মাযহাবের বিভিন্নতা এবং তাকলিদের হাকিকত, পর্ব-১৭

মাযহাবের বিভিন্নতা ও তাকলীদের হাকীকত🌹🌹🌹🌹
সম্প্রতি ‘আহলে হাদীস’ বন্ধুরা মাযহাব ও তাকলীদ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠিয়েছেন। মাযহাব ও তাকলীদ সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ সরলমনা মুসলমানদেরকে বিভ্রান্তিতে নিপতিত করছেন। হাদীস মানার কথা বলে এবং বড় বড় কয়েকজন ইমামের উক্তির অপব্যবহার করে মুসলমানদেরকে মাযহাব ও তাকলীদের গণ্ডি থেকে বের করে আনছেন। ইতোমধ্যে অনেক মুসলমান তাদের ধোঁকার শিকার হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মাযহাব ও তাকলীদের হাকীকত ও স্বরূপ মুসলমান ভাইদের সামনে তুলে ধরা জরুরী হয়ে পড়েছে, যেন মুসলমান ভাইয়েরা মূল বিষয় সম্পর্কে অবগত হতে পারে এবং তথাকথিত আহলে হাদীস বন্ধুদের ধোঁকার শিকার না হয়।

মাযহাবের বিভিন্নতার কারণঃ

ইসলামের উৎস মূল কুরআন ও সুন্নাহ। কুরআন শরীফের ছয় হাজার দুইশত ছত্রিশ আয়াতের মধ্য থেকে মাত্র পাঁচশত আয়াত শরী‘আতের হুকুম সম্পর্কীয়। আর হাদীসের বিশাল ভাণ্ডারের মধ্য থেকে মাত্র তিন হাজার হাদীস ইসলামের হুকুম-আহকাম সম্পর্কীয়। অথচ শরী‘আতের মাসআলা মাসাইলের সংখ্যা লক্ষাধিক। তাই সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে যে, কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে মানুষের জীবনের খুঁটিনাটি সব কিছুর সমাধান সবিস্তার উল্লেখ করা হয়নি। বরং এখানে সামান্য কিছু হুকুম-আহকাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে আর বাকিগুলো মূলনীতি আকারে উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে। এই মূলনীতির আলোকে ইসলামী শরী‘আতের বড় বড় আলেমগণ যাদেরকে আমরা মুজতাহিদ বলে থাকি তারা মানুষের জীবনের খুঁটিনাটি সমস্ত সমস্যার সমাধান সবিস্তার সংকলন করে গেছেন। যারা সাধারণ  মুসলমান অর্থাৎ ইসলামী শরী‘আতের উৎস মূল কুরআন-সুন্নাহ পড়তে জানে না, পড়তে জানলেও অর্থ জানে না, অর্থ জানলেও মর্ম বোঝে না, মর্ম বুঝলেও কুরআন-সুন্নাহ থেকে গবেষণা করে মাসআলা-মাসায়েল বের করার যোগ্যতা রাখে না, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ হলো ‘তোমরা না জানলে যারা জানে তাদের কাছে জিজ্ঞেস করে নাও’। (সূরা: নাহল:৪৩, আম্বিয়া:৭ ) 

এককথায় বলা যায়, এমন মুসলমান যারা মুজতাহিদ নয় (সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ থেকে যে কোনো সমস্যার সমাধান বের করতে পারে না) তারা মুজতাহিদগণের অনুসরণ করে চলবে। এটাই আল্লাহ তা‘আলার হুকুম। আর এমন মুজতাহিদ যারা মানুষের জীবনের প্রায় সমস্ত অধ্যায়ের সমস্যার সমাধান সংকলন করেছেন তারা চারজন। ইমাম আবূ হানীফা রহ., ইমাম মালেক রহ., ইমাম শাফেয়ী রহ. ও ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ.। 

সাহাবা, তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনদের যুগে এই চারজন ছাড়া আরো অনেক মুজতাহিদ ছিলেন। কিন্তু তারা মানুষের জীবনের সমস্ত অধ্যায়ের সমাধান দিয়ে যাননি কিংবা তাদের সমাধানগুলি পরিপূর্ণরূপে সংকলিত ও সংরক্ষিত হয়নি। তাই এই চারজন মুজতাহিদ কুরআন-সুন্নাহর আলোকে মুসলমানদের জীবন পরিচালনার যে সবিস্তার সমাধান সংকলন করে গেছেন যাকে এককথায় আমরা মাযহাব বলে থাকি, মুসলমানরা আজ অবধি তাই অনুসরণ করে আসছে। এক পর্যায়ে মুসলিম উম্মাহর মাঝে এ ব্যাপারে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয় যে, যে কোনো মুসলমানের জন্য এই চার মাযহাবের যে কোনো একটি অনুসরণ করা জরুরী। চার মাযহাব মূলত ইসলাম নামক বৃক্ষে আরোহণের চারটি সোপান। যে কেউ এই চার মাযহাবের যে কোনো একটি অনুসরণ করবে, সে পরকালে অবশ্যই মুক্তি পাবে। ইনশাআল্লাহ।

এখানে একটি বিষয় জেনে রাখা উচিত যে, ইসলামের মূল বিষয় অর্থাৎ ঈমান-আকীদা ও ফরয হুকুম-আহকাম নিয়ে চার মাযহাবের মধ্যে কোনো মতানৈক্য নেই। এ ব্যাপারে চারো মাযহাব এক। আর কুরআন-সুন্নাহের মধ্যে যে-সব হুকুম স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে তাতেও কোনো মতানৈক্য নেই। এসব ক্ষেত্রে চারও মাযহাবের হুকুমই এক ও অভিন্ন। ইখতিলাফ বা মতের পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে কেবল শাখা-গত বিষয়ে এবং ঐসব মাসাইলের মধ্যে যা কুরআন-সুন্নাহ এর মধ্যে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়নি।
ইনশাআল্লাহ ধারাবাহিক আলোচনা চলবে

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.