🕋🕋🕋🕋🕋🕋🕋🕋🕋🕋🕋🕋
কখনো এমন হয় যে, ফিকহ সংকলনকারীগণ তাদের কিতাবে যে হাদীস উল্লেখ করেন তা স্বয়ং ইমামের দলীল। কিন্তু কোন মুহাদ্দিস হাদীসটিকে শুধুমাত্র পরবর্তী যামানায় লিখিত হাদীসের কিতাব যেমন সিহাহ, সুনান, মাসানিদ ও মাআজিমে তালাশ করে হাদীসের কিতাবাদির সনদের ভিত্তিতে হাদীসটিকে অপ্রামাণ্য মনে করেন।
সুতরাং যে ব্যক্তি ফিকহের হাদীসসমূহকে শুধুমাত্র পরবর্তীকালে সংকলিত হাদীসের গ্রন্থসমূহে তালাশ করেন, তিনি হাদীসের সনদে দুর্বলতা দেখে হাদীসকে যঈফ সাব্যস্ত করেন এবং ইমামের উপর অপবাদ দেন, অকথ্য ভাষায় কটূক্তি করেন।
আর যে ব্যক্তি ইনসাফের সাথে নিরপেক্ষভাবে হাদীস অনুসন্ধান করেন এবং মুহাদ্দিসগণের কিতাবের পাশাপাশি ইমামগণের নিজস্ব কিতাবেও সমান দৃষ্টি রাখেন, তিনি হাদীসটিকে সহীহ সনদে পেয়ে যান। এভাবে তিনি প্রকৃত বিষয়টি উপলদ্ধি করতে পারেন এবং ইমামগণ যে বাস্তবেই আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে হেদায়াতপ্রাপ্ত ও সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত আর তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীরা যে পথভ্রষ্ট, এ বিশ্বাস অন্তরে আরও বদ্ধমূল হয়ে যায়।
একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা হলঃ হেদায়া কিতাবের গ্রন্থকার তার কিতাবে "ادرئوا الحدود بالشبهات"এই হাদীসটি মারফু হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
হাদীসটি যায়লাঈ রহ. নসবুর রায়াতে তাখরীজ করেছেন যে, এটি মওকূফ; হযরত উমর রাযি. এর উক্তি, কিন্তু সনদে বিছিন্নতা রয়েছে। হযরত মুআয রাযি. হযরত ইবনে মাসঊদ রাযি. এবং হযরত উকবা ইবনে আমের রাযি.এ তিন সাহাবীরও উক্তি এটি। কিন্তু সনদে ইবনু আবী ফারওয়া রয়েছেন, আর তিনি মাতরূক তথা পরিত্যক্ত। এটি ইমাম যুহরী রহ.এরও উক্তি। তবে তিনি যেহেতু তাবিঈ তাই তার উক্তি দলীল হতে পারে না। ইবনে হাযম রহ. হাদীসটিকে মারফূ হিসেবে না পেয়ে মুহাল্লাতেই হাদীস সম্পর্কে এবং যে সকল ফকীহগণ এটিকে দলীলরূপে গ্রহণ করেছেন তাদের ব্যাপারে অনেক রূঢ় শব্দ উচ্চারণ করেছেন, তার কলম ও যবান নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে, যেমনটি তার সাধারণ অভ্যাস। (আল্লাহ তা‘আলা হিফাযতকারী)
বিশিষ্ট মুহাক্কিক ইবনুল হুমাম রহ. ‘ফাতহুল কাদীর’ এ ইবনে হাযমের বক্তব্যকে খণ্ডন করেছেন এবং ادرؤاالحدود بالشبهات এর অর্থ বুখারী, মুসলিমের কয়েকটি হাদীস থেকে প্রমাণ করেছেন। তিনি বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবা রা. এর বর্ণনা তালাশ করলে এ হাদীসের সত্যতা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়। যেমন আমরা জানি, হযরত মায়েজ রাযি. যিনি ব্যভিচারের কথা স্বীকার করেছিলেন, তাকে নবী কারীম ﷺ বলেছিলেন: হয়ত তুমি চুম্বন করেছ বা স্পর্শ করেছ, বা মর্দন করেছ। নবীজী ﷺ তাকে এসব বলেছেন যেন সে এর কোন একটিকে স্বীকার করে নেয়, যেন তাকে ছেড়ে দেওয়া যায়। অন্যথায় এ কথাগুলো বলার কোন অর্থ নেই।
হদ (শরী‘আত নির্ধারিত দণ্ড) ছাড়া অন্য কোথাও এর প্রমাণ নেই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কোন ব্যক্তি কোন অপরাধ যথা ঋণখেলাপীর কথা স্বীকার করেছে, আর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে বলেছেন, “হয়ত তোমার কাছে তা আমানত ছিল, পরে নষ্ট হয়ে গিয়েছে” বা এ জাতীয় কোন কৌশল শিখিয়েছেন যাতে সে তার স্বীকারোক্তি থেকে ফিরে আসে। অতএব, এটা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হলো যে, যথা সম্ভব ‘হদ’ যেন প্রমাণিত না হয় সেই চেষ্টা করতে হবে। তারপরও শরী‘আতে অত্যাবশ্যকীয় এ শাশ্বত বিধান সম্পর্কে সংশয় পোষণ করা শরী‘আতের কোন অকাট্য প্রমাণিত বিষয়ে সংশয় পোষণ করারই নামান্তর।
তাছাড়া এই হাদীসটি ইমাম আবূ হানীফা রহ. নিজ সনদে তার মুসনাদের কিতাবুল হুদূদের চার নাম্বারে বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি আবূ হানীফা মিকসাম এর সূত্রে হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেছেন। উক্ত সনদের রাবী মিকসামের অবস্থা নিম্নরূপঃ
ইমাম আহমাদ ইবনু সালেহ আল মিসরী (যিনি মিসরের তৎকালীন ইমাম ছিলেন) ইজলী, ইয়াকুব ইবনে সুফিয়ান এবং ইমাম দারাকুতনী এই ইমামত্রয় মিকসামকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন, আর ইবনে আব্বাস রাযি. তো নিজেই নিজের তুলনা, এই সনদ ছাড়া হাদীসটির আর কোন মারফু’ সহীহ সনদ নেই। এর থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, ইমামগণেরও নিজস্ব সনদ রয়েছে এবং ফিকহের কিতাবের হাদীস তাখরীজ করার ক্ষেত্রে সম্ভব হলে তাদের নিজস্ব কিতাবাদি থেকেই তাখরীজ করতে হবে। কিন্তু পরবর্তী মুহাদ্দিসগণের তাখরীজকে ইমামগণের বর্ণনা যাচাইয়ের চূড়ান্ত মানদণ্ড নির্ধারণ করা যাবে না এবং তাদের তাখরীজের উপর নির্ভর করে ইমামদের মাযহাবকে দুর্বল ভাবা যাবে না।
তাখরীজের এই পদ্ধতিটি গ্রহণ করেই আল্লামা কাসেম ইবনে কুতলুবুগা রহ. ‘মুনয়াতুল আলমাঈ’ নামক কিতাবে ঐ সকল হাদীসের সনদ দেখিয়েছেন, যেগুলো যাইলাঈ রহ. নাসবুর রায়াতে এবং ইবনে হাজার রহ, দেরায়াহতে পাননি বলে উল্লেখ করেছেন, যেগুলোর সনদ তিনি ফিকহে হানাফির মৌলিক উৎস তথা হানাফি ইমামগণের রচিত হাদীসও ফিকহের কিতাবাদি থেকে উদ্ধার করেছেন।
ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ রহ., ও রফউল মালাম কিতাবে এই বিষয়টির প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করে বলেনঃ ‘হাদীসের কিতাবসমূহ সংকলনের পূর্বের ইমামগণ পরবর্তীদের তুলনায় সুন্নাহর ব্যাপারে অনেক বেশি অবগত ছিলেন, কেননা অনেক হাদীস যা তাদের কাছে সহীহ সনদে পোঁছেছে সেগুলোই আমাদের কাছে মাজহুল তথা অপরিচিত রাবীর মাধ্যমে পোঁছেছে বা মুনকাতি তথা বিচ্ছিন্ন সনদে পোঁছেছে বা একেবারেই পোঁছেনি।’
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. কথা ‘একেবারেই পোঁছেনি’ ইবনে হাজার রহ. এর কথার সাথে একেবারে মিলে যায়, ইবনে হাজার রহ, কে প্রশ্ন করা হয়েছে যে, ঐ সকল হাদীস যেগুলো দ্বারা শাফিঈ মাযহাবের ইমামগণ এবং হানাফী মাযহাবের ইমামগণ তাদের ফিকহের কিতাবাদিতে দলীল দিয়ে থাকেন তার অধিকাংশই হাদিসের কিতাবসমূহে পাওয়া যায় না, এর কারণ কী?
তিনি উত্তর দিলেন, হাদীসের অনেক কিতাব বা অধিকাংশ কিতাব তাতারি ফেতনার সময় নষ্ট হয়ে গেছে, হয়তো ঐ হাদীসগুলো তাতেই তাখরীজ করা ছিল, কিন্তু তা আমাদের কাছে পৌঁছেনি।
এ কারণেই যারা কোন কিতাবের হাদীস তাখরীজ করেছেন, যথা যাইলাঈ রহ., ইরাকী রহ., ইবনুল মুলাক্কীন রহ. এবং ইবনে হাজার রহ. তারা কোন হাদীস না পেলে কারো উপর দোষ না চাপিয়ে খুবই সতর্কতার সাথে বলেছেন যে, এ হাদীসটি আমি পাই নি, এ কথা বলেন নি যে, এটা পাওয়া যায় না বা এর কোন ভিত্তি নেই।
🌻🌻🌻🌻🌻🌻🌷🍀🍀
ইনশা আল্লাহ ধারাবাহিক আলোচনা চলবে 🍀🌷🌷🌷🌷🌷🌷🌷