নব্য-সালাফীদের ভ্রান্ত আকীদা-০১


নব্য-সালাফীদের ভ্রান্ত আকীদা-

ভ্রান্ত আকীদা-১ : আরশ আল্লাহর স্থান; তিনি আরশেই অবস্থান করেন!

নব্য-সালাফীদের আকীদা হচ্ছে: আরশ আল্লাহর স্থান, তাতেই তিনি অবস্থান করেন।

দলীল : কুরআনের আয়াত- الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى অর্থ: দয়ালু আল্লাহ আরশে সমাসীন। এই আয়াতে আরশকে আল্লাহর স্থান সাব্যস্ত করা হয়েছে।

দলীলটির 10টি পর্যালোচনা

পর্যালোচনা-1 :
[এতে স্থানের বিবরণ দেওয়া হয়নি; বরং সম্পৃক্ততার বিবরণ দেওয়া হয়েছে]

এই আয়াতের মধ্যে স্থানের বিবরণ দেওয়া হয়নি; বরং আরশের সাথে আল্লাহ তাআলার সম্পৃক্ততার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। কোন বস্তুর সাথে কারো সম্পৃক্ততা সৃষ্টি হলে, সেটি তার জন্য স্থান হয়ে যায় না।

এর উপমা হলো: কুরআনের আয়াত- فَلَمَّا تَجَلَّى رَبُّهُ لِلْجَبَلِ অর্থ : মুসা আ. এর প্রতিপালক পাহাড়ের উপর তাজাল্লী করেছেন। [সূরা আরাফ-১৪৩]

এই আয়াতের মধ্যে যেমনভাবে পাহাড়কে আল্লাহর তাজাল্লীর স্থান বলা যাবে না;

ঠিকতদ্রুপ الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى এর মধ্যেও আরশকে আল্লাহর স্থান বলা যাবে না। অর্থাৎ এসব আয়াতে স্থানের বিবরণ দেওয়া হয়নি; বরং সম্পৃক্ততার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। আর কোন বস্তুর সাথে কারো সম্পৃক্ততা সৃষ্টি হলে, সেটি তার জন্য স্থান হয়ে যায় না। সারকথা, দলীলটা অপ্রাসঙ্গিক।

পর্যালোচনা-2:
[আরশকে স্থান সাব্যস্ত করা সহীহ হাদীস পরিপন্থি ও ভ্রান্ত আকীদা]

মুসলিম শরীফের হাদীস, রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন-
أَنْتَ الظَّاهِرُ فَلَيْسَ فَوْقَكَ شَيْءٌ وَأَنْتَ الْبَاطِنُ فَلَيْسَ دُونَكَ شَيْءٌ
অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি জাহের, আপনার উপরে কোন কিছু নেই। আপনি বাতেন, আপনার নিচে কোনকিছু নেই। [মুসলিম]

এই হাদীসটি আল্লাহ তাআলা ‘লা-মাকান’ তথা স্থান থেকে পবিত্র হওয়ার দলীল। কারণ, যখন তার উপরেও কোন কিছু নেই, নিচেও কোন কিছু নেই, তিনি তো লা-মাকান তথা স্থান থেকে পবিত্রই হবেন।
অতএব যদি আরশকে আল্লাহর স্থান সাব্যস্ত করা হয়, তাহলে তা এই হাদীসের পরিপন্থি হওয়ার কারণে ভ্রান্ত আকীদা গণ্য হবে।
তাছাড়া এই হাদীসে স্পষ্ট বলা হয়েছে- فَلَيْسَ دُونَكَ شَيْءٌ অর্থ: আল্লাহর নিচে কিছু নেই। অতএব যদি কেউ একথা বলে যে, আরশ আল্লাহর স্থান, তাতে তিনি অবস্থান করেন; তাহলে অর্থ দাড়াবে: আল্লাহর উপরে তো কোনকিছু নেই; তবে আল্লাহর নিচে আরশ রয়েছে; যা এই হাদীসের সুস্পষ্ট বিরোধী। কাজেই আরশকে আল্লাহর স্থান সাব্যস্ত করা ভ্রান্ত-আকীদা।

পর্যালোচনা-3 :

[আরশকে স্থান সাব্যস্ত করা কুরআন বিরোধী; আল্লাহ মাহমূল সাব্যস্ত হন]

আয়াত- وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِঅর্থ: আমি আদম সন্তানকে মর্যাদাবান করেছি এবং আমিই তাদেরকে স্থলে ও জ্বলে বহন করাই। [সূরা ইসরা-৭০]
এই আয়াত দ্বারা বুঝা যায়, আল্লাহ তাআলা হামেল, মাহমুল নন। অর্থাৎ মাখলুককে বহন করান, তাকে কেউ বহন করে না।
এবার শুনুন, আরশ হচ্ছে চার পায়া বিশিষ্ট এক বিশাল সৃষ্টি, যা ফেরেস্তাগণ নিজের কাধে বহন করে রেখেছেন। দেখুন, সূরা আল মুমিন-৭। কিয়ামতের প্রক্কালে যখন সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে, তখন আরশকে আটজন ফেরেস্তা বহন করে রাখবে। দেখুন, সূরা হাক্কাহ।
এমতাবস্থায় যদি আরশকে আল্লাহর স্থান সাব্যস্ত করা হয়, তাহলে অর্থ দাড়াবে: ফেরেস্তারা আল্লাহকে বহন করে রেখেছে। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা মাহমুল [বাহিত] হয়ে যাবেন, যা আল্লাহর ক্ষেত্রে অসম্ভব। নাউযুবিল্লাহ! হ্যা, এটাই নব্য-সালাফীদের আকীদা। কাজেই আরশকে আল্লাহর স্থান সাব্যস্ত করা যাবে না।

পর্যালোচনা-4 :
[আরশকে স্থান সাব্যস্ত করলে আল্লাহ ছোট আরশ বড় সাব্যস্ত হয়]

কুরআনে এসেছে- وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ অর্থ : আল্লাহ তাআলা সুউচ্চ ও সবচেয়ে বড়। এই আয়াতের আলোকে মুসলিম উম্মাহর আকীদা হলো: আল্লাহ সবচে বড়।
এমতাবস্থায় যদি আরশকে আল্লাহর স্থান সাব্যস্ত করা হয়, তাহলে বাধ্যতামূলক আল্লাহকে ছোট এবং আরশকে বড় মনে করতে হবে, নাউযুবিল্লাহ! কারণ মূলনীতি হচ্ছে: মাকান মাকীন থেকে বড় হয়ে থাকে। অর্থাৎ একটি বস্তুকে অপর একটি বস্তুর উপর রাখলে, স্বভাবত যার উপর বস্তুটি রাখা হয়, সেটা বড় থাকে; আর যে বস্তুটিকে রাখলো, সেটা ছোট হয়ে থাকে। যেমন- টেবিলের উপর কলম রাখা হলে বুঝতে হবে, কলমটি ছোট আর টেবিলটি বড়। কারণ, কলম বড় হলে কলমটি টেবিলের উপর থাকতে পারে না। এমতাবস্থায় আরশকে আল্লাহর স্থান সাব্যস্ত করা হলে, তখন আরশ হয়ে যাচ্ছে বড়, আর আল্লাহ হয়ে যাচ্ছেন ছোট, নাউযুবিল্লাহ! তখন ‘আল্লাহু আকবার’ বাদ দিয়ে ‘আরশুল্লাহি আকবার’ বলতে হবে। যা কেবল নাস্তিকরাই বলতে পারে, কোন মুমিন-মুসলমান আল্লাহকে এভাবে খাট করতে পারে না। কাজেই আরশকে আল্লাহর স্থান সাব্যস্ত করা ভ্রান্ত-আকীদা।
আরশ-ফরস, আসমান-যমীন সহ সমগ্র মহাবিশ্ব আল্লাহর নিকট অনু-পরমাণুতুল্য। হাদীসের ভাষ্যমতে মরুপ্রান্তরে এককণা বালুর মতো। সুতরাং তিনি এই ক্ষুদ্র সৃষ্টির মধ্যে কেন অবস্থান করবেন, অর্থাৎ এগুলো থেকে কোনটি আল্লাহর স্থান হবে কেন?

পর্যালোচনা-5 :
[আরশকে স্থান সাব্যস্ত করা কুরআন বিরোধী; আল্লাহ মুহাত সাব্যস্ত হন]

কুরআনে এসেছে- أَلَا إِنَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ مُحِيطٌ অর্থ : শুনে রাখ! আল্লাহ তাআলা সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে রয়েছেন। [হা-মীম সেজদাহ-৫৪]
এই আয়াতের আলোকে মুসলিম উম্মাহর আকীদা হচ্ছে: আল্লাহ তাআলা মুহীত, মুহাত নন। অর্থাৎ তিনি সর্বকিছুকে পরিবেষ্টনকারী; তাকে কোনকিছু পরিবেষ্টন করার মতো নেই।
এমতাবস্থায় যদি আরশকে আল্লাহর স্থান সাব্যস্ত করা হয়, তখন আরশ হবে মুহীত তথা পরিবেষ্টনকারী; আর আল্লাহ হবেন মুহাত তথা পরিবেষ্টিত, নাউযুবিল্লাহ। মাকানের সংজ্ঞা হচ্ছে- الموضع الحاوی للشئ অর্থাৎ যেটা কোন বস্তুকে বেষ্টন করে রাখে। অর্থাৎ স্থান মুহীত হয়; আর স্থানের মধ্যে বিদ্যমান বস্তুটি মুহাত হয়।
নব্য-সালাফীর দাবি হলো: আরশ আল্লাহর স্থান। তবে আল্লাহর শান হচ্ছে: উক্ত স্থান তাকে পরিবেষ্টন করতে পারে না। মূলত: এটি তাদের ভুয়া দাবি। কারণ, মাকানের সংজ্ঞা দ্বারা একথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, স্থানিক বস্তুকে স্থান পরিবেষ্টন করে নেয়। কাজেই একদিকে আল্লাহর জন্য স্থান সাব্যস্ত করা, অপরদিকে তিনি পরিবেষ্টিত হওয়াকে অস্বীকার করা- এটা স্ববিরোধী অবস্থান।

পর্যালোচনা-6 :
আরশকে স্থান সাব্যস্ত করা কুরআন বিরোধী; আল্লাহ সসীম সাব্যস্ত হন]

কুরআনে এসেছে- إِنَّ اللَّهَ وَاسِعٌ عَلِيمٌ অর্থ : আল্লাহ তাআলা অসীম, সর্বব্যাপী। [সূরা]
এই আয়াত দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তাআলা অসীম ও সর্বব্যাপী। এমতাবস্থায় যদি আরশকে আল্লাহর স্থান সাব্যস্ত করা হয়, তাহলে আরশ সসীম হওয়ার কারণে আল্লাহ তাআলাও সসীম হয়ে যাবেন। হযরত আলী রা. বলেছেন-
من يزعم أن إلهنا محدود فقد جهل الخالق المعبود
অর্থ : যে ব্যক্তি আল্লাহকে সসীম বিশ্বাস করে, সে আমাদের মাবুদ আল্লাহ সম্পর্কে অজ্ঞ। [হিলয়াতুল আউলিয়া, ১/৭৩]

পর্যালোচনা-7 :
[আরশকে স্থান সাব্যস্ত করলে আল্লাহ মুখাপেক্ষী হওয়া সাব্যস্ত হয়]

এক আয়াতে এসেছে- الله الصمد অর্থ: আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। [সূরা ইখলাস]
অন্যত্র এসেছে- إِنَّ اللَّهَ لَغَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ অর্থ: আল্লাহ সমগ্র জগত থেকে অমুখাপেক্ষী। [সূরা ]
এসব আয়াত দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তাআলা সর্বক্ষেত্রে অমুখাপেক্ষী।
এমতাবস্থায় যদি আরশকে আল্লাহর স্থান সাব্যস্ত করা হয়, তাহলে তিনি আরশের প্রতি মুখাপেক্ষী সাব্যস্ত হয়ে যাবেন। কারণ, মূলনীতি হলো: المتمكن محتاج إلى مكان অর্থাৎ প্রত্যেক স্থানবিশিষ্ট বস্তু স্থানের প্রতি মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে এবং স্থান ছাড়া বস্তুটি অস্তিত্বশীল হতে পারে না। অথচ আল্লাহ তাআলা অমুখাপেক্ষী। কাজেই আরশকে আল্লাহর স্থান সাব্যস্ত করা যাবে না।

পর্যালোচনা-8 :
[আল্লাহ স্বীয় অস্তিত্বের ক্ষেত্রে আরশের প্রতি মুখাপেক্ষী নন]

যদি আল্লাহ তাআলা স্বীয় অস্তিত্বের ক্ষেত্রে আরশের প্রতি মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেন, তখন আমার প্রশ্ন হলো, আরশ আল্লাহর একটি সৃষ্টি। তো তিনি আরশ সৃষ্টির পূর্বে কোথায় ছিলেন? অনুরূপ কিয়ামতের প্রক্কালে আরশ ধ্বংশের পরে কোথায় থাকবেন? এতেও প্রমাণিত হলো: আল্লাহ তাআলা স্বীয় অস্তিত্বের ক্ষেত্রে আরশের প্রতি মুখাপেক্ষী নন।
সারকথা, আল্লাহ তাআলা আরশসহ সকল স্থান থেকে পবিত্র। স্থান সৃষ্টির পূর্বে যেমনভাবে তিনি অস্তিত্বশীল ছিলেন, এখনও অস্তিত্বশীল আছেন, মহাবিশ্ব ধ্বংসের পরেও থাকবেন।
আকীদার প্রসিদ্ধ কিতাব ‘আকীদাতুত তাহাবী’-তে ‘ইস্তিওয়া’ সিফত সম্পর্কে এসেছে-
وَالْعَرْشُ وَالْكُرْسِيُّ حَقٌّ، وَهُوَ مُسْتَغْنٍ عَنِ الْعَرْشِ وَمَا دُونَهُ،
অর্থ : আরশ ও কুরসী বাস্তব-সত্য। তবে আল্লাহ তাআলা আরশ এবং তার নিচুস্থ সমুদয় বস্তু থেকে অমুখাপেক্ষী। [আকীদাতুত তাহাবী]

পর্যালোচনা-9 :
[আল্লাহ স্বীয় অস্তিত্বের ক্ষেত্রে আরশের প্রতি মুখাপেক্ষী নন]

বুখারীতে এসেছে- كَانَ اللَّهُ وَلَمْ يَكُنْ شَيْءٌ غَيْرُهُ অর্থ : আল্লাহ তখনো ছিলেন, যখন আল্লাহ ব্যাতীত কোন কিছুই ছিল না। [বুখারী]
মানে, আল্লাহ তাআলা কাদীম, তিনি আযল থেকেই অস্তিত্বশীল। অর্থাৎ যখন স্থান-কাল, আরশ-কুরসী, আসমান-যমীন, উপর-নিচ, ডান-বাম, সামনে-পেছনে কিছুই ছিল না, এককথায় মহাবিশ্বের কিছুই ছিল না, তখনও আল্লাহ তাআলা ছিলেন।
এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়, আল্লাহ তাআলা মহাবিশ্ব সৃষ্টির পূর্বে আরশের [স্থানের] প্রতি মুখাপেক্ষী ছিলেন না। কাজেই মহাবিশ্ব সৃষ্টির পরে স্থানের [আরশের] প্রতি মুখাপেক্ষী হবেন কেন?
প্রশ্ন : কুরআনে এসেছে- وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ অর্থাৎ মহাবিশ্ব সৃষ্টির আল্লাহর আরশ পানির উপর ছিল। বুঝা গেলো, মহাবিশ্ব সৃষ্টির পূর্বেও আরশ ছিল।
জবাব : এই আয়াতে শুধুমাত্র আরশের কথা এসেছে, তাতে ইস্তিওয়া করার কথা নেই। এতেই বুঝা যায় যে, আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিজগত সৃষ্টির পূর্বেও আরশের প্রতি মুখাপেক্ষী ছিলেন না, এখনও নেই, ভবিষ্যতেও থাকবেন না।
আল্লামা আইনী রহ. শরহে বুখারীতে লেখেছেন-
وإنما أخبر عن العرش خاصة بأنه على الماء، ولم يخبر عن نفسه بأنه حال عليه، تعالى الله عن ذلك، لأنه لم يكن له حاجة إليه
অর্থ : এতে শুধুমাত্র আরশ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, সেটি পানির উপর ছিল। একথা বলা হয়নি যে, আল্লাহ তাআলা তাতে আরোহন করেছেন। আর আল্লাহ তাআলা এটা থেকে বহু উর্ধ্বে। কেননা, তিনি স্বীয় অস্তিত্বের ক্ষেত্রে আরশের প্রতি মুখাপেক্ষী নন। [উমদাতুল কারী]

পর্যালোচনা-10 :
[আরশকে স্থান সাব্যস্ত করলে বহু জটিলতা আবশ্যক হবে]

আরশ আল্লাহর স্থান নয়। যদি কেউ আরশকে আল্লাহর স্থান সাব্যস্ত করে, তার প্রতি আমার কয়েকটি প্রশ্ন রয়েছে। প্রশ্নগুলো এই-
প্রথম প্রশ্ন হলো: আল্লাহ তাআলা আযল থেকেই উক্ত স্থানে [আরশে] আছেন, নাকি স্থান সৃষ্টির পর তাতে আসন গ্রহণ করেছেন। প্রথম সুরতে আল্লাহর ন্যায় উক্ত স্থান [আরশ]-কেও কাদীম বলতে হবে। অথচ আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন কাদীম নেই। আর দ্বিতীয় সুরতে কয়েকটি সমস্যা দেখা দিবে। (ক) প্রথমত: আল্লাহ তাআলা মহল্লে হাওয়াদিস হওয়া আবশ্যক হয়। অথচ আল্লাহ তাআলা যেমনভাবে নিজে হাদেস নন, অনুরূপ হাদেসের মহল্লও নন। (খ) দ্বিতীয়ত: আল্লাহ তাআলা পরিবর্তনশীল সাব্যস্ত হয়ে যাবেন। অর্থাৎ প্রথমে আরশে ছিলেন না, আরশ সৃষ্টির পরেই আরশে আসন গ্রহণ করেছেন। মূলনীতি হলো: প্রত্যেক পরিবর্তনশীল বস্তু ধ্বংশীল হয়ে থাকে, তাই আল্লাহও ধ্বংসশীল সাব্যস্ত হবেন, নাউযুবিল্লাহ! (গ) তাছাড়া পরিবর্তনের জন্য পরিবর্তক [পরিবর্তনের ইস্যু] লাগে। কাজেই আল্লাহর ক্ষেত্রে পরিবর্তন মানলে প্রশ্ন আসবে যে, তার পরিবর্তক কে? নাউযুবিল্লাহ!
দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো: স্থান তো অগণিত। তো আল্লাহ কিছুস্থানে থাকেন, নাকি সবস্থানে থাকেন? যদি বলেন, কিছু স্থানে থাকেন, তাহলে আমার প্রশ্ন হলো: অপরাপর স্থানগুলো বাদ দিয়ে এই স্থানগুলো নির্বাচন করার ইস্যূ কি? যদি বহিরাগত কোন ইস্যু ছাড়াই কিছুস্থানে থাকেন, তাহলে এটাকে ‘তারজীহ বিলা মুরাজজিহ’ বলা হয়, যা না-জায়েয। আর যদি বহিরাগত কোন ইস্যুর ভিত্তিতে নির্বাচন করে থাকেন, তাহলে অন্যের প্রতি মুখাপেক্ষীতা আবশ্যক হয়, এটাও না-জায়েয। আর যদি বলা হয়, আল্লাহ তাআলা সমস্ত স্থানে থাকেন, তখন ‘তাদাখুলু ফিল মুতাহায়্যিযীন’ আবশ্যক হবে, যা অসম্ভব। কারণ কিছু স্থান তো জিসিম দ্¦ারা ভর্তি, তো সব স্থানে থাকতে গেলে ঐসব জিসিমের মধ্যে প্রবেশ করতে হবে।
তৃতীয় প্রশ্ন হলো: আরশকে আল্লাহর স্থান সাব্যস্ত করা হলে প্রশ্ন জাগবে যে, আল্লাহ বড়, নাকি আরশ বড়? যদি বলেন, আরশ বড় আর আল্লাহ ছোট, তাহলে ‘আল্লাহু আকবার’ [আল্লাহ সবচেবয়ে বড়] কথাটি মিথ্যা হয়ে যাবে।
আর যদি বলেন, আল্লাহ বড় আর আরশ ছোট, তাহলে এটা অসম্ভব। কারণ বড় বস্তু ছোট বস্তুর মধ্যে থাকবে কিভাবে? তাছাড়া এই সুরতে তাজাযযী আবশ্যক হবে। কারণ তখন আল্লাহর কিছু অংশ আরশে, আর কিছু অংশ আরশের বাইরে ঝুলে থাকবে। আর তাজাযযী দেহের বৈশিষ্ট্য; আর দেহ হাদেস তথা ধ্বংসশীল, আর আল্লাহ হচ্ছেন কাদীম।
আর যদি বলেন, আরশ এবং আল্লাহ উভয়েই সমান-সমান, তখন এটা কুরআনের আয়াত ‘আল্লাহর সমকক্ষ কোনকিছু নেই’-এর পরিপন্থি। তাছাড়া এই সুরতে আল্লাহ তাআলা সীমিত হওয়া আবশ্যক হবে। কারণ আরশ সীমিত। সারকথা, আরশকে আল্লাহর স্থান মনে করলে, ত্রিমূখী জটিলতায় পড়তে হবে।
সারকথা: আরশকে আল্লাহর স্থান বলা যাবে না- কারণ আল্লাহ তাআলা স্থান থেকে পবিত্র। অনুরূপ আল্লাহ উপরের দিকে আছেনও বলা যাবে না- কারণ তিনি দিক থেকেও পবিত্র। বরং তাকে ‘লা-মাকান’ ‘লা-জিহাত’ ‘লা-মাহদুদ’ বলতে হবে। অর্থাৎ তিনি স্থান, দিক ও পরিসীমা ছাড়াই অস্তিত্বশীল। এটাই সহীহ আকীদা এবং নিরাপদ মানহাজ।

অভিযোগ:

আরশ আল্লাহর স্থান না হলে আল্লাহ আরশ সৃষ্টি করলেন কেন?
নব্য সালাফীদের অভিযোগ হচ্ছে: যদি আরশ আল্লাহর স্থান না হয়, তাহলে আল্লাহ তাআলা আরশ সৃষ্টি করলেন কেন?

জবাব :
১.আল ফারকু বাইনাল ফিরাক গ্রন্থে আব্দুল কাহের বাগদাদী রহ. [মৃ.৪২৯হি.] লেখেন-
قال امير المؤمنين على رضي الله عنه ان الله تعالى خلق العرش اظهارا لقدرته لا مكانا لذاته وقال ايضا كان الله ولا مكان وهو الآن على ما عليه كان. أى بلا مكان
অর্থ : আলী রা. বলেছেন: আল্লাহ তাআলা আরশ সৃষ্টি করেছেন, নিজের কুদরত প্রকাশের উদ্দেশ্যে। নিজ সত্তার স্থান হিসেবে নয়। তিনি আরো বলেছেন: আল্লাহ তআলা তখনও ছিলেন, যখন স্থান বলতে কিছুই ছিল না। এখনও তেমন আছেন, যেমন পূর্বে ছিলেন। [আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ. ৩৩৩]

২..ইমাম আবু হানিফা রহ.-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আল্লাহ কোথায়? তিনি বললেন :

كان الله تعالى ولا مكان، كان قبل أن يخلق الخلق، كان ولم يكن أين ولا خلق ولا شىء، وهو خالق كل شىء

যখন কোনো স্থানই ছিল না, তখনো আল্লাহ ছিলেন। সৃষ্টির অস্তিত্বের পূর্বে তিনি ছিলেন। তিনি তখনো ছিলেন, যখন ‘কোথায়’ বলার মতো জায়গা ছিল না, কোনো সৃষ্টি ছিল না এবং কোনো বস্তুই ছিল না। তিনিই সবকিছুর স্রষ্টা।[1] আল-ফিকহুল আবসাত : ৫৭

৩. ইমাম আবু হানিফা রহ. আরও বলেন :

نقر بأن الله على العرش استوى من غير أن يكون له حاجة إليه واستقرار عليه وهو الحافظ للعرش وغير العرش، فلو كان محتاجا لما قدر على إيجاد العالم وتدبيره كالمخلوق ولو كان محتاجا إلى الجلوس والقرار فقبل خلق العرش أين كان الله تعالى! تعالى الله عن ذلك علوا كبيرا.

আমরা স্বীকার করি যে, আল্লাহ তাআলা আরশের ওপর ইসতিওয়া করেছেন। তিনি আরশের প্রতি কোনো ধরনের প্রয়োজন ও তার ওপর স্থিতিগ্রহণ ব্যতিরেকেই তার ওপর ইসতিওয়া করেছেন। তিনি আরশ ও আরশ ছাড়া অন্য সব সৃষ্টির সংরক্ষণকারী কোনো ধরনের মুখাপেক্ষিতা ব্যতিরেকে। তিনি যদি মুখাপেক্ষী হতেন, তাহলে সৃষ্টিজীবের মতো মহাবিশ্ব সৃষ্টি ও পরিচালনা করতে সক্ষম হতেন না। তিনি যদি আরশের ওপর সমাসীন হওয়া এবং স্থির হওয়ার দিকে মুখাপেক্ষী হতেন, তাহলে আরশ সৃষ্টির পূর্বে তিনি কোথায় ছিলেন? আল্লাহ এসব বিষয় থেকে সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে।[2] [2] আল-ওসিয়্যাহ : ২

৪.ইমাম ইবনু আবদুস সালাম রহ. ইমাম আবু হানিফা থেকে উদ্ধৃত করেন :

من قال لا أعرف الله تعالى في السماء هو أم في الأرض كفر، لأن هذا القول يوهم أن للحق مكانا ومن توهم أن للحق مكانا فهو مشبه

যে ব্যক্তি বলবে, আমি জানি না, আল্লাহ তাআলা আকাশে আছেন নাকি পৃথিবীতে, সে কাফির হয়ে যাবে। কারণ, এই কথাটি এ সংশয় সৃষ্টি করে যে, আল্লাহ তাআলার জন্য কোনো স্থান রয়েছে। যে ব্যক্তি এ ধারণা রাখবে যে, আল্লাহ জন্য কোনো স্থান রয়েছে, সে একজন মুশাব্বিহা।[3] [3] শারহুল ফিকহিল আকবার, মোল্লা আলি কারি

সংকলন : মাওলানা রশীদ আহমদ কাউসারী



Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.