💐মাযহাব অনুসরণ ওয়াজিব হওয়ার ফতোয়া🌹
এবার আমরা মাযহাব অনুসরণ ওয়াজিব হওয়ার উপর আকাবিরদের কয়েকটি ফাতাওয়া উল্লেখ করবঃ
১. প্রশ্ন : কোনো নির্দিষ্ট ইমামের তাকলীদ করা সাধারণ মুসলমানের জন্য ফরয, ওয়াজিব না মুবাহ?
উত্তরঃ মুতলাক তাকলীদ ফরয। আর তাকলীদে শাখসীর ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের উলামায়ে কেরামের মতে ওয়াজিব। (জাওয়াহিরুল ফিকহ ১/১২১)
২. শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. (হাদীস শাস্ত্রে যার পাণ্ডিত্যের উপর আহলে হাদীসদের ইমাম নওয়াব সিদ্দিক হাসান খান সাহেবও স্বীকারোক্তি দিয়েছেন) বলেন, হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর পর জনসাধারণের মধ্যে বিশেষ বিশেষ ইমামের মাযহাবের পাবন্দী অর্থাৎ তাকলীদে শাখসী শুরু হয়ে যায়। আর বর্তমান যুগে এটাই ওয়াজিব। (আল ইনসাফ পৃ. ৫৯)
৩. প্রশ্নঃ তাকলীদে শাখসী ওয়াজিব না ফরয?
উত্তরঃ তাকলীদে শাখসী ওয়াজিব। (ফাতাওয়া মাহমুদিয়া ৪/৩৫২)
৪. মূলনীতি হলো, ওয়াজিব কাজ সম্পাদনের জরুরী মাধ্যমগুলোও ওয়াজিব হয়, সে হিসেবে তাকলীদে শাখসী অর্থাৎ নির্দিষ্ট ইমামের মাযহাব অনুসরণ করাও ওয়াজিব হবে। (আহসানুল ফাতাওয়া ১/৪১৪)
৫. প্রশ্নঃ বর্তমানকালে যারা ইমাম চতুষ্টয়ের কোনো একজনেরও তাকলীদ করে না তাদের বিধান কী?
উত্তরঃ বর্তমান যুগে যারা চার ইমামের কোনো একজনেরও তাকলীদ করে না তারা ফাসেক। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের গণ্ডিবহির্ভূত। হারামাইন শরীফাইনের ফাতাওয়া অনুযায়ী তাদের উপর শাস্তি প্রয়োগ করা ওয়াজিব। (মাজমুআয়ে রাসায়েল ১/২৮)
🍀❤হাদীসের উপর আমল না করা🌷
মাযহাব না মানলে হাদীসের উপরও পুরোপুরি আমল করা সম্ভব নয়ঃ
আহলে হদীস ভাইয়েরা আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের মাযহাব অর্থাৎ হাদীসের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তাদের মতামত ও সিদ্ধান্তের কোনো তোয়াক্কা করেন না। তারা নিজেদের বুঝ-বুদ্ধি মাফিক সরাসরি হাদীসের উপর আমল করার দাবি করে থাকেন। কিন্তু বাস্তব কথা হলো, একজন অমুজতাহিদের পক্ষে মাযহাব না মেনে কিছুতেই হাদীসের উপর পূর্ণভাবে আমল করা সম্ভব নয়। কয়েকটি উদাহরণ লক্ষ্য করা যাকঃ
🌹🌹১.জামাআতের নামাযে মুসল্লীদের পা🌹🌹🌹🍀🍀🍀🍀🍀🍀🍀
১. জামাআতে নামায আদায়কারী মুসল্লীদের পরস্পরের পা কিভাবে থাকবে?:
এ ব্যাপারে হাদীসের কিতাবসমূহে কয়েক ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়।
ক. عن أنس وكان احدنا يلزق منكبه بمنكب صاحبه وقدمه بقدمه
অর্থ ‘হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, নামাযে আমাদের প্রত্যেকে তার কাঁধ পাশের ব্যক্তির কাঁধের সাথে মিলিয়ে রাখত এবং পা পাশের ব্যক্তির পায়ের সাথে মিলিয়ে রাখতো। (বুখারী হা.৭২৫) এই হাদীস দ্বারা বাহ্যত মনে হচ্ছে উভয় মুসল্লীর পা মিলানো থাকবে।
খ.
قَالَ رسول لله صلى الله عليه وسلم: إِذَا صَلَّى أَحَدُكُمْ فَلاَ يَضَعْ نَعْلَيْهِ عَنْ يَمِينِهِ وَلاَ عَنْ يَسَارِهِ فَتَكُونَ عَنْ يَمِينِ غَيْرِهِ إِلاَّ أَنْ لاَ يَكُونَ عَنْ يَسَارِهِ أَحَدٌ وَلْيَضَعْهُمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ
অর্থ: তোমরা নামাযে তোমাদের ডান পায়ের পাশে জুতা রাখবে না। (কারণ সেখানে ফেরেশতা থাকে) এবং তোমাদের বাম পায়ের পাশেও রাখবে না। কারণ সেটা অন্য ভাইয়ের ডান পাশ। (আবূ দাউদ হা.৬৫৪)
এই হাদীস দ্বারা বাহ্যত বুঝা যাচ্ছে, দুই মুসল্লীর পায়ের মাঝখানে ফাঁকা থাকবে। যেখানে জুতা রাখা সম্ভব। কিন্তু নবীজী ﷺ সেখানে জুতা রাখতে নিষেধ করেছেন। দুজনের পায়ের মাঝখানে যদি ফাঁকাই না থাকে তাহলে তো জুতা রাখতে নিষেধ করার কোনো মানে হয় না।
উক্ত দুই হাদীসের বাহ্য বিরোধ লক্ষ্য করে আহলে হাদীস ভাইয়েরা দ্বিতীয় হাদীসের ওপর আমল করা ত্যাগ করেছেন এবং হাদীসটিকে একপ্রকার অস্বীকার করেছেন। কিন্তু যারা মাযহাব মানেন বিশেষত হানাফী মাযহাবের অনুসারীগণ নিজেদের ইমামের মাযহাব অর্থাৎ ব্যাখ্যা অনুযায়ী (ফাতা হিন্দিয়া:১/৭৩)
উভয় মুসল্লীর পায়ের মাঝে সামান্য ফাঁকা রাখেন। এতে উভয় হাদীসের উপর তাদের আমল হয়ে যায়। দ্বিতীয় হাদীসের ওপর আমল হয় সরাসরি ও প্রতক্ষ্যভাবে আর প্রথম হাদীসের ওপর আমল হয় ব্যাখ্যাসাপেক্ষে পরোক্ষভাবে। তা এ ভাবে যে, মুহাক্কিক আলেমগণ বলেছেন, প্রথম হাদীসের يلزق শব্দ থেকে উভয় মুসল্লীর পা মিলিয়ে রাখার যে অর্থ বাহ্যত বুঝে আসে হাদীসে তা বুঝানো হয়নি। কেননা ‘এলযাক, শব্দের বাহ্যিক অর্থ মিলানো হলেও এখানে তা প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। কারণ সে ক্ষেত্রে তখন স্বয়ং প্রথম হাদীসের উপরই আমল করা সম্ভব হবে না। দেখুন না, হাদীসে মুসল্লীদের পরস্পরে কাঁধ ও পা মিলিয়ে রাখার কথা বলা হয়েছে, অথচ মুসল্লীদের পরস্পরে পায়ে পা মিলিয়ে রেখে একই সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাখা কিছুতেই সম্ভব নয়। বিশ্বাস না হলে পাশাপাশি পাঁচজন লোক নিজ নিজ পায়ের মাঝে এক বিঘতের বেশি ফাঁকা রেখে (যেমনটি আহলে হাদীসের ভাইয়েরা করে থাকেন) তারপর পাশের জনের পায়ের সাথে পা মিলিয়ে নিন এবং এ অবস্থায় সকলেই পরস্পপরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাখার চেষ্টা করুন। কস্মিনকালেও সম্ভব হবে না। বিশেষতঃ মুসল্লীগণ যদি দৈর্ঘ্যে কমবেশি হয়ে থাকেন। যদি বলা হয় পা মিলিয়ে রাখলেই হবে কাঁধ মিলানো জরুরী নয়, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। কেননা একই হাদীসে বর্ণিত একই ধরনের দুটি বিধানের একটিকে বাদ দিয়ে অপরটিকে আঁকড়ে ধরা কিংবা একটিকে প্রাধান্য দেওয়ার গ্রহণযোগ্যতা নেই। তা ছাড়া আবূ দাউদ শরীফে বর্ণিত (হাদীস নং হা.৬৬২) নুমান ইবনে বশীর রাযি. থেকে হাদীসটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে,
فرأيت الرجل يلزق منكبه بمنكب صاحبه وركبته بركبة صاحبه وكعبه بكعبه.
অর্থ: আমি দেখেছি লোকেরা নামাযে তার কাঁধ পার্শ্ববর্তীর কাঁধের সাথে তার হাঁটু পার্শ্ববর্তীর হাঁটুর সাথে আর টাখনু টাখনুর সাথে মিলিয়ে রাখতো’।
পাঠক ! হাঁটুর সাথে হাঁটু রাখতে হলে তো দুজন ব্যক্তিকে মুখোমুখি বসে তবে কাজটি করতে হবে। দাঁড়ানো অবস্থায় এটা বিলকুল অসম্ভব। যা হোক, রেওয়ায়াতগুলোর মধ্যে এই যে এতগুলো অসংগতি সৃষ্টি হচ্ছে, তা মূলত ‘এলযাক, শব্দটিকে মিলানো অর্থে ব্যবহার করার কারণে। সুতরাং বাধ্য হয়েই শব্দটিকে কাছাকাছি, পাশাপাশি, সমান ও সমান্তরাল অর্থে ব্যবহার করতে হবে। যেমনঃ আরবী ভাষায় مررت بزيد বাক্যটির ب বর্ণের মূল অর্থ মিলানো হলেও অর্থ করা হয়, আমি যায়েদের পার্শ্ব দিয়ে অতিক্রম করেছি। এখানে কেউ এ অর্থ করে না যে, আমি যায়েদের শরীরের সাথে শরীর মিলিয়ে তাকে অতিক্রম করেছি। সুতরাং হাদীসে يلزق শব্দটিকে মিলানো অর্থে আতিশয্যের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। যেন কেউ কাতারের মাঝখানে অযথা ফাঁকা না রাখে। কিংবা হাদীসে কাতার সোজা করার সময় পা, কাঁধ মিলিয়ে মিলিয়ে কাতার সোজা করার কথা বলা হয়েছে। কাতার সোজা হওয়ার পর নামাযের মধ্যেও তা ধরে রাখতে হবে সেটা বলা হয়নি। নচেৎ সেজদা থেকে পরবর্তী রাকাআতের জন্য উঠে মুসল্লীকে আবার তার পার্শ্ববর্তীর পা খুঁজে বের করে তার সাথে নিজের পা মিলাতে হবে। যা নিঃসন্দেহে নামাযের একাগ্রতা বিনষ্টকারী হওয়ায় মাকরুহ বলে গণ্য হবে।
মোদ্দাকথা, এতসব বিষয় বিবেচনা করে ইমাম আবূ হানীফা রাহ. দ্বিতীয় হাদীসের ওপর সরাসরি আমল করার কথা বলেছেন। আর প্রথম হাদীসের يلزق শব্দটির ব্যাখ্যাসাপেক্ষে সেটার ওপরও আমল করেছেন। এটাই হানাফীদের মাযহাব। এর দ্বারা এ সংক্রান্ত সকল হাদীসের উপর আমল হয়ে যাচ্ছে। চাই তা সহীহ, যয়ীফ যাই হোক না কেন। সাথে সাথে মুসল্লীগণ নামাযে একাগ্রতাও ধরে রাখতে পারছেন। যেটা নামাযের অন্যতম কাম্য বিষয়। এখন বলুন, বুখারী, মুসলিমে নেই কিংবা আমাদের তাহকীক (?) অনুযায়ী সহীহ নয় এই ধুঁয়া তুলে এক হাদীসের অর্ধেকের ওপর আমল করা উচিত, না এমনভাবে আমল করা উচিত যাতে সকল হাদীসের বাহ্যবিরোধ শেষ হয়ে সবগুলোর উপর একই সঙ্গে আমল হয়ে যায়? তবে হাদীসের এসব সূক্ষ্ম ও খুঁটিনাটি বিষয় অনুধাবনের জন্য সতেজ ও সজীব মস্তিষ্কের প্রয়োজন। ভারবাহী প্রাণীবিশেষের মেজাজ নিয়ে তা সম্ভব নয়।
বাকি উদাহরণ পরের পোস্টে
ইনশা আল্লাহ ধারাবাহিক আলোচনা চলবে🌹🌹🌹🌹