🌹🌹🌹২.তাকবীরে তাহরীমার সময় নামাযীর হাত💐💐
২.তাকবীরে তাহরীমার সময় নামাযী তার হাত কতটুকু উপরে উঠাবে এ বিষয়ক কয়েকটি রেওয়ায়েত দেখুন।
ক.
عن ابن عمر ان رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يرفع يديه حذو منكبيه اذا افتتح الصلاة.
অর্থঃ হযরত ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজী ﷺ যখন নামায শুরু করতেন উভয় হাত কাঁধ বরাবর উঠাতেন।’ (বুখারী হা.৭৩৫, মুসলিম হা.২২,৩৯০)
জানা গেল, তাকবীরে তাহরীমার সময় মুসল্লী হাত কাঁধ বরাবর উঠাবে।
খ.
عن مالك بن حويرث قال: كان رسول الله صلى الله عليه وسلم اذا كبر رفع يديه حتى يحاذى بهما اذنيه- وفى رواية حتى يحاذى بهما فروع اذنيه.
অর্থঃ হযরত মালেক ইবনে হুওয়াইরিস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজী ﷺ যখন তাকবীরে তাহরীমা বলতেন, উভয় হাত কান বরাবর উঠাতেন। অন্য বর্ণনায় আছে, উভয় হাত কানের উপরের অংশ বরাবর উঠাতেন। (বুখারী হা.৭৩৭, মুসলিম হা.২৫,৩৯১)
এ হাদীস দ্বারা জানা যাচ্ছে, মুসল্লীগণ তাকবীরে তাহরীমার সময় হাত কান বরাবর উঠাবে। দুটি হাদীসই বুখারী, মুসলিমে এসেছে এবং বাহ্যত পরস্পর বিরোধী। সাহাবায়ে কেরামসহ যুগশ্রেষ্ঠ মুজতাহিদগণ দুই হাদীসের সমন্বয়ে বলেছেন, কাঁধ বরাবর হাত উঠানোর হাদীসটি মহিলা নামাযীর জন্য, এটা তাদের পর্দার বিধানের সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর কান বরাবর হাত উঠানোর হাদীসটি পুরুষ নামাযীর জন্য। তাদের গঠন প্রকৃতি হিসাবে এটাই মানানসই।
লক্ষ্য করুন, যদি এখানে পুরুষদের জন্য দ্বিতীয় হাদীসটি মা‘মূল বিহি বা আমলযোগ্য সাব্যস্ত করা হলো, কিন্তু তাদের এই আমলের মাধ্যমে প্রথম হাদীসের উপরও আমল হয়ে যাচ্ছে। কেননা কান পর্যন্ত হাত উঠাতে তো কাঁধ পর্যন্ত হাত তুলতেই হয়। আবূ দাউদ শরীফের একটি হাদীস যদিও তা বুখারী, মুসলিমের রেওয়ায়েতের সমতুল্য নয় কিন্তু উক্ত ব্যাখ্যাকে দারুনভাবে সমর্থন করছে।
عَنْ وائل بن حجر أَنَّهُ أَبْصَرَ النَّبِىَّ -صلى الله عليه وسلم- حِينَ قَامَ إِلَى الصَّلاَةِ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى كَانَتَا بِحِيَالِ مَنْكِبَيْهِ وَحَاذَى بِإِبْهَامَيْهِ أُذُنَيْهِ ثُمَّ كَبَّرَ.
অর্থঃ হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর রাযি. থেকে বর্ণিত তিনি নবিজী ﷺ কে দেখেছেন, যখন তিনি নামাযে দাঁড়াতেন দুই হাত এমনভাবে উঠাতেন যে, তা কাঁধ বরাবর হয়ে যেত আর তার বৃদ্ধাঙ্গুল দুটি কান বরাবর হয়ে যেত। তার পর তিনি তাকবীরে তাহরীমা বলতেন।’ (আবূ দাউদ হা.৭২৪)
এখন কেউ যদি আহলুল হাদীস বন্ধুদের কথামত কাঁধ বরাবর হাত তুলেন তাহলে স্বয়ং বুখারী, মুসলিমেরই এক হাদীসের উপর আমল করা হবে আর অপর হাদীস প্রত্যাখ্যাণ করা হবে। তাহলে বলুন, হাদীস মানতে হলে মাযহাব মানার কোনো বিকল্প আছে কি?
💌💌💌৩. তাকবীরে তাহরীমা বলার পর হাত বাঁধা💌💌💌💌💌
৩. তাকবীরে তাহরীমা বলার পর হাত কোথায় বাঁধবেঃ
দুটি হাদীস লক্ষ্য করুন,
ক. عن طاؤس قال: كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يضع يده اليمنى على اليسرى ثم يشد بهما على صدره وهو فى الصلاة.
অর্থ: হযরত তাউস রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজী ﷺ নামাযে ডান হাতকে বাঁ হাতের উপর রেখে বুকের উপর শক্ত করে বাঁধতেন।’ (আবূ দাউদ হা.৭৫৯) এ হাদীসকে সঠিক ধরা হলে, বাহ্যত মনে হয় তাকবীরে তাহরীমা বলার পর মুসল্লীদের হাত বুকের উপর থাকবে।
খ. عن علقمة بن وائل بن حجر عن ابيه قال رأيت النبى الله صلى الله عليه وسلم وضع يمينه على شماله فى الصلوة تحت السرة.
অর্থ: ‘হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর রাযি. বর্ণণা করেছেন, আমি নবীজীকে নামাযে ডান হাতকে বাঁ হাতের উপর নাভির নিচে বাঁধতে দেখেছি। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা:১/৩৪২)
গ. عن حجاج بن حسان قال سمعت ابا مجلز او قال سألته قال كيف يصنع؟ قال: يضع باطن كف يمينه على ظاهر كف شماله يجعلها اسفل من السرة.
অর্থ: ‘হযরত হাজ্জাজ ইবনে হাস্সান থেকে বর্ণিত, তিনি আবূ মিজলায থেকে শুনেছেন অথবা তাকে প্রশ্ন করেছেন, নামাযে হাত কীভাবে বাঁধতে হবে? তিনি বললেন, ডান হাতের তালু বাঁ হাতের পিঠের উপর নাভির নিচে রাখবে।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা হা.৩৯৪২)
ঘ. عن على قال ان من السنة فى الصلوة وضع الاكف على الاكف تحت السرة.
অর্থ: ‘হযরত আলী রাযি. বলেছেন, নামাযে নবীজীর সুন্নাত হলো, ডান হাতকে বাঁ হাতের উপর নাভির নিচে রাখা।’ (আবূ দাউদ হা.৭৫৬)
এই সকল হাদীসে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে যে, তাকবীরে তাহরীমার পর নামাযী হাত নাভির নিচে বাঁধবে। বাহ্যতঃ প্রথম হাদীস এবং পরবর্তী হাদীস তিনটি পরস্পর বিরোধী মনে হচ্ছে। কিন্তু একজন ফকীহ ও মুজতাহিদের সূক্ষ্মদর্শিতা সহজেই এর রহস্য ভেদ করতে সক্ষম। তারা এই দুই প্রকার হাদীসের সমন্বয় সাধনে বলেছেন, বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীসটি মহিলাদের জন্য প্রযোজ্য। কারণ এটা পর্দার অধিকতর নিকটবর্তী। আর দ্বিতীয় হাদীসটি পুরুষদের জন্য প্রযোজ্য, তাদের গঠন আকৃতির ভিত্তিতে এটাই মুনাসিব। তো এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে উভয় হাদীসের উপরই আমল হয়ে গেল। অথবা প্রথম হাদীসের ব্যাখ্যা হলো, শুধুমাত্র বৈধতা বুঝানোর জন্য নবীজী ﷺ কখনো কখনো বুকের উপর হাত বাঁধতেন। তবে তার আসল আমল ছিল নাভির নিচে হাত বাঁধা। যেটা দ্বিতীয় হাদীসে এবং হযরত আলী রাযি. ও আবূ মিজলাযের হাদীসে স্পষ্ট ভাবে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু আহলুল হাদীস বন্ধুদের কথা মত যদি শুধু বুকের উপর হাত রাখার হাদীসকে গ্রহণ করা হয়, তাহলে নাভির নিচে হাত বাঁধার হাদীসগুলো আমলবিহীন থেকে যাবে। বরং এ আমলটিকে একেবারে প্রত্যাখ্যান করা হবে। পক্ষান্তরে ফুকাহায়ে কেরামের মতটি গ্রহণ করলে, নবীজী ﷺ এর উভয় প্রকার আমলই যথাযোগ্য মর্যাদায় সংরক্ষিত রইল। এ হিসাবে প্রকৃত আহলুস সুন্নাহ হলো, ফুকাহায়ে কেরাম ও তাদের মাযহাব অনুসারীগণ।
❤❤❤৪. নামাযে সূরা ফাতিহা পড়ার বিধান❤❤❤❤❤
নিম্নের বর্ণনাগুলো লক্ষ্য করুনঃ
ক. عن عبادة بن الصامت قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لا صلوة لمن لم يقرأ بفاتحة الكتاب.
অর্থ: ‘হযরত উবাদা ইবনে সামেত রাযি. বলেন, নবীজী ﷺ ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি নামাযে সূরা ফাতিহা পড়বে না, তার নামায হবে না।’ (বুখারী হা. ৭৫৬, মুসলিম হা.৩৪,৩৯৪)
খ. عن ابى هريرة وقتادة: واذا قرأ فانصتوا.
অর্থঃ যখন ইমাম সূরা কিরাআত পড়ে তখন তোমরা চুপ থাক।’ (মুসলিম হা.৬৩,৪০৪)
গ.قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من كان له امام فقراءة الامام له قراءة .
অর্থ: নবীজী ﷺ ইরশাদ করেন, যে মুসল্লীর ইমাম রয়েছে তার ইমামের কিরাআতই তার কিরাআত।’ (মুআত্তা ইমাম মালেক হা.৬২,৬৩)
প্রথম হাদীস থেকে জানা গেল, নামায সহীহ হওয়ার জন্য সূরা ফাতিহা পড়া জরুরী। দ্বিতীয় হাদীস থেকে জানা গেল, ইমামের সূরা কিরাআত পড়াকালীন মুক্তাদিদের জন্য চুপ থাকাই হলো ইমামের অনুসরণ করা। তাহলে প্রথম হাদীসে বর্ণিত সূরা ফাতিহা পড়ার ব্যাপক বিধান থেকে দ্বিতীয় হাদীস দ্বারা মুক্তাদীর বিধান পৃথক হয়ে গেল। অর্থাৎ ইমামের পিছনে মুক্তাদীকে আর কিরাআত পড়তে হবে না। চাই তা সূরা ফাতিহা হোক বা অন্য কোনো সূরাই হোক। এ বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করে দিয়েছে তৃতীয় হাদীসটি । যেখানে বলা হয়েছে, যার ইমাম আছে ইমামের কিরাআতই তার কিরাআত বলে গণ্য হবে। আর যেহেতু সূরা ফাতিহাও কিরাআতের অর্ন্তভুক্ত তাই তাকে আর আলাদা করে সূরা ফাতিহাও পড়তে হবে না। বরং ইমামের ফাতিহাই তার জন্য যথেষ্ট হবে। হাদীস অনুসরণের দাবীদার বন্ধুরা শুধুমাত্র প্রথম হাদীসটি গ্রহণ করে ইমাম মুক্তাদী সকলের জন্য সূরা ফাতিহা পড়া বাধ্যতামূলক ঘোষণা করেছেন। আর অপর দুই হাদীসকে বিলকুল ছেড়ে দিয়েছেন। এটা হাদীসের প্রতি অবজ্ঞা, দায়িত্বহীনতা ও উদাসীনতার প্রমাণ বহন করে। পক্ষান্তরে মাযহাবের ইমামগণ নবীজী ﷺ এর প্রতিটি আমল সংরক্ষণের চেষ্টা করেছেন। তারা চেয়েছেন, একান্ত জাল ও বানোয়াট না হলে বাহ্য বিরোধপূর্ণ হাদীসগুলো দুর্বলসূত্রে বর্ণিত হলেও সেগুলোর মধ্যে এমনভাবে সমন্বয় সাধন করা যাতে কোনো না কোনো পর্যায়ে সকল হাদীসই উম্মতের মধ্যে কার্যতঃ যিন্দা থাকে। আল্লাহ প্রদত্ত মাকবূলিয়্যাতের ফলে তারা সেই চেষ্টায় সফলও হয়েছেন। আর উম্মতে মুসলিমাও তাদের কথা বিনা বাক্যব্যয়ে গ্রহণ করছেন।
🌿🌿🌿🌿৫. সূরা ফাতিহা শেষে আমীন বলার পদ্ধতি🌿🌿🌿🌿
ক. عن وائل بن حجر قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم قرأ غير المغضوب عليهم ولا الضالين فقال امين ومد بها صوته.
অর্থ: ‘হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি নবীজী ﷺ কে غير المغضوب عليهم ولا الضالين পড়তে শুনেছি। তারপর তিনি আমীন বলেছেন। আর শব্দটিকে তিনি টেনে দীর্ঘ করে বলেছেন। (তিরমিযী হা.২৪৮, আবূ দাউদ হা.৯৩২)
এই হাদীস থেকে কেউ কেউ উচ্চ স্বরে আমীন বলার বিধান বের করেছেন। যদিও “মাদ্দা” শব্দের অর্থ উচ্চ আওয়াজ নয়। বরং এর অর্থ হলো, দীর্ঘ স্বরে টেনে পড়া।
খ.عن علقمة بن وائل عن ابيه انه صلى مع رسول الله صلى الله عليه وسلم حين قال غير المغضوب عليهم ولا الضالين قال امين يخفض بها صوته.
সেই পূর্বোক্ত সাহাবী হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর রাযি. থেকে বর্ণিত তিনি নবীজী ﷺ এর সঙ্গে নামায আদায় করলেন, নবীজী ﷺ যখন غير المغضوب عليهم ولا الضالين পড়লেন, তখন অনুচ্চ স্বরে আমীন বললেন। (মুসতাদরাকে হাকেম হা.২৯১৩)
পূর্বোক্ত দুটি হাদীসই হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর রাযি. থেকে বর্ণিত। প্রথম হাদীসে তিনি দীর্ঘ স্বরে আমীন বলার কথা উল্লেখ করেছেন। আর দ্বিতীয় হাদীসে তা অনুচ্চস্বরে বলার বর্ণনা দিয়েছেন। এই উভয় বর্ণনা মিলে অর্থ দাঁড়ালো, নবীজী ﷺ আমীন শব্দটিকে দীর্ঘ স্বরে অনুচ্চ আওয়াজে পড়তেন। আর এই উভয় কথার মধ্যে কোনো সংঘর্ষ নেই। কারণ একটি শব্দকে অনুচ্চ আওয়াযে টেনে পড়া বিলকুল সম্ভব। এটাই হানাফীদের আমল। তারা আমীনকে অনুচ্চ স্বরে টেনে টেনে পড়েন। আর যদি মাদ্দা এর অর্থ উচ্চ স্বর বলা হয়, যেমনটি আহলুল হাদীস ভাইয়েরা বুঝেছেন, তাহলে উভয় হাদীসের মধ্যে সমন্বয় এভাবে হবে যে, নবীজী ﷺ উম্মতকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য সূরা ফাতিহার শেষে কখনো কখনো হালকা আওয়াজে আমীন পড়েছেন। এটাই ফুকাহাদের ব্যাখ্যা যা যুক্তিগ্রাহ্য।
কিন্তু আহলে হাদীস ভাইদের মতানুযায়ী যদি সজোরে আমীন বলার হাদীস গ্রহণ করা হয়, তাহলে আস্তে আমীন বলার হাদীস যেটা নবীজী ﷺ এর স্থায়ী আমল ছিল তাকে ছেড়ে দিতে হচ্ছে। ফলে হাদীসের আংশিক মেনে বাকিগুলোকে অস্বীকার করা হয়। এটাতো হাদীস মানা নয়। হাদীস মানার নামে হাদীস নিয়ে তামাশার নামান্তর এবং অসংখ্য হাদীস অস্বীকার করে দ্বীন ও ঈমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জঘন্য পথ অবলম্বন। এ ধ্বংসাত্মক পথ থেকে আল্লাহ তা‘আলা মুসলমানদেরকে হেফাযত করুন। আমীন।
ইনশা আল্লাহ ধারাবাহিক আলোচনা চলবে 🌿🌿🌿🌿🌿