__________________________
শিরোনাম বলে দিচ্ছে দু'টি পরিভাষা - হাদিস ও সুন্নাহ। এ দু'টি টার্ম হাদিস শাস্ত্রের খুব প্রাথমিক লেভেলের ও প্রসিদ্ধ দু'টি নাম। আশাকরি, সকলের মৌলিকভাব এ নিয়ে মোটামুটি জানাশোনা আছে।
তদুপরি, মূল বিষয়টি ফুটিয়ে তুলার সুবিধার্থে আমি প্রথমে হাদিস ও সুন্নাহ এর মাঝে মৌলিক পার্থক্য তুলে ধরছি -
→ হাদীস
রাসূল সাঃ এর প্রতিটা কথা, কাজ ও মৌন স্বীকৃতিকে হাদীস বলে। হাদিসের মৌলিক দু'টা বৈশিষ্ট্য -
১. চাই সেটা রাসূল সাঃ এএ জন্য একক নির্দিষ্ট বিষয় হোক ( যেমনঃ একাধীক বিবাহ) কিংবা উম্মাহের জন্য পালনীয় বিষয় হোক।
২. চাই সেটা মানসুখ ( রহিত হুকুম) বিষয় হোক, কিংবা নাই হোক। সবগুলাকে হাদীস বলে।
→ সুন্নাহ
রাসূল সাঃ এর প্রতিটা কথা, কাজ ও মৌন স্বীকৃতিকে সুন্নাহ বলে। তবে সুন্নাহের ভিন্ন দু'টা মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে -
১. এমন বিষয় হতে হবে, যা রাসূল সাঃ এর জন্য নির্দিষ্ট ছিলো না, বরং উম্মাহের জন্য পালনীয়ও ছিলো।
২. এমন বিষয় হতে হবে, যা রাসূল সাঃ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার উপর আমল করে গিয়েছেন। অর্থাৎ, এমন বিষয় হলে হবে না, যা রাসূল সাঃ প্রথমে আমল করেছেন, পরে আবার বাদ দিয়ে দিয়েছেন। এক কথায়, বিষয়টা মানসুখ ( রহিত হুকুম) হতে পারবে না৷
মোদ্দাকথায়, উপরের আলোচনা থেকে আমরা দু'টা বিষয় জানতে ও বুঝতে পারলাম -
১. হাদিস ও সুন্নাহ প্রায় একই । তবে সকল হাদিস উম্মাহের জন্য পালনীয় না। তবে প্রত্যেক সুন্নাহ উম্মাহের জন্য পালনীয়।
২. প্রত্যেক সুন্নাহই হাদীস, তবে প্রত্যেক হাদিস সুন্নাহ নয়। হাদিস হবে আ'ম ( ব্যাপক) আর সুন্নাহ হবে খাস ( নির্দিষ্ট) বিষয় ৷
এবার চলে আসি মূল কথায় -
অত্যন্ত সম্মানের সাথে আমাদের দেশের শ্রদ্ধেয় ' আহলে হাদীস ' মতাদর্শী ভাইদের প্রসঙ্গে বলছি। তাঁরা নিজেদেরকে ' আহলুল হাদীস ' নামে ভূষিত করতে পছন্দ করেন৷ কারণ, তাদের দাবী -
" তারা সর্বক্ষেত্রে রাসূল সাঃ এর বিশুদ্ধ হাদীসের উপর আমল ও পালন করেন। সে'জন্য তাঁরা আহলুল হাদীস "
বিষয়টি চমৎকার ! মোটেও খারাপ কোন দিক না। তবে ছোট্ট একটা জায়গায় খটকা লেগে যায়। আমরা উপরের বিশুদ্ধ আলোচনা থেকে জেনেছি যে, রাসূল সাঃ এর প্রতিটা হাদিস আমাদের জন্য পালনীয় নয় ; বরং প্রত্যেকটা সুন্নাহ পালনীয় ।
যেমনঃ - দু'টা উদাহরণ দেই
১. ইফতার না করে ধারাবাহিক রোজা রাখা। এটাও একটা হাদিস ; তবে সুন্নাহ নয়। কারণ, এটা রাসূল সাঃ এর জন্য খাস ছিলো৷ উম্মাহের জন্য বৈধ নয়।
২. চারের অধিক বিবাহ করা। এটাও হাদিস ; তবে সুন্নাহ নয়। কারণ, চারের অধিক বিবাহ কেবল রাসূল সাঃ এর জন্য খাস ছিলো। উম্মাহের জন্য বৈধ নয়৷
আশাকরি এবার স্বাবলীল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও অকাট্য যুক্তি থেকে বুঝতে পেরেছেন যে, যে কোন মুসলিম সকল ' সুন্নাহ ' পালন করতে পারে। তবে সকল ' হাদিস ' পালন করতে পারে না ৷ অতএব, একজন মূমীন-মুসলমান সকল সুন্নাহ পালনের বৈধতা নিয়ে সে " আহলুস সুন্নাহ " হতে পারে , তবে " আহলুল হাদীস " হতে পারে না ৷ যেহেতু, রাসূল সাঃ এর সকল হাদিস উম্মাহের জন্য পালনীয় না৷
(( মুহাদ্দিসীনদেরকেও আহলুল হাদিস বলা হয়, তবে তারা হাদীসের পারদর্শী হিসেবে ; আমলকারী হিসেবে নয়। তারা রাসূলের হাদিস-সুন্নাহ সব নিয়ে গবেষণা করতেন। তাই তাদেরকে আহলুল হাদিস বলা হয় ))
আসুন ! এবার জেনে নেই যে, রাসূল সাঃ হাদিস পালনে নাকি সুন্নাহ পালনে উৎসাহিত করেছেন -
১. মুসলিম শরীফের হাদিস, রাসূল সাঃ এরশাদ করেন - " তোমরা যদি তোমাদের নবীর সুন্নাহ তরক করো, তাহলে নিশ্চিত গোমরাহ হবে " ( মুসলিমঃ২৫৭)
২. আয়েশা রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূল সাঃ এরশাদ করেন - " ছয় ব্যক্তির উপর আমি লা'নত করেছি। আল্লাহ তা'লা ও সকল সকল নবী লা'নত করেছেন। তন্মধ্যে এক শ্রেণী হলো - যারা আমার সুন্নাহকে তরক করে। " ( তিরমিজীঃ ২১৪৫)
৩. রাসূল সাঃ বলেন - " তোমরা আমার সুন্নাহ ও খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহকে আকড়ে ধরো। " ( আবু দাউদঃ ৪৬০৭)
৪. রাসূল সাঃ বলেন - " যে আমার সুন্নাহকে পুনর্জীবিত করলো, সে আমাকে মহব্বত করলো। আর যে আমাকে মহব্বত করলো, সে আমার সাথে জান্নাতে থাকবে।" ( তিরমিজিঃ ২৬৭৮)
৫. রাসূল সাঃ বলেন - " উম্মাহের বিপর্যয়ের সময় যে আমার সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরবে, সে একজন শহীদের সওয়াব পাবে। " ( মুজমা'উল আওয়াসাতঃ ৫৪১৪)
৬. রাসূল সাঃ বলেন - " সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে রাখা বিদ'আত উদ্ভাবন করা থেকে উত্তম। " ( মুসনাদে আহমাদঃ ৫/২০২)
৭. রাসূল সাঃ বলেন - " আমার মৃত্যুর পর, যে আমার কোন সুন্নাহকে পুনর্জীবিত করবে আর ঐ সুন্নাহের উপর যারা আমল করবে, সে তাদের সম পরিমাণ সওয়াব পাবে। " ( তিরমিজিঃ ২৬৭৭)
প্রিয় পাঠক,
আরো অসংখ্য-অগণিত হাদীস আছে, যেখানে রাসূল সাঃ সুন্নাহ পালনে ও আঁকড়ে ধরতে উৎসাহিত করেছেন। যেহেতু সকল হাদীস আমাদের জন্য পালনীয় না ; তাই আমাদের জন্য " আহলুল হাদীস " বলা এতোটা মানায় না । বরং " আহলুস সুন্নাহ " বলা একদম যুৎসই ও যথাযথ । কারণ, আমরা সকল সুন্নাহ মানতে বাধ্য৷
শেষ করছি একটা কথা দিয়ে, রাসূল সাঃ এর বিশুদ্ধ হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, এই উম্মাহ তেহাত্তর দলে বিভক্ত হবে। তবে একটা দল কেবল জান্নাতে যাবে৷ আর তা হলো - যারা আহলুস সুন্নাহ ছিলো।
চলুন, আমরাও সকল চিন্তা-মতাদর্শের উর্ধে গিয়ে - আহলুস সুন্নাহ হই। নাজাত প্রাপ্ত দলের অন্তর্ভুক্ত হই। আল্লাহ তা'লা সবাইকে সঠিক আহলুস সুন্নাহ এর মতাদর্শি হওয়ার তাওফীক দান করুক !
ওয়াল্লাহু আ'লাম বিস-সাওয়াব!
.
আব্দুল কারীম আল-মাদানী
ইসলামীক আইন ও বিচার বিভাগ,
মদীনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব।