে এক তালাক ছিল, আর উমর রাঃ এসে তিন তালাক বললে তিন তালাক হবার ফাতাওয়া জারী করেছেন।
কিন্তু আসল বিষয় তা নয়।
মূলত উক্ত হাদীসে একটি নির্দিষ্ট সূরতের একটি মাসআলার বিধান আলোচিত হয়েছে। সেটি বুঝার জন্য একটি বিষয় বুঝতে হবে। সেটি হল,
আরবীতে দু’টি শব্দ আছে। এক হল,‘তাকীদ’। আরেক হল ‘ইস্তিনাফ’।
ইস্তিনাফ হল যেমন একজন মেহমান রুমে ঢুকলে আমি বললাম, ‘মেহমান আসছে’। আবার আরেকজন মেহমান আসলো, আমি বললাম, ‘মেহমান আসছে’। আবার আরেকজন মেহমান প্রবেশ করলে আমি আবার বললাম, ‘মেহমান আসছে’।
এভাবে তিনজন মেহমান আসলে আমি তিনবারই বললাম ‘মেহমান আসছে’। এখানে যেহেতু তিনবার ‘মেহমান আসছে’ বলার দ্বারা তিনজন আলাদা মেহমান উদ্দেশ্য তাই এটাকে বলবে ‘ইস্তিনাফ’।
কিন্তু একজন বড় মেহমান আসল, তখন আমি খুশিতে তিনবার বললাম ‘মেহমান আসছে, মেহমান আসছে, মেহমান আসছে’। বললাম তিনবার। কিন্তু উদ্দেশ্য তিন মেহমান নয়। বরং একজনই। প্রথমবার বললাম ইস্তিনাফ হিসেবে। কিন্তু বাকি দুইবার নতুন কোন অর্থে বলিনি বরং প্রথম কথাটির তাকীদ হিসেবে বলেছি।
এবার মাসআলাটি বুঝুন।
তুমি তালাক, তুমি তালাক, তুমি তালাক।
কেবল উপরোক্ত শব্দে তালাক প্রদান করলে এখানে দু’টি অর্থেরই সম্ভাবনা থাকে। এক হল, ইস্তিনাফ। আরেক হল, তাকীদ।
তাকীদ ধরলে এক তালাক পতিত হয়। আর বাকি দু’টি তালাক তাকীদ হিসেবে ধর্তব্য হয়।
আর যদি ইস্তিনাফ হয়, তাহলে তিন তালাকই পতিত হয়।
এ শব্দে তালাক প্রদানকারীর নিজের নিয়তের উপর এর হুকুম প্রযোজ্য হয়।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে, এবং আবূ বকর রাঃ ও উমর রাঃ এর খিলাফতের প্রথম দুই বছর কোন মুসলমান যদি আদালতে এসে বলতো, আমি আমার স্ত্রীকে ‘তুমি তালাক, তুমি তালাক, তুমি তালাক বলে তিন তালাক প্রদান করেছি। কিন্তু প্রথমটি দ্বারা তালাক ও বাকি দু’টি দ্বারা ইস্তিনাফ নয় বরং তাকীদ উদ্দেশ্য নিয়েছি। তাহলে তার কথা মেনে নেয়া হতো।
যেমন একটি হাদিস দেখুন।।
وَعَنْ رُكَانَةَ بْنِ عَبْدِ يَزِيدَ أَنَّه طَلَّقَ امْرَأَتَه سُهَيْمَةَ الْبَتَّةَ فَأَخْبَرَ بِذٰلِكَ النَّبِىَّ ﷺ وَقَالَ : وَالله مَا أَرَدْتُّ إِلَّا وَاحِدَةً فَقَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ : «وَاللّٰهِ مَا أَرَدْتَ إِلَّا وَاحِدَةً؟» فَقَالَ رُكَانَةُ : وَاللّٰهِ مَا أَرَدْتُّ إِلَّا وَاحِدَةً فَرَدَّهَا إِلَيْهِ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ فَطَلَّقَهَا الثَّانِيَةَ فِىْ زَمَانِ عُمَرَ وَالثَّالِثَةَ فِىْ زَمَانِ عُثْمَانَ. رَوَاهُ أَبُوْ دَاودَ وَالتِّرْمِذِىُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِىُّ إِلَّا أَنَّهُمْ لَمْ يَذْكُرُوا الثَّانِيَةَ وَالثَّالِثَةَ
রুকানাহ্ ইবনু ‘আব্দ ইয়াযীদ হতে বর্ণিত। তিনি স্বীয় স্ত্রী সুহায়মাহ্-কে নিশ্চিত তালাক দিলেন। অতঃপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বিষয়টি অবহিত করে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি এক ত্বলাকের নিয়্যাত করেছি, অন্য কিছু নয়। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর কসম! তুমি কি এক তালাক ব্যতীত অন্য কিছু নিয়্যাত করনি? আমি বললাম, আল্লাহর কসম! এক তালাক ব্যতীত অন্য কিছু নিয়্যাত করিনি। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার নির্দেশ করলেন।
(মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস নম্বরঃ ৩২৮৩)
ভাল করে চিন্তা করে দেখুন, যদি একই সাথে প্রদত্ত তিন-তালাক স্বাভাবিকভাবে এক-তালাকই গণ্য হয়ে থাকতো, তাহলে রাসুলুল্লাহ সা.-এর দুইবার কসম নেয়ার কি প্রয়োজন ছিল? আর একথা-তো আপনাদের জানাই আছে যে, কোনো কারণ ছাড়া কসম করা বা কাউকে করানো -কোনোটাই শরীয়তের দৃষ্টিতে পছন্দনীয় কাজ নয়। একথাটি ওলামায়ে উম্মাতের এই দাবীর স্বপক্ষে একটি বড়মাপের সুস্পষ্ট দলিল যে, রাসুলুল্লাহ সা.-এর জামানায় (একই সাথে প্রদত্ত) তিন-তালাককে স্বাভাবিকভাবে এক-তালাক গণ্য করা হত না, বরং নিয়তের উপর নির্ভর করা হত। যতদিন পর্যন্ত নিয়তের উপর ভরসা করা গেছে, ততদিন পর্যন্ত সেই অনুপাতে আমল হয়েছে।
যেহেতু প্রথম যুগের মানুষ সবাই সত্যবাদী ছিলেন। তাই যা নিয়ত করতেন, তা’ই বলতেন।
কিন্তু হযরত উমর রাঃ এর সময় যখন পৃথিবীব্যাপী ইসলাম ছড়িয়ে পড়তে লাগল। প্রায় সকল সাহাবাগণই বিভিন্ন জিহাদের উদ্দেশ্যে সফরে বেরিয়ে পড়েন। তখন মদীনায় প্রচুর নতুন মুসলমানদের আনাগোনা ও বসবাস বৃদ্ধি পায়।
যাদের অনেকের মাঝেই সাহাবাযুগের সেই তাক্বওয়া ও পরহেযগারী বিদ্যমান ছিল না।
তখন হযরত উমর রাঃ প্রতারণার এ পন্থা রুদ্ধ করার জন্য ঘোষণা করলেন যে, যেহেতু যে শব্দে তাকীদ ও ইস্তিনাফের সুযোগ ছিল। কিন্তু এ সুযোগের অসদ্ব্যবহার করা শুরু হয়ে গেছে। তাই তিনি আইন করলেন যে, এখন থেকে উপরোক্ত শব্দে তালাক প্রদান করলে তাকীদের নিয়তের কথা বললে তার কথা আদালতে গ্রহণ করা হবে না। বরং ইস্তিনাফ হিসেবে তিন তালাকই পতিত হয়েছে বলে ধর্তব্য হবে।
এ হাদীসে কেবল একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি তথা ‘তুমি তালাক, তুমি তালাক, তুমি তালাক’ সংক্রান্ত মাসআলা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। যেখানে তাকীদ ও ইস্তিনাফ এর অর্থের সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু এক বাক্যে তিন তালাক প্রদান করলে, বা এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক বলে তালাক প্রদান করলে, কিংবা ইস্তিনাফের নিয়তে উপরোক্ত শব্দে তালাক দিলে এক তালাক নববী ও আবু বকর রাঃ এর যুগে গণ্য করা হতো মর্মে কোন হাদীস বর্ণিত হয়নি।
শরহে নববীতে ইমাম নববী রহঃ উক্ত হাদীসের আলোচনায় এ বিষয়টি সুষ্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছেন। যার আরবী পাঠ হল,
أنه كان في أول الأمر إذا قال لها أنت طالق أنت طالق أنت طالق ولم ينو تأكيدا ولا استئنافا يحكم بوقوع طلقة لقلة ارادتهم الاستئناف بذلك فحمل على الغالب الذي هو ارادة التأكيد فلما كان في زمن عمر رضي الله عنه وكثر استعمال الناس بهذه الصيغة وغلب منهم ارادة الاستئناف بها حملت عند الاطلاق على الثلاث عملا بالغالب السابق الى الفهم منها في ذلك العصر
সুতরাং উক্ত হাদীসকে এক বাক্যে তিন তালাক প্রদানকে এক তালাক হবার দলীল হিসেবে পেশ করা অজ্ঞতা ছাড়া আর কী’ হতে পারে?
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে লা মাযহাবী ভয়াবহ ফেতনা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।