সালাফিজম: একাল সেকাল

 সালাফিজম: একাল সেকাল

-----------------------

বর্তমান যুগে আমাদের আহলে হাদিস ভাইয়েরা অনেকটা সুবিধাবাদীর মত। যেখানে তাদের মতবাদ বিপরীত যেই দল আছে সেখানে তারা এর বিরোধী হয়ে থাকে। যেমন তিউনিসিয়ায় মালিকী মাযহাব চলে। ওখানে তারা মালিকী মাযহাব ও এর ফকিহগণকে নিয়ে বিষোদগার করে। রাশিয়ায় তারা শাফিঈ মতালম্বীদের নিয়ে কদর্যতা করে। এই উপমহাদেশে যেহেতু হানাফী মাযহাব চালু আছে এবং এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে তাসাওউফের চর্চা বেশি এখানে তারা হানাফী মাযহাব, পীর-আওলিয়া, তাসাওউফ ইত্যাদি নিয়ে বেশ বাড়াবাড়ি করে। বিশেষত দেওবন্দীরা যেহেতু একনিষ্ঠ হানাফী এবং এর ধারক-বাহক, সাথে সাথে তাসাওউফেরও কর্ণধারিত্বের শীর্ষ ভূমিকা পালন করছে তাই তারা দেওবন্দীর ওপর বেশি চড়াও হয়ে থাকে।

২.

তাসাওউফ, সুফী, ওলী-আওলিয়া, কাশফ-এলহাম ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে তারা খুব ট্রল করে। কাশফকে তো নর্দমার জীবাণু মনে করে। অথচ কাশফের ব্যাপারে শরীয়ত কী বলে? যে কাশফ কোন দলিল নয়, এটি কেবল সাহেবে কাশফের জন্য একটি মর্যাদা ও বিশেষত্ব। কিন্তু দলিল নয়- এ কথাটাকেও তারা একেবারে বেশি ব্যাপক করে ফেলেছে। বিষয়টা সুন্দর করে ক্লিয়ার করেছেন আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশমীরী রহ.। তিনি বলেছেন, কাশফ দলিল নয় মানে হালাল-হারাম, জায়েয-নাজায়েয, সুন্নত-মুস্তাহাব ও অপরাধী প্রমাণের ক্ষেত্রে দলিল নয়। এছাড়া বাকী বিষয়ে যন্নী বুরহান বা দলিলুত তারজীহ হতে পারে।

{মাআরিফুল কুরআন কান্ধলবী}

এজন্যেই আমরা তাফসীরের অনেক কিতাবে দেখি, মুফাসসিরগণ তাফসির করতে গিয়ে ব্যাখ্যাসংশ্লিষ্ট কোন স্বপ্ন, ইলহাম বা কাশফ জানা থাকলে তা-ও উল্লেখ করেন। যেমন সুবহান্নাল্লাহর ব্যাখ্যার ব্যাপারে নদ্বর বিন শুমাইলের স্বপ্নের কথা প্রসিদ্ধ {লুগাতুল কুরআন, নুমানী}। ওয়াজাদাকা দ্বাল্লার ব্যাখ্যা ইমাম আবু হাইয়ান তাঁর তাফসীরে বাহরে মুহীতে কয়েকটি ভাষ্য দিয়ে করেছেন, এর মাঝে একটি ব্যাখ্যা স্বপ্ন দিয়ে করেছেন। মহামান্য ইমামগণের এ অামল ও নীতি থেকে আমরা এ উসূল পাই যে মেজাযে শরীয়া ও কাওয়ায়িদে আরাবিয়্যার বিপরীত না হলে কাশফ, ইলম ও স্বপ্ন দিয়েও কুরআনের ব্যাখ্যা করা যায়।

কুরআন ব্যাখ্যার নীতি এ সকল মানব্যর ইমামগণ বেশি বুঝতেন নাকি তাসবিহের দানার মত টপটপ করে পতিত চতুর্মুখী ফিতনাময় এই বিংশ শতাব্দী যুগের আমাদের এ আহলে হাদিস ভাইয়েরা বেশি বুঝেন?

৩.

আরেকটা বড় সমস্যা, অনেক আহলে হাদিস বিশেষত আমাদের বঙ্গীয় আহলে হাদিস ভাইয়েরা শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওহ্হাব নজদী রহ.-এর কেবল কিতাবুত্তাওহীদটাই পড়ে ঢেকুর তুলেন আর সবকিছুতে শিরকের ট্যাগ লাগিয়ে দেন। কিন্তু তাদের অধ্যয়নে শাইখ নজদী রহ.-এর রিসালাসম্বলিত বিশাল কয়েক ভলিউমের 'মুআল্লাফাত' আসে না। তাঁর 'মুলহাকুল মুসান্নাফাত' চর্চায় আসে না। আমি নিশ্চিত, তারা যদি শাইখ নজদীর মুআল্লাফাত ও মুলহাক পড়ে, তাহলে খোদ নজদীকেই তারা মুশরিক বলবে। কারণ নজদী রহ. তাঁর রিসালাসম্বলিত এ বইয়ে তাসাওউফ, ইলহাম-কাশফ ইত্যাদি নিয়ে জোড়ালো আলোচনা করেছেন। বড় শক্তভাবে এসবকে ছাবিত করেছেন। তিনি অনেকগুলো ঘটনাও উল্লেখ করেছেন।

এছাড়াও যেসব বিষয় কেন্দ্র করে তারা দেওবন্দীদের ওপর চড়াও হয় সবগুলোর চরম ধুলাই আছে।

ওলী-আওলিয়াদের কাশফ-ইলহামী বা স্বাপ্নিক অনেক ঘটনাকে তারা অলিক বলে হেসে খেলে উড়িয়ে দেয়। অথচ এগুলোর অধিকাংশ সহীহ সনদে ইমাম আবু নুআইম, যাহাবী প্রমুখ বিশুদ্ধ সূত্রে তাদের সিয়ার ও রিজালগ্রন্থসমূহে বর্ণনা করেছেন। নজদী রহ. তাঁর মুআল্লাফাতে এমন অনেক কিচ্ছা-কাহিনী উদ্ধৃত করেছেন।

সালাফদের কিতাবাদিতে এমন ঘটনায় ভরপুর।

খোদ নজদী রহ.-এর তো ৫০ এর ওপরে কারামত তথা অলৌকিক ঘটনা ও কাশফের বর্ণনা আছে।

এবারে শাইখ নজদীর রিসালাসমূহ থেকে কিছু উদ্ধৃতি আনি। লক্ষ্য করুন তিনি কত বড় মুশরিক (!) ছিলেন। তিনি তাঁর মুআল্লাফাতের 'আলহাদিয়্যাতুস সানিয়্যাহ' রিসালায় লিখেন-

ﻭﻻ ﻧﻨﻜﺮ ﺍﻟﻄﺮﻳﻘﺔ ﺍﻟﺼﻮﻓﻴﺔ ﻭ ﺗﻨﺰﻳﻪ ﺍﻟﺒﺎﻃﻦ

অর্থাৎ আমরা সুফীদের তরিকা ও আত্মার পরিশুদ্ধিকে অস্বীকার করি না...।

শাইখ নজদী দ্বীন কার কার সমষ্টি এবং এর ধারক-বাহক কারা, তাদের কথা বলতে গিয়ে মুআল্লাফাতে (আলকিছম: ৩, পৃ.৩১) লিখেন-

ﺇﻋﻠﻢ - ﺃﺭﺷﺪﻙ ﺍﻟﻠﻪ - ﺃﻥ ﺍﻟﻠﻪ ﺳﺒﺤﺎﻧﻪ ﻭ ﺗﻌﺎﻟﻰ ﺑﻌﺚ ﻣﺤﻤﺪﺍ ﺻﻠﻌﻢ ﺑﺎﻟﻬﺪﻯ ﺍﻟﺬﻯ ﻫﻮ ﺍﻟﻌﻠﻢ ﺍﻟﻨﺎﻓﻊ ﻭ ﺩﻳﻦ ﺍﻟﺤﻖ ﺍﻟﺬﻯ ﻫﻮ ﺍﻟﻌﻤﻞ ﺍﻟﺼﺎﻟﺢ ﺇﺫﺍ ﻛﺎﻥ ﻣﻦ ﻳﻨﺘﺴﺐ ﺇﻟﻰ ﺍﻟﺪﻳﻦ، ﻣﻨﻬﻢ ﻣﻦ ﻳﺘﻌﺎﻧﻰ ﺑﺎﻟﻌﻠﻢ ﻭ ﺍﻟﻔﻘﻪ ﻭ ﻳﻘﻮﻝ ﺑﻪ ﻛﺎﻟﻔﻘﻬﺎﺀ، ﻣﻨﻬﻢ ﻣﻦ ﻳﺘﻌﺎﻧﻰ ﺍﻟﻌﺒﺎﺩﺓ ﻭ ﻃﻠﺐ ﺍﻵﺧﺮﺓ ﻛﺎﻟﺼﻮﻓﻴﺔ، ﻓﺒﻌﺚ ﺍﻟﻠﻪ ﻧﺒﻴﻪ ﺑﻬﺬﺍ ﺍﻟﺪﻳﻦ ﺍﻟﺠﺎﻣﻊ ﻟﻠﻨﻮﻋﻴﻦ .

এক জায়গায় সুফীদের রেফারেন্স দিতে গিয়ে লিখেন

(তাঁর মুলহাকুল মুসান্নাফাত পৃ.১২৪)-

ﻓﻨﻔﺲ ﻣﺤﺒﺘﻪ ﺃﺻﻞ ﻋﺒﺎﺩﺗﻪ ﻭ ﺍﻟﺸﺮﻙ ﻓﻴﻬﺎ ﺃﺻﻞ ﺍﻟﺸﺮﻙ ... ﻭﻟﻬﺬﺍ ﻛﺎﻥ ﻣﺸﺎﺋﺦ ﺍﻟﺼﻮﻓﻴﺔ ﺍﻟﻌﺎﺭﻓﻮﻥ ﻳﻮﺻﻮﻥ ﻛﺜﻴﺮﺍ ﺑﻤﺘﺎﺑﻌﺔ ﺍﻟﻌﻠﻢ .

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর সর্বদা কাশফ হতো- তা ইতিহাসের অবিসংবাদিত কথা। হাফেয ইবনে আবদুল হাদী হাম্বলী রহ.তো ইবনে তাইমিয়াকে তাঁর যুগের সেরা কুতুব ও আবদাল বলে উল্লেখ করেছেন। কোন কোন গবেষকের মতে ইমাম ইবনে তাইমিয়া কাদেরিয়া তরিকার ছিলেন।

কাশফ-ইলহামকে কীভাবে ছুড়ে ফেলে দেওয়া যায়? কুরআনের ১৮ টি (ভিন্নমতে ৫টি) আয়াত নাযিল হওয়ার আগেই হযরত উমর বলে দিয়েছিলেন এই কাশফ দিয়েই। কাশফ ইলহাম রুইয়া সাদিকা সব কারামতের অন্তর্ভুক্ত। আর আকিদার সর্বজনবিধিত মাসআলা- কারামাতুল আওলিয়ায়ি হক্কুন।

৪.

বর্তমানে আহলে হাদিস ভাইদের ভেতরগত অবস্থা সিরিয়াস। মাযহাব ত্যাগ করেছে এ কথা বলে যে এর কারণে উম্মতের চার ফিরকা হয়েছে। অথচ তাদের মাঝে এখন শত ফিরকা, শত বিরোধ। এক গ্রুফ আরেক গ্রুফকে দেখতে পারে না। এক শাইখের সাথে আরেক শাইখের হৃদ্যতা নেই। চার ফিরকা থেকে বাঁচতে গিয়ে শত ফিরকায় বিভক্ত হয়ে গেছে খোদ তারা। শুনলে আশ্চর্য হবেন, বিখ্যাত দা'ঈ ডা. জাকির নায়েক হাফি. কে সর্বপ্রথম গোমরাহ ও যিন্দীক ফতওয়া দিয়েছে আহলে হাদিসেরই একটা দল।

৫.

আসলে শাইখ আওয়ামার কথাটাই সুন্দর। প্রকৃত আহলে হাদিস কোনদিন জমহুরের ভিন্ন হতে পারে না। তিনি আরো বলেন, আমাদের যুগের লামাযহাবী ভাইদের অনেকাংশ প্রাচীন গুলাত হানাবিলার মত। জ্ঞান ও পর্যাপ্ত অধ্যায়নের স্বল্পতার দরুণ তাদের মধ্যে চরমপন্থা ঢুকে পড়েছে।

.

পুনশ্চ: দেওবন্দীরা সুফীদের তরিকতের লাইন গ্রহণ করাকে আবশ্যক মনে করেন না। জান্নাতে যেতে হলে কোন পীরের হাতে মুরিদ হতে হবে বা সুফীদের তরিকা এখতিয়ার করতে হবে এমন নয়। আল্লামা রশীদ আহমদ গাঙুহী রহ. তাঁর ফাতাওয়ায় সুস্পষ্ট বলেছেন, জান্নাত এসব তরিকার ওপর নির্ভর নয়। মুফতী ফয়জুল্লাহ রহ. তাঁর 'জাওয়াহিরুল হিকাম' বইয়ে লিখেছেন, সুফীদের তরিকা গ্রহণ করা উত্তম হতে পারে, আবশ্যক কিছু না। শাইখ সাঈদ আহমদ পালনপুরী তাঁর 'তুহফাতুল কারী শরহে বুখারীতে' বলেন, কুরআন-হাদিসের ওপরে যে আমল করবে সে-ই জান্নাতে যাবে। কোন সুফীর বাতলানো পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরী কাজ নয়।

লিখেছেনঃ Abdul Kadir Masum(আব্দুল কাদির মাসুম)


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.