খুব প্রচলিত একটা প্রশ্ন হচ্ছে, হানাফী মাজহাব প্রায়ই সহীহ হাদিসের বিপরীত মত দিয়ে থাকে। এটা একটা কমন প্রশ্ন সাধারণ লোকজনের কাছে। এই বিষয়ে কিছু আলোকপাত করা জরুরি মনে করছি!
আল্লাহ তাওফীক দাতা !
দেখুন, অনেক মাসালায় আমরা দেখতে পাই যে, হানাফী মাজহাবের এমন কিছু দলীল আছে ; যা বাহ্যত সহীহ হাদিসের বিপরীত রয়েছে। আপনার দেখে মনে হতে পারে,
১. হানাফী মাজহাব সহীহ হাদিস বিরোধী
২. হানাফী মজহাব সহীহ ছেড়ে জইফ জাদিস মানে
৩. হানাফী মাজহাবের কাছে সহীহ হাদিস পৌঁছে নাই
এরকম নানান প্রশ্ন মাথায় ভন ভন করতে পারে। তবে প্রিয় ভাই, হানাফী মাজহাব কেন সহীহ হাদিস পাইলেই গ্রহণ করে না, তা কি কখনো যাচাই-বাছাই করে দেখেছেন ? বা বিজ্ঞ কারো থেকে জেনে নিয়েছেন ? এরকম একটা সুক্ষ্ম বিষয়ে নিয়ে এই লেখায় আপনাদের সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা পেশ করবো।
ধরুন ,
দৃষ্টান্ত হিসেবে আমরা একটা হাদিস নেই -
أيما امرأة نكحت بغير إذن وليها فنكاحها باطل
অর্থাৎ , কোন মহিলা যদি নিজ অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত বিবাহ করে, তাহলে তার বিবাহ বাতিল বলে গণ্য হবে।
হাদিসটি ইমাম আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ সহ অনেক মুহাদ্দীস গ্রহণ করেছেন এবং হাদিসের মান হাসান পর্যায়ের। পর্যায়ক্রমে, 2/566, 3/407, 1/605
বাহ্যত দৃষ্টিতে এটি একটি আমলযোগ্য হাদিস। যে কেউ সাধারণ পাঠ করে তাই বুঝতে পারবেন যে, কোন মহিলা অভিভাবক ব্যতীত বিবাহ করলে ত্র বিবাহ বাতিল।
কিন্তু, এই হাদীসটি ইমাম আজমে আবু হানিফা রাঃ গ্রহণ করেন নি বা হানাফী মাজহাবের এই ফতোয়া গৃহীত হয়নি। অর্থাৎ, হানাফী মাজহাবের ফতোয়া হচ্ছে, কোন মহিলা অভিভাবক ছাড়া বিবাহ করলে তার বিবাহ বাতিল হবে না।
আপনি বলতে পারেন -
হাদিসে এসেছে বিবাহ বাতিল আর আবু হানিফা রাহঃ কি জন্য বিবাহ বাতিল নয় বলে ফতোয়া দিলেন ?
জ্বী, এখানে একটা সুক্ষ্ম রহস্য নিহিত আছে, যা না জানা থাকার কারণে আমরা অনেকেই ইমামের আজমের উপর অপবাদ বা গালি দিয়ে থাকি। আল্লাহ তা'লা সবাইকে ক্ষমা করুক!
সুক্ষ্ম রহস্য হচ্ছে - আলোচিত হাদিসটি হলো 'খবরে ওয়াহিদ'। অর্থাৎ, হাদিসটি মুতাওয়াতির পর্যায়ের নয়। আর খবরে ওয়াহিদ গ্রহণের বেশ কিছু মূলনীতি বা শর্ত আছে, যা পাওয়া গেলে হাদিসটি গ্রহণ করা হবে ; নতুবা নয়!
নোটঃ মুতাওয়াতির ও খবরে ওয়াহিদ নিয়ে পূর্বে আলোচনা হয়েছে।
খবরে ওয়াহিদ হাদিসকে গ্রহণ করার জন্য অন্যতম একটা শর্ত হচ্ছে -
" হাদিসটি বর্ণনাকারীদের মধ্যে কোন একজন যেন পরবর্তীতে এই হাদিসের কথা ভুলে না যান বা অস্বীকার না করেন "
খবরে ওয়াহীদ বর্ণনাকারীকে যদি পরবর্তীতে জিজ্ঞাস করা হয় এবং তিনি হাদিস বর্ণনার স্বীকৃতি দেন, তবে হাদিসটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হবে। আর যদি অস্বীকার করেন বা ভুলে যাওয়ার কথা বলেন, তাহলে হাদিসটা অকাট্যভাবে গ্রহণ করা যাবে না।
এবার দেখুন,
উপরোক্ত হাদিসটি সূলাইমান ইবনে মূসা ইমাম জুহরি থেকে বর্ণনা করেন, ইমাম জুহরি উরওয়াহ থেকে বর্ণনা করেন, আর ইমাম উরওয়াহ হযরত আয়শা রাঃ থেকে বর্ণনা করেন ( হাদিসটি মারফু) ।
চার্টের আলোকে হাদিসের বর্ণনা দেখুন -
মূসা ইবনে সুলাইমান → ইমাম জুহরী → উরওয়াহ → আয়শা রাজিয়াল্লাহু আনহা
উপরোক্ত সনদের সবাই সিকাহ রাবী। কোন অসুবিধা নাই। তবে, একদা ইমাম ইবনে জুরাইহ ( রাহঃ) এই হাদিস সম্পর্কে ইমাম জুহরি ( রাহঃ) কে জিজ্ঞেস করেন। ইমাম জুহরি উত্তর দিলেন, জানেন না।
তাহলে দেখা গেলো, আলোচিত হাদিসটির মধ্যে একজন রাবী হচ্ছেন - ইমাম জুহরী রাহঃ। আর পরবর্তীতে উনাকে এই হাদিস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, জানেন না।
সূত্র -
মুসনাদে আহমাদ ৭/৭২
সূনানে তিরমিজি ৩/৪১
শারহু মা'আনিয়াল আছার লিত্তাহাবী ৩/৮
মা'আলিমুস সুনান লিখাত্তাবী ২/৫৬৭
আস-সুনানুল কুবরা লিল-বাইহাকি ৭/১০৬
( একাধিক সূত্র রয়েছে, সুতরাং ইমাম জুরাইহ রাহঃ এর প্রশ্ন নিয়ে যেন কোন সন্দেহ না থাকে )
তাহলে আপনারাই বলুন - আমরা উপরে যে ' খবরে ওয়াহিদ হাদিস' গ্রহণ করর মূলনীতি জেনেছি, তার আলোকে কি এই হাদিসকে গ্রহণ করা যায় ?
সুবহানাল্লাহ !
হাদিসটা হাসান পর্যায়ের । দেখা মাত্রই যে কেউ গ্রহণ করার মতো ; কিন্তু এর ভিতরে যে কত বড় সুক্ষ্ম বিষয় নিহিত আছে ____ তা কয়জনে জানতেন ?
শেষ আপনারাই বলেন , হানাফী মাজহাবে এই হাদিসটি গ্রহণ না হওয়া কি একেবারে অ-মৌলিক হয়েছে ? অন্যায় হয়েছে ? নাকি বলবেন, আবু হানিফা রাঃ এর কাছে এই হাদিসটি পৌঁছে নাই ?
আলাহু আকবার!
কি করে আপনারা এসব তুহমত দিতে পারেন ? আবু হানীফা রাহঃ এর কাছে যদি হাদিসটি নাই বা পৌঁছে থাকে, তাহলে এই হাদিসের রাবী'র সুক্ষ্ম বিষয় নিয়ে কিভাবে আলোচনা করলেন ?
শারিয়াহ বিভাগ, মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়
