অভিযোগের অসারতা প্রমাণের ১ম ধারা, পর্ব-২২

🕋🕋🕋অভিযোগের অসারতা প্রমাণের ১ম ধারা🍀🌿🌻🌻🌻🌻🌻🌷🌷
আমরা এখানে চারটি ধারায় এই অভিযোগের অসারতা প্রমাণ করবো ইনশাআল্লাহঃ

১ম ধারাঃ
চার মাযহাবের মুজতাহিদ ইমামগণের পরবর্তীকালে যে সকল ফুকাহায়ে কেরাম উক্ত মাযহাব সমূহের উপর কিতাবাদী রচনা করেছেন, তাতে মাসআলার সমর্থনে যে সমস্ত হাদীস উল্লেখ করা হয়, সে হাদীসগুলো মূলত হুবহু ঐ দলীল নয়, যার উপর স্বয়ং ইমামগণ মাসআলা ইস্তিম্বাতের ক্ষেত্রে নির্ভর করেছেন। 

হ্যাঁ, অনেক সময় সংকলনকারীগণ-ইমাম যে দলীলের উপর ভিত্তি করে মাসআলা বর্ণনা করেছেন-সে দলীলই উল্লেখ করেন, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, তিনি যেসব হাদীস উল্লেখ করেন তার সবই ইমামগণের প্রধান দলীল এবং ইমামগণ কর্তৃকই নির্বাচিত।

আসল কথা হল, ফিকহের কিতাবাদিতে মূল মাসআলা সমূহ তো প্রত্যেক মাযহাবের ইমামগণেরই সংকলন করা, কিন্তু মাসআলাগুলোর সমর্থনে যে দলীল উল্লেখ করা হয়, তা অধিকাংশ সময়ই ইমামগণ কর্তৃক বর্ণিত তাদের নিজস্ব দলীল নয়, বরং সংকলনকারী কিতাব সংকলন করতে গিয়ে মাসআলার সমর্থনে নিজের অনুসন্ধানে যে হাদীস পেয়েছেন, তাই তিনি উল্লেখ করেছেন। আহলে ইলমগণ তো বুঝতেই পারছেন যে, তা ইমামের মূল দলীল নয়, বরং ইমামের নিকট অন্য কোন হাদীস ছিল, যার উপর ভিত্তি করে তিনি মাসআলা বের করেছেন। 

সুতরাং পরবর্তীতে সংকলিত কিতাবাদিতে কোন হাদীসের মধ্যে দুর্বলতা পাওয়া গেলে তার দায়ভার ইমামের উপর বর্তাবে না এবং এর দ্বারা মাসআলার দুর্বলতা প্রমাণিত হওয়ারও কোন সুযোগ নেই, কারণ, মাসআলার ভিত্তি হিসেবে ইমাম সাহেবের নিকট অন্য কোন মজবুত দলীল ছিল অথবা তার পরবর্তী যমানায় যঈফ রাবী যুক্ত হয়েছে। এ জাতীয় যঈফ হাদীসের কারণে কোন ইমাম ও তার মাযহাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা ইনসাফপূর্ণ আচরণ নয়।

এ নীতিটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ হয় হানাফী মাযহাবের ক্ষেত্রে। কেননা ইমাম আবূ হানীফা রহ. নিজে তার ফিকহের দলীল নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংকলন করে যাননি। ইমাম মালেক ও ইমাম আহমাদ রহ. ও নিজেদের ফিকহ ও দলীল সংকলন করে যাননি। আর ইমাম শাফেঈ রহ. তার ‘কিতাবুল উম্ম’ এ নিজের কিছু ফিকহ ও দলীল সংকলন করেছেন বটে, কিন্তু সমুদয় দলীল সংকলন করেননি।

অতএব, যে হাদীস আমরা হানাফী মাযহাবের ‘হেদায়া’ কিতাবে, মালেকী মাযহাবের ‘আর রিসালা’ তে, শাফেঈ মাযহাবের ‘মুহাযযাবে’ এবং হাম্বলী মাযহাবের ‘আল মুগনী’ তে পাই, এগুলোর অধিকাংশ হাদীসই ঐ মাযহাবের ইমামের মূল দলীল নয়। 

এই মূলনীতিটি জানা না থাকার কারণে আহলে হাদীসের কোন কোন আলেম হানাফী মাযহাবের ফিক্বহের কিতাব ‘হেদায়া’তে বর্ণিত মাসআলা সংক্রান্ত হাদীসসমূহের উদ্ধৃতি দিতে গিয়ে ইমাম আবূ হানীফা রহ. ও তাঁর মাযহাবের ব্যাপারে অনেক আপত্তিকর ও অবান্তর কথার অবতারণা করেছেন।

তারা হেদায়া এর হাদীস ‘তাখরীজ’ (সূত্র উল্লেখ) করতে গিয়ে যখন দেখলেন যে, মুহাদ্দিসগণ এই কিতাবে উল্লেখিত অনেক হাদীসকে ‘যঈফ’ ‘মাওযু’ ‘গাইরে মারফু’ ইত্যাদি সাব্যস্ত করেছেন, তখন তারা সেই হাদীসগুলোকে মাযহাবের স্বয়ং ইমাম কর্তৃক উদ্ধৃত দলীল মনে করে ইমাম আবূ হানীফা রহ. ও তার মাযহাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ আরোপ করে বলেনঃ আল্লাহ তা‘আলার শরী‘আতের বিষয়ে আবূ হানীফা রহ.কে কীভাবে আমরা ইমাম ও মুজতাহিদ হিসেবে মানব? অথচ তিনি ‘মওযু’ হাদীস দিয়ে দলীল দিয়ে থাকেন। ‘মওকুফ’ ও ‘মাকতু’ (অর্থাৎ সাহাবীকর্তৃক বর্ণিত কথা বা সনদে বিচ্ছিন্নতা) হওয়া সত্ত্বেও তাকে রাসূলের হাদীস বলে দেন। 

মূলত উক্ত বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞতাই তাদেরকে এ ভুল ধারণায় নিমজ্জিত করেছে।

সংকলনকারীগণ যে নিজের পক্ষ থেকেই মাসআলার সমর্থনে দলীল উল্লেখ করে থাকেন, এই কথার দু‘টি দলীল আমি উল্লেখ করছি। 

১ম দলীলঃ
ইমাম ইবনুস সালাহ রহ. বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোন হাদীসের উপর আমল করতে চায় বা কোন মাযহাবের ইমামের মাসআলার সমর্থনে হাদীস দ্বারা দলীল দিতে চায় এবং সে এ বিষয়ে পারদর্শীও হয়, তাহলে এর সঠিক পদ্ধতি হলো, সে তার কপিটিকে কিতাবের মূল কপির সাথে মিলিয়ে দেখবে, চাই মূল কপিটির সাথে সে নিজে মিলিয়ে নিক বা অন্য কোন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি মিলাক।’ (মুকাদ্দামাতু ইবনিস সালাহ পৃ. ২৫)

ইমাম ইবনুস সালাহ এর উক্তিঃ ‘কোন মাযহাবের ইমামের মাসআলার সমর্থনে হাদীস দিয়ে দলীল দিতে চায় এবং সে এ বিষয়ে পারদর্শীও হয়’ এর দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, সংকলনকারীগণ নিজের থেকে মাসআলার সমর্থনে হাদীস উল্লেখ করে থাকেন।

২য় দলীলঃ
ইবনুল কায়্যিম রহ. তার কিতাব বাদায়িউল ফাওয়াইদ এর প্রথম ফায়দাতে বলেনঃ لاشفعة لنصرانى অর্থাৎ: কোনো খ্রিস্টানের জন্য শুফআ [তথা পার্শ্ববর্তিতার সূত্রে জমিক্রয়ে অগ্রাধিকার লাভ] এর হক নেই এই হাদীস দ্বারা জনৈক আলেম ইমাম আহমাদ রহ. এর মাযহাবের দলীল দিয়েছেন। আর ইমাম আহমাদ রহ. ভালো করেই জানতেন যে, এর দ্বারা দলীল দেয়া যাবে না। কেননা এটি একজন তাবেঈর উক্তি মাত্র। অথচ হাম্বলী মাযহাবের ইমাম ইবনে কুদামা রহ. তার কিতাব আল মুগনীতে এর দ্বারা দলীল দিয়েছেন এবং এটিকে দারাকুতনীর ইলাল কিতাবের সূত্রে হযরত আনাস রাযি. বর্ণিত মারফূ হাদীস সাব্যস্ত করেছেন। অপরদিকে বাইহাকী রহ. তার সুনানে দৃঢ়তার সাথে বলেছেন যে, এটি হাসান বসরীর উক্তি, মারফূ হাদীস নয়। (আসারুল হাদীসিশ শরীফ পৃ.২১০)

এখানে ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এর উক্তি ‘এই হাদীস দ্বারা জনৈক আলেম ইমাম আহমাদ রহ. এর মাযহাবের দলীল দিয়েছেন’। এর দ্বারা স্পষ্ট হয় যে, সংকলনকারীগণ মাসআলার সমর্থনে অনেক হাদীস নিজের অনুসন্ধান অনুযায়ী উল্লেখ করে থাকেন। অতএব পরবর্তী কিতাবগুলোর কোন হাদীসে দুর্বলতা পাওয়া গেলে ইমামকে বা তার মাযহাবকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে না, বরং সেটাকে বর্ণনাকারীর ত্র”টি সাব্যস্ত করতে হবে।

🌻🌿🌿🌿🌹

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.